এদিকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি সচল না হওয়া পর্যন্ত বাড়তি এলএনজি সরবরাহ সম্ভব নয় বলে খোদ জ্বালানিমন্ত্রী সিপিডির এক সংলাপে বলেছেন।
দেশে জ্বালানি গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়। অর্থাৎ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকে। বর্তমানে আলোচ্য নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার কারণে গ্যাসের সরবরাহ ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। এর ফলে বাড়ছে লোডশেডিং, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্প, উৎপাদন সংকটে কৃষি ও সার কারখানা, সিএনজিচালিত যানগুলোর পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং ভোক্তা পর্যায়ে তীব্র গ্যাস সংকট।
গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন সংকুচিত হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সংকটকালে উৎপাদন চালালেও তা আগের তুলনায় ৩৫-৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বণিক বার্তার প্রতিবেদন। চট্টগ্রামের শিল্প-কারখানাগুলো পুরোপুরি অচল। ফলে রফতানিমুখী শিল্পগুলোর বিদেশী ক্রেতা হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্ব বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। শিল্প খাতে গ্যাসের বাড়তি সরবরাহ নিশ্চিত করতেই হবে। বণিক বার্তার পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনেই বলা হয়েছিল, জ্বালানি গ্যাস খাতের পরিকল্পনা ছিল ঋণ ও আমদানিনির্ভর। তারই ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর লক্ষ্য নেয়া সরকারের জন্য তাই দ্রুত জ্বালানি সংকটের বিকল্প ও বহুমুখী সমাধান খুঁজতে হবে।
বিদ্যমান সংকটটি সম্প্রতি তৈরি হয়েছে এমন নয়, বরং এটি জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়ন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না তোলার অমনোযোগের ফল। হঠাৎ এর সমাধান মিলবে না। তাই আগামী ৫-১০ বছরের জন্য সমন্বিত জ্বালানি কৌশল গড়ে তুলতে হবে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগস্টে চট্টগ্রাম সফরে এরই মধ্যে আগামী ১০ বছর মেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সমন্বিত রেখে এ পরিকল্পনার মধ্যে আঞ্চলিক বাজারে গ্যাস কেনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও শিল্প খাতের জন্য স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রাখা দরকার। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে জ্বালানি সংকট অতিরিক্ত বোঝা হয়ে গেছে। রফতানি বাড়ানোই আপাত সমাধান কিন্তু শিল্পে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ব্যতিরেকে তা বাধাগ্রস্ত। এমন বিপরীতমুখী চক্র সরকার ভাঙতে না পারলে জনঅসন্তোষ যেমন বাড়বে তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশীয় উৎপাদন।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নের কারণে এশিয়ার দেশগুলোই বেশি ভুগছে। পাকিস্তানে সমস্যাটি এত প্রবল যে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ চীন সাগরের মজুদ কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল এখনই পাওয়া সম্ভব নয়। সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ এ খাতের মাধ্যমে ১০ হাজার মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা সার্বিক চাহিদার জন্য পর্যাপ্ত নয়। তবু এখানে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার অংশ হিসেবে বিনিয়োগ করতে হবে। আর আশু সমাধানে পাইকারি জ্বালানি বাজারেই সমাধান খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য অবিলম্বে করণীয় হলো প্রতিবেশী দেশ যেমন মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি স্থাপন। মধ্য এশিয়ার প্রধান গ্যাস রফতানিকারক তুর্কমেনিস্তান এবং আজারবাইজান পার্সপেক্টিভ অব গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরামের (সাপেক) মাধ্যমে ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন প্রকল্পে বাস্তবায়ন করছে। এটিতে অংশগ্রহণের চেষ্টা আমরা করতে পারি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর নানা বিষয়ে কৌশলগত সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে। বিকল্প উৎসে জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে গ্যাস ও তেল সরবরাহের জন্য চীনের চুক্তি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, কাতার এবং আমেরিকার এলএনজি রফতানিকারকরা চীনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এবং সেখানে সরবরাহ শৃঙ্খল অপ্টিমাইজেশন সম্ভব। চীনের মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রবেশাধিকার আদায় করে নিতে হবে।
শিল্প খাতের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বাড়তি জ্বালানি সক্ষমতা পূর্বশর্ত। সরকার এক্ষেত্রে ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ ঘোষণার কথা ভাবতে পারে। এর অধীনে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, সুদের হার কমানো, কর রেহাই এমনকি লোডশেডিং সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা সংকট সমাধানের একটি নির্ধারিত সময়ের নিশ্চয়তা চান যাতে বাণিজ্য পরিকল্পনা করতে পারেন। সরকারকে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই গ্যাস সরবরাহের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা নির্ধারণ করতে হবে। জ্বালানি বরাদ্দ কাঠামোয় শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এটিকে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কাচ চুল্লি, ইস্পাত চুল্লি বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষা মাত্রা থাকবে। এভাবে সংকটকালে আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে সরবরাহ কমানো হলেও শিল্প খাতে স্থিতিশীল রাখা যাবে।
সরকার ২০২৯ সাল নাগাদ পায়রা, মোংলা এবং হিরণ পয়েন্টে তিনটি নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এলএনজি টার্মিনাল বাড়ানোর উদ্যোগ শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু বণিক বার্তারই ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে এলএনজি টার্মিনাল বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। তাই এখন জ্বালানি নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, চাহিদা নিয়ন্ত্রণও করতে হবে। আবাসিক ভোক্তাদের ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস দেয়া, যা কেবল সমৃদ্ধ পরিবারকে উপকৃত করে তার পরিবর্তন করতে হবে। গ্যাসের তীব্র ঘাটতির সময় অবৈধ ট্যাপিং একটি বড় সমস্যা। বণিক বার্তার প্রতিবেদনেই দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে পিক টাইমের পর দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা মেটার কথা থাকলেও তা কমছে না। এ অপচয় রোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতকে বিকল্প জ্বালানির দিকে ধীরে ধীরে রূপান্তর করতে হবে। বায়োমাস, সৌরশক্তি অথবা হাইড্রোজেনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
জ্বালানি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোও প্রয়োজন। এ খাতে বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি এবং সঠিক লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থা নেই। এর বিকল্প হিসেবে স্বাধীন জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্থাপন করতে হবে। অনেক দেশে এ রকম সংস্থা রয়েছে এবং তারা কার্যকর ফল দেখাচ্ছে। সংকট মোকাবেলায় আমরা এখনই স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে শুরু না করলে আগামী দুই বছরেই শিল্পায়ন প্রক্রিয়া গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।