শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশনা ব্যবসা ও কাজী আনোয়ার হোসেন

(গতকালের পর) বলা যেতে পারে, বাংলা পেপারব্যাক প্রকাশনার পথিকৃৎ হয়ে উঠলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, তৈরি করলেন বই বিপণনের এক অনন্য মডেল। নগদ কারবারে বিশ্বাসী সেবা প্রকাশনীর বই সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকল—রেলস্টেশনের বুক স্টলে, হকারের হাতে, ফুটপাতে পত্রিকা বিক্রেতার কাছে। পরিবেশক বা বিক্রেতারা নগদ টাকায় সেবার বই কিনে নিয়ে

(গতকালের পর)

বলা যেতে পারে, বাংলা পেপারব্যাক প্রকাশনার পথিকৃৎ হয়ে উঠলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, তৈরি করলেন বই বিপণনের এক অনন্য মডেল। নগদ কারবারে বিশ্বাসী সেবা প্রকাশনীর বই সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকল—রেলস্টেশনের বুক স্টলে, হকারের হাতে, ফুটপাতে পত্রিকা বিক্রেতার কাছে। পরিবেশক বা বিক্রেতারা নগদ টাকায় সেবার বই কিনে নিয়ে যেতেন বা তাদের কাছে ডাকযোগ বই পৌঁছে দেয়া হতো টাকা পাওয়ার পর। ডাক বিভাগের ভ্যালু পেইড পোস্ট (ভিপিপি) আর মানি অর্ডার ব্যবস্থাকে বই বিপণণে বেশ সাফল্যের সঙ্গেই কাজে লাগিয়েছে সেবা প্রকাশনী। একটা সময়ে সেবা প্রকাশনীর বই বিপণনে ছোট পিকআপ ভ্যানগাড়ির ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই গাড়ির গায়ে একপাশে বড় করে ‘মাসুদ রানা’, আরেক পাশে ‘কুয়াশা’ লেখা থাকত। সত্তরের দশকের শেষভাগে উত্তরবঙ্গে কিছুদিন এর মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালায় সেবা।

গ্রাহক হলে পাঠকের ঠিকানায় ডাকযোগেও পৌঁছে যেতে থাকল সেবার বই। যেমন ১৯৮৩ সালের মে মাসে রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ বের হয়। এটি বাংলায় রূপান্তর করেন রকিব হাসান। বইটির তৃতীয় প্রচ্ছদে ‘বই পেতে হলে’ শিরোনামে যে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়, তাতে বলা হয়: ‘আমরা চাই, ক্রেতা-পাঠক তাঁদের নিকটস্থ বুকস্টল থেকেই সেবা প্রকাশনীর বই সংগ্রহ করুন। কিন্তু অনেক ঘুরে, অনেক খুঁজে, পুস্তক বিক্রেতাকে অনেক অনুরোধ-উপরোধ করেও অনেক পাঠক সেবার কোনো কোনো বই সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে আমাদের কাছে চিঠি আসে। তাঁদের জন্য আমরা ডাকযোগে খুচরো বই সরবরাহের ব্যবস্থা নিয়েছি। ইচ্ছে করলেই আপনি এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেন। আজই মানি অর্ডার যোগে ৫০ টাকা পাঠিয়ে গ্রাহক হয়ে যান। নতুন বই প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে পৌঁছে যেতে থাকবে আপনার ঠিকানায়। নতুন নিয়মাবলি ও বিনামূল্যে ক্যাটালগের জন্য সেলস ম্যানেজারের কাছে লিখুন। নিজের ঠিকানা ও চাহিদা পরিষ্কার অক্ষরে লিখবেন।’ সে সময় ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকায় অন্তত চারটি বই পেতেন একজন গ্রাহক।

আবার একই বইয়ের আলোচনা বিভাগে একজন পাঠক অভিযোগ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন যে ‘মেজর রাহাত-১’ বইটির ১৪৫ থেকে ১৬০ এবং ২৪১ থেকে ২৫৬ পাতাগুলো নেই। তিনি আরো জানতে চেয়েছিলেন বইটি ফেরত পাঠালে বদলে দেয়া যাবে কিনা। জবাবে কাজীদা বলেছিলেন বইটি সেবা প্রকাশনীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে। এর বিপরীতে একটি ভালো বই তাকে দেয়া হবে। বস্তুত, বাঁধাই বা মুদ্রণজনিত সমস্যা হলে যেকোনো বই সেবার ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠালে তার বদলে একই বইয়ের ভালো একটি কপি ওই পাঠককে ফেরত পাঠানোর প্রথাও চালু করেছিল সেবা। তবে ফেরত পাঠানোর ডাক মাশুল পাঠককে বহন করতে হতো আর বদলি বইয়ের খরচ বহন করত সেবা। এটাও পাঠক-ক্রেতাদের কাছে সেবা প্রকাশনীর আস্থা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।

এভাবে কুশলী ও সৃজনশীল বিপণন কার্যক্রমের মাধ্যমে সেবা প্রকাশনী একটি কনজিউমার লয়ালটি বা অনুগত ভোক্তা দল  তৈরি করতে সক্ষম হয়, যারা মাসুদ রানা ও কাজী আনোয়ার হোসেন তথা সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে এক ধরনের আবেগী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ ভোক্তারা নিয়মিত সেবার বই কেনা ও পড়া, বিভিন্ন মাধ্যমে সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং সেবার প্রকাশনীর কাছ থেকে প্রত্যুত্তর পাওয়াকে তাদের এক অনিবার্য পাওয়া বলে মনে করে। সময়ের পরিক্রমায় নতুন পাঠক-ভোক্তা যোগ হয়, পুরনো অনেক ভোক্তা ঝরে পড়ে। কিন্তু অনুগত ভোক্তা দল বহাল থাকে। 

তিন. সেবা প্রকাশনী বাংলাদেশী পাঠকের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল সত্তরের দশকেই, যা বিস্তার লাভ করে আশির দশকে। বাজারে তখন ভারতীয় বিভিন্ন বাংলা বইয়ের পাইরেটেড সংস্করণ ছড়িয়ে পড়েছে। সস্তায় মিলছে বলে অনেকে কিনছে দেদার। তবে সেবার কিশোর ক্ল্যাসিক, কিশোর থ্রিলার, অনুবাদ আর ওয়েস্টার্ন  সিরিজের মতো বৈচিত্র্যময় অথচ কম দামি প্রকাশনাগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই বাজার থেকে পাইরেটেড ভারতীয় বইগুলোকে বহুলাংশে হটিয়ে দেয়। পাঠক বিশেষত কিশোর-তরুণদের কাছে প্রজাপতি প্রতীকসংবলিত সেবার বই হয়ে ওঠে এক মহা আকর্ষণ। সেবার বই মানেই মাসুদ রানা, আর মাসুদ রানা পড়া মানেই ছেলেপুলে গোল্লায় যাওয়া—অভিভাবকদের ভেতর এ ধারণা ভালোভাবেই গেঁড়ে বসেছিল। তাতে রানার বা সেবার বইয়ের কাটতি কমেনি। অন্যদিকে পাঠকের চাহিদা অনুসারে বই লেখা, অনুবাদ ও রূপান্তরের জন্য নতুন নতুন লেখক-অনুবাদক যোগ দিতে থাকেন সেবা প্রকাশনীতে। মাসুদ রানা সিরিজের বইগুলো একটা পর্যায়ে আড়াল থেকে বিভিন্ন লেখককে দিয়ে লেখানো শুরু হয়। একইভাবে আরো কিছু বইও আড়াল থেকে একাধিক লেখক লিখেছেন। পুরো কাজটিই ছিল বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এবং নির্ধারিত সম্মানীর বিনিময়ে। ফলে লেখক ও অনুবাদক তৈরির একটি কাজও হয়ে যায় এভাবে।

ক্যাটালগ বা ‘পুস্তক পরিচিতি’ নামে সাড়ে চার ফর্মার একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। এতে তখন পর্যন্ত সেবার প্রকাশিত সব বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হয়েছিল নাম ও লেখকের নামসহ। সেবার বই বিক্রেতাদের তো বটেই, অনেক পাঠককেই ডাকযোগে এ ক্যাটালগ পাঠানো হয়েছিল। এ ক্যাটালগ হাতে নিয়ে সেবার অনেক অনিয়মিত পাঠক পুরনো বিভিন্ন বই সংগ্রহ করতে উঠে-পড়ে লাগেন। ফলে খুব দ্রুত এ ক্যাটালগ ফুরিয়ে যায়। আর তাই বহু পাঠক চিঠি লিখে ক্যাটালগ চেয়ে হতাশ হয়েছেন। তাদের অবশ্য মূল্য তালিকা পাঠানো হয়েছিল। এরপর নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে আরেকবার ক্যাটালগ ছাপা হয়েছিল। ততদিনে সেবার প্রকাশিত বই ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ক্যাটালগের কলেবর ঠিক রাখতে বই পরিচিতি এক বা দুই বাক্যে দেয়া হয়েছিল।

চার. সেবার লেখকদের নিয়মিত রয়্যালটি বা সম্মানী প্রদানের প্রথাও চালু হয় প্রায় শুরু থেকে। সাধারণত বই প্রকাশের এক মাস পরে বই বিক্রির সংখ্যা হিসাবে নিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে এ রয়্যালটি দেয়া হয়। তারপর প্রতি তিন মাস অন্তর বিক্রির ভিত্তিতে কিস্তি। এমন ঘটনাও আছে যে কোনো লেখক বহু বছর পরে সেবায় এসেছেন আর তখনই তার জমে থাকা ত্রৈমাসিক কিস্তির টাকা হিসাব করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। একইভাবে চালু করা হয় পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার ব্যবস্থাও। প্রথম দিকে পাণ্ডুলিপি সম্পাদককে সম্মানী দেয়া হতো সরাসরি প্রকাশনা থেকে। এরপর লেখকের রয়্যালটি থেকে সেই সম্মানী কর্তন করার রীতি চালু হয়েছিল। সেবার বেতনভুক্ত কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানের বিষয়টিও উল্লেখ করতে হয় এ প্রসঙ্গে। সর্বোপরি বছরজুড়ে বই প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সেবা প্রকাশনী তার বাজার ধরে রাখা ও বাড়ানোর কাজটিতে জোর দেয়। আর তাই একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক কোনো বই প্রকাশের দিকে যায়নি সেবা, যদিও বইমেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় হওয়া স্টলের অন্যতম হলো সেবার স্টল। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের অন্যতম হলো সেবা প্রকাশনী। এভাবে সেবাকে একটি দায়িত্বশীল ও পেশাদারি প্রকাশনা সংস্থায় রূপ দেন কাজী আনোয়ার হোসেন।

পাঁচ. প্রায় পাঁচ যুগ ধরে বই প্রকাশ করে চলেছে সেবা প্রকাশনী, যার পুরোভাগে ছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। এ সময়কালে ত্রুটি-বিচ্যুতিও কম নয়। বাণিজ্যিকভাবে সফল না হওয়ায় একটা পর্যায়ে কিশোর পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়, যা ১৯৯২ সালে প্রথম প্রকাশ শুরু হয়। আবার হার্ডবাউন্ডে সাদা কাগজে বাছাইকৃত বই প্রকাশের জন্য প্রজাপতি প্রকাশনের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৯১ সালে। কালক্রমে সেটার যবনিকাপাত ঘটে। আবার মাসুদ রানার কপিরাইট নিয়ে প্রখ্যাত লেখক শেখ আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিরোধ শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গড়ায়। তাদের দুজনের চার দশকের বেশি সময়ের সম্পর্ক তিক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। আর কাজী আনোয়ার হোসেনের চিরবিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে সেবা প্রকাশনীর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। উত্তরসূরিরা কীভাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবেন, সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ব্যবসার আদল সমন্বয় করবেন, তা দেখার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। পাশাপাশি বাংলা প্রকাশনা জগতে সেবা প্রকাশনীর এ আদলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপণন তথা ব্যবসায় শিক্ষা শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে। তাতে প্রকাশক-উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী কাজী আনোয়ার হোসেন ও সেবা প্রকাশনীর ব্যবসাবিষয়ক বিভিন্ন দিক উন্মোচন হতে পারে। (শেষ)

 

তানিম আসজাদ: লেখক ও সাংবাদিক

আরও