এইচএসসির ফলাফল আমাদেরকে যে ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে

আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা একটি অদ্ভুত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়! এর ব্যাপ্তি মাত্র দুই বছর। অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়। এ ভর্তি প্রক্রিয়া এবং নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে শিক্ষার্থীদের বেশকিছু সময় অপচয় হয়। অথচ মাধ্যমিকের চেয়ে প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপ্তি এবং সিলেবাস বেশ কয়েক গুণ বেশি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের প্রথম বর্ষ পরীক্ষার সময় এসে যায়, তখন অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লেজেগোবর অবস্থা হয়ে যায়।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী শ্রেণী হলো উচ্চ মাধ্যমিক। সেই পরীক্ষার ফল বের হয়েছে গতকাল, ১৬ অক্টোবর। এবার পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গতবারের চেয়ে পাসের হার কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এখানে আরেকটি অদ্ভুত বিষয় ঘটেছে যেজন্য পরীক্ষক অর্থাৎ শিক্ষকরাই দায়ী। তারা অসাবধানতাবশত উত্তরপত্রের ওপর নম্বর বসানোর সময় ভুল করেন যা নিরীক্ষণে বের হয়, প্রতি বছরই এ ঘটনা ঘটে। ৩৪৫ প্রতিষ্ঠান থেকে সবাই পাস করেছে এবং ২০২টি থেকে কেউই পাস করেনি। এটিও পুরনো খেলা। ঢাকা মহানগরীতে ফেলের হার ১৬ শতাংশ, এটি একটি ইন্ডিকেটর। এখানকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক সব গ্রুপই সচেতন এবং সমাজের অগ্রগামী। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ আর কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এবার বেশি ফেল করেছে হিসাববিজ্ঞান, আইসিটি, উচ্চতর গণিত ও ইংরেজিতে।

এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী। প্রায় ৩১ হাজার শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। গত এক-দুই বছরের একটি ভয়ানক চিত্র এটি। বিশাল অংকের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, সোয়া ১২ লাখ শিক্ষার্থী অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল চূড়ান্ত ফলের। কারণ এ ফল তাদের বলে দেবে তারা উচ্চশিক্ষার কোন ডিসিপ্লিনে ভর্তির চেষ্টা করবে, কারা কর্মসংস্থান খুঁজবে ইত্যাদি। তাই এ পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু আমাদের পাবলিক পরীক্ষার ফল বহু বছর ধরেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক কোনো বার্তা বহন করে না। বহু কারণের মধ্যে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সময়ের অপচয়, শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে অনুপস্থিতি, ধরাবাঁধা ও একই নিয়মের প্রশ্নপত্র যা পরীক্ষায় পাস করানোর উদ্দেশ্যেই তৈরি, উদারভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও পাসের জন্য খয়রাতির নম্বর প্রদান—এ যেন কোনো রকমে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা সিঁড়ি পার করিয়ে দেয়া! তবে বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা খয়রাতির নম্বর প্রদান না করার জন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোকে নির্দেশ দেয়া পর্যন্ত এমনটাই ছিল চিত্র। কিন্তু সেটি এত বছরের অভ্যাসে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। গত সপ্তাহে ঢাকার বাইরের একটি সরকারি কলেজের এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা হলো। তাদের কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী। আমি প্রশ্ন করলাম আপনার দুই-তিনজন ইংরেজি বা বাংলা শিক্ষক এত শিক্ষার্থীদের কীভাবে ম্যানেজ করেন। তিনি উত্তর দিলেন যে শিক্ষার্থীরা তো ক্লাসে আসে না। মাত্র ছয় থেকে বারজন শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থাকে। তাও আজ যাদের দেখা যায় আগামীকাল আবার নতুন মুখ। আমি বললাম এ নিয়ে তো আপনারা কোনো কথা বলেন না। উত্তরে বললেন, ‘আমাদের কথা বলে লাভ কী?’ ক্লাসে না এলেও শিক্ষার্থীরা ফেল তো করছে না। ক্লাসে না এসেও যখন ফেল করছে না তখন ক্লাসে কেন আসবে?

আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা একটি অদ্ভুত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়! এর ব্যাপ্তি মাত্র দুই বছর। অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়। এ ভর্তি প্রক্রিয়া এবং নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে শিক্ষার্থীদের বেশকিছু সময় অপচয় হয়। অথচ মাধ্যমিকের চেয়ে প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপ্তি এবং সিলেবাস বেশ কয়েক গুণ বেশি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের প্রথম বর্ষ পরীক্ষার সময় এসে যায়, তখন অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লেজেগোবর অবস্থা হয়ে যায়। কারণ পড়ার টেবিলে ঠিকমতো বসতেই পারেনি, সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে এখনো তেমন গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি যা আনন্দদায়ক শিক্ষার জন্য অপরিহার্য। সিলেবাস পুরোটা বুঝে উঠতে পারেনি অথচ পরীক্ষা এসে গেছে। শিক্ষার্থীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ অর্থাৎ যারা প্রথম থেকেই সিরিয়াস তারা ছাড়া অনেককেই অথৈ জলে পড়তে হয়। তখন শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর বা বন্ধের বিভিন্ন ছলচাতুরী খোঁজে এবং বলপ্রয়োগ অর্থাৎ আন্দোলনে নেমে যায়। তাদের তরুণ বয়সের ধারণা, বাকি যে এক বছর আছে ওই সময়ের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের সব সিলেবাস শেষ করে ফেলবে। সেটি আসলে আরো বিপদ ডেকে আনার মতো অবস্থা।

আমি বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়েছি। তখন মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা কলেজের বিভিন্ন ভবনে তালা দিয়ে হাতে হকিস্টিক, এমনকি পিস্তল নিয়ে মহড়া দিয়েছিল। আমরা যারা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তারা পরীক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে হলের দিকে যাওয়ামাত্র আমাদের ক’জন সহপাঠীর ওপর আন্দোলনকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা সবাই এখন দেশের নামকরা ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, সেনাবাহিনীতে জেনারেল পর্যায়ে চাকরিরত। কলেজের অধ্যক্ষ এবং সিনিয়র শিক্ষকরা উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের কাছে এসে বহু অনুরোধ করে বলেছিলেন, তোমাদের প্রশ্নপত্র বহু কষ্ট করে ঢাকার বিজি প্রেস থেকে আনতে হয়, তোমাদের একটি ভবিষ্যৎ আছে, আমাদেরকেও ডিপিইতে জবাবদিহি করতে হয়, তোমরা যা পারো, পরীক্ষায় বসো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই পরীক্ষায় বসবে না। বহু অনুরোধের পর পরিবর্তিত ও পেছানো একটি তারিখে কোনো রকম পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছিল।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মতো কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে গেলে সুবিধা হলো বিশাল ক্যাম্পাস, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, চলাফেরা, ওঠাবসা যা এক বিশেষ ধরনের শিক্ষা। অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খাপ খাওয়াতে সময় লেগে যায়। দ্বিতীয়ত, সিনিয়র শিক্ষকরা তাদের ডিগ্রি ও অনার্সের শিক্ষার্থীদের বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসকে তারা মনে করেন, হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণী অথবা মাধ্যমিকের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর মতো। তাই তারা গুরুত্ব দেন না। যদিও উচ্চ মাধ্যমিকেই এসব কলেজে তুখোড় শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। যেমন আমাদের ব্যাচেই ডজন দুয়েক ডাক্তার, ডজন খানেক ইঞ্জিনিয়ার, সেনা অফিসার, শিক্ষা ক্যাডার, জেনারেল ক্যাডার, বড় বড় ব্যাংক কর্মকর্তা (বাংলাদেশ ব্যাংকসহ)। অথচ সব বিষয়ের শিক্ষকরা তাদের অনার্স শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, শুধু যেসব বিষয়ে অনার্স ছিল না সেসব বিভাগের শিক্ষকরা উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিতেন। ঢাকা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক বহু কাল থেকে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে, সেখানেও কি এসব সমস্যা নেই? অবশ্যই আছে।

এক্ষেত্রে দেশের শিক্ষা বিভাগকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠান একটু বড় হলে দশম শ্রেণীর সঙ্গে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী খুলে ফেলার চিন্তা করা উচিত। এখন মাধ্যমিকে অনেক মাস্টার্স পাস শিক্ষকরা যোগদান করছেন। তারা পড়াতে পারবেন। তাতে শিক্ষার্থীদের অন্য কলেজে ভর্তি হওয়ার আলাদা টেনশনে ভুগতে হবে না, সময় নষ্ট হবে না, অ্যাডজাস্টমেন্টের সমস্যা কমে যাবে এবং অযথা নতুন কলেজে ভর্তি হওয়ার উত্তেজনা আর রোমান্স কেটে যাবে। আর উপরোক্ত যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম সেগুলোও তরুণ শিক্ষার্থীদের জীবনে ঘটবে না।

এবার এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হাসের নিম্নমুখী। এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন, শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার ব্যাপারে অনেকটাই বিমুখ। তারা অনেকটাই পড়ার টেবিল থেকে দূরে ছিল বলে আমাদের ধারণা। এ ফল নিয়ে আমাদের চর্চা করতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসতে হবে, বোর্ডগুলোকে বসতে হবে। শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মোটিভেট করব। শিক্ষা ক্ষেত্রে মোটিভেশন একটি কার্যকরী বিষয়, যেটির প্রচলন আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে তেমন একটা নেই। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান তাই যথার্থই বলেছেন—যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে একেবারেই পাস করেনি তাদের অনুপ্রেরণা দেয়া হবে। যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণী পরীক্ষা থেকে শুরু করে বার্ষিক পরীক্ষা, টেস্ট পরীক্ষা এবং বোর্ড পরীক্ষায় কড়াকড়িভাবে দেখতে হবে। প্রতিটি স্তরে মূল্যায়ন সঠিক হতে হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বুঝতে পারেন না তাদের সন্তানদের অবস্থা, শিক্ষার্থীরা নিজেরাও বুঝতে পারে না তারা কোন অবস্থায় আছে। এর কারণ হচ্ছে প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বস্তরেই চলে সহানভূতি আর খয়রাতির পাস। ফলে শিক্ষার্থীও বোঝে না কেন তাকে প্রতিষ্ঠানে আসতে হবে, কেন শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত আসতে হবে। শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত থাকার হার ভয়ানকভাবে কমে গেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও রাষ্ট্রকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেলে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও বাড়বে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত থাকতে হবে। এখানে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অভিভাবকদেরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

আরও