সময়ের ভাবনা

অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাফল্যের জন্য নিবিড় তদারকি দরকার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা সম্পর্কে সচেতনতাও বাড়ে। এ সচেতনতা বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোও বিকাশমান দেশগুলোর উন্নতি নিজ থেকে স্বীকার করছে। বাংলাদেশ এখন দ্রুত বর্ধনশীল দেশগুলোর একটি। উন্নয়ন পরিক্রমায় দেশটি উৎপাদন বৃদ্ধি,

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা সম্পর্কে সচেতনতাও বাড়ে। এ সচেতনতা বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোও বিকাশমান দেশগুলোর উন্নতি নিজ থেকে স্বীকার করছে। বাংলাদেশ এখন দ্রুত বর্ধনশীল দেশগুলোর একটি। উন্নয়ন পরিক্রমায় দেশটি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি ও বিনিয়োগ আয় বাড়াতে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ‘‌বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০’ অধ্যাদেশে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে বেজার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান ও ৪ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রফতানির লক্ষ্য রয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য এটি সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের শিল্পায়নের যাত্রাটা বেশি দিনের নয়। আশির দশকে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা হয়েছিল। তবে এটি তেমন বিস্তৃত নয়। সীমিত কিছু এলাকায় ইপিজেড রয়েছে। ইপিজেডগুলো পরবর্তী দশকে রফতানি আয়ে ভূমিকা রাখলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোয় পিছিয়ে। সরকার সেজন্য এ ধারণা ভেঙে বৃহৎ আকারে শিল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। যাতে করে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদায় ঘাটতি না থাকে, বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা যায়। 

দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যাত্রা হয় ২০১৫ সালে। এখন অনুমোদিত অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে ৯৭টি। উৎপাদনরত ১০টি। বেজার মোট জমি প্রায় ৬২ হাজার একর। অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদনশীল শিল্প-কারখানা ৩৮টি, নির্মাণাধীন ৭৮টি। বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫০ কোটি ডলার। এখন পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। বেজার আইনের শুরুতে স্পষ্ট বলা আছে, ‘দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রফতানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণে উৎসাহ প্রদানের জন্য পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর এলাকাসহ সম্ভাবনাময় সব এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও এর উন্নয়ন, পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন।’ কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে ধীর, অনগ্রসর এলাকাগুলোয় বাস্তবায়ন ও আশানুরূপ বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে না।

বেজার অনুমোদিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সরকারি রয়েছে ৬৮টি ও বেসরকারি ২৯টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৬টি (সরকারি ১৮টি ও বেসরকারি ১৮টি), চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫টি (সরকারি ২১টি ও বেসরকারি চারটি), রাজশাহী বিভাগে আটটি (সরকারি ছয়টি ও বেসরকারি একটি), খুলনা বিভাগে আটটি (সরকারি সাতটি ও বেসরকারি একটি) সিলেট বিভাগে ছয়টি (সরকারি চারটি ও বেসরকারি দুটি), ময়মনসিংহ বিভাগে আটটি (সরকারি ছয়টি ও বেসরকারি দুটি), রংপুর বিভাগে চারটি (সরকারি চারটি) ও বরিশাল বিভাগে তিনটি (সরকারি তিনটি) অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সরকারের লক্ষ্য ছিল বিদেশী ও স্থানীয় উভয় বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা। কিন্তু দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে দু-তিনটি বিভাগ বাদে অন্যগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না। যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই শিল্পের বিস্তার রয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণে সেগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে রংপুর ও বরিশালের মতো বিভাগ পিছিয়েই থাকছে। এ দুটি বিভাগে অনুমোদিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যাও অনেক কম। বাস্তবায়ন ও কার্যক্রমেও অগ্রগতি নেই। ফলে অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ এলাকাগুলোকে উন্নত করার যে লক্ষ্য সেটি অসম্পূর্ণ থাকছে। বিভাগের উন্নয়ন ভারসাম্য বজায় থাকছে না, বরং বৈষম্য হচ্ছে। 

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি রয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও আব্দুল মোনেম ইকোনমিক জোন বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৪১ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ‘‌সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন’। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় এখন জাপান, চীন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া বিনিয়োগ করছে। ভৌগোলিকভাবেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়ে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস বিনিয়োগে আগ্রহী। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিবেদিত ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ রাখার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সার, আইসিটি, সামুদ্রিক সম্পদ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন (বাসস, ৩ মে, ২০২৩)। এর আগে প্রধানমন্ত্রী টোকিওতে একটি সম্মেলনে বলেন, ‘বাংলাদেশ ১৭ কোটি মানুষের দেশ, যেটি নিজেই একটি ক্রমবর্ধমান বাজার এবং প্রায় ৩০০ কোটি ভোক্তার একটি বৃহৎ বাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান যা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য একটি বিশাল আকর্ষণ। এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চ প্রজেকশন রিপোর্ট ইঙ্গিত করে, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও জার্মানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী নবম বৃহত্তম ভোক্তাবাজার হয়ে উঠতে পারে (বণিক বার্তা, ২৭ এপ্রিল, ২০২৩)।’

বৃহত্তম ভোক্তাবাজার হয়ে উঠতে বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর গতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশীদের কাছে ভারত, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশ পছন্দের হয়ে উঠছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক মন্দাভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ইকোনমিক জোনে কম মূল্যে জমি পেতে পারে। ১০ বছরের জন্য আয়কর ছাড়, কাঁচামাল, নির্মাণসামগ্রী, মূলধনি যন্ত্রপাতি, তৈরি পণ্যের শুল্কমুক্ত আমদানি ও লভ্যাংশ কর থেকে অব্যাহতির সুযোগ রয়েছে। এসব সুবিধা নিশ্চিত করলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হয়ে উঠবেন। 

বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য সাতটি খাতে উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। খাতগুলো হলো পরিবহন ও লজিস্টিকস, জ্বালানি, আর্থিক সেবা, হালকা প্রকৌশল, কৃষি বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধ। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কিছু খাতে সংস্কারের পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি। এগুলো হলো স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করা (প্রথম আলো, ২৪ জুন, ২০২১)। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোই উৎসাহমূলক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ইকোনমিক জোনে যে সুযোগ-সুবিধা মিলবে, তা বাইরে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা স্থাপন সহজ নয়। দেশে জমিস্বল্পতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৩০০ মানুষ বাস করে। সরকার থেকে কৃষিজমিতে শিল্প স্থাপনে অনুমোদন দেয়া হয় না। কারণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি উর্বর। অর্থাৎ কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। আবার দেশের সর্বত্র জ্বালানি ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও নেই। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও উন্নত রাস্তঘাটের পরিকল্পনা করেই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো স্থাপন করা হয়ে থাকে। বেজার অধীনে ওয়ান স্টপ সলিউশন (ওএসএস) ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকছে। কাজেই পরিকল্পিত শিল্পায়নে না এলে বিনিয়োগকারীরা নানা সমস্যার মধ্যে পড়বে। সাধারণত, বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামো উন্নয়নে ও স্থান নির্বাচনে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। দেশে যেসব জোন করা হচ্ছে, সেগুলোর অবকাঠামোগত ও স্থানগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। পানি ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা রয়েছে। সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডেও এমন সমস্যা ছিল। এসব সমস্যা পরিকল্পিতভাবে কাটাতে হবে। সেজন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো স্থাপনে নিবিড় তদারকি করতে হবে।

গত কয়েক মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তারা প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। কভিড মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধাবস্থায়ও বাংলাদেশ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক এ উন্নয়নে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও ভূমিকা রেখেছে। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ নানা স্বীকৃতি লাভ করছে। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগ চুক্তি আরো বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশে বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো, জ্বালানি নিশ্চয়তা, কূটনৈতিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা— সবকিছুর প্রয়োজন। বিনিয়োগের পরিবেশ যেন ঝামেলামুক্ত হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাতে বিদেশী বিনিয়োগপ্রাপ্তি সহজ হবে। 

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও