শ্রদ্ধাঞ্জলি

মোবাশ্বের ভাই বেঁচে থাকবেন কর্মে ও আদর্শে

মোবাশ্বের ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় পেশাগত সূত্রে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেখা হলেও একসঙ্গে কাজের সূচনা ঢাকা শহরের জলাশয় রক্ষার আন্দোলনের সূত্রে। জলাশয় আইন প্রণয়নকালে তার সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা শহরের মহাপরিকল্পনা বা ড্যাপ চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে আবারো একসঙ্গে কাজ করা হয়। এ পর্যায়ে আমিও খানিকটা পরিণত। ড্যাপে দেয়া

মোবাশ্বের ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় পেশাগত সূত্রে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেখা হলেও একসঙ্গে কাজের সূচনা ঢাকা শহরের জলাশয় রক্ষার আন্দোলনের সূত্রে। জলাশয় আইন প্রণয়নকালে তার সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা শহরের মহাপরিকল্পনা বা ড্যাপ চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে আবারো একসঙ্গে কাজ করা হয়। পর্যায়ে আমিও খানিকটা পরিণত। ড্যাপে দেয়া পরামর্শকের কিছু সুপারিশের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। প্রথম দফায় আমাদের আপত্তির কথা আমরা জানাই প্রয়াত জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারকে। খুব সহজেই আমাদের আপত্তির যৌক্তিকতা বুঝে গেলেন স্যার। স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী আমি, স্থপতি ইকবাল হাবিব, স্থপতি ইশরাত ইসলামসহ আরো জন যোগাযোগ করলাম মোবাশ্বের ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি বললেন, এভাবে জলাশয়কে আবাসনে রূপান্তর করার প্রস্তাব কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যোগ দিলেন আমাদের প্রতিবাদে। একপর্যায়ে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিহত করতে সক্ষম হলাম ২০০৮-এর ড্যাপের জলাশয়বিরোধী প্রস্তাবগুলো। এর পর থেকে একসঙ্গে পরিবেশকর্মী হিসেবে পথচলায় আর কোনো ছেদ পড়েনি।

দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরের পরিবেশ আন্দোলনে মোবাশ্বের ভাই কখনো ছিলেন পাথেয়, কখনো সহযোদ্ধা। ধানমন্ডির একটি মাঠকে ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় দিয়ে দেয়া এবং সেখানে জনগণের প্রবেশাধিকার রোধে তিনি রাস্তায় নেমে ছিলেন। খেলার মাঠে গরুর হাট, বাণিজ্য মেলা এসব অনাচারের বিরুদ্ধে মোবাশ্বের ভাই কখনো কম্পিত কণ্ঠে প্রতিবাদ করেননি। স্পষ্ট উচ্চারণে জানিয়ে ছিলেন তার বিরোধিতার কথা। খেলার মাঠ দখলমুক্ত করতে আদালতের আশ্রয়ও নিয়েছিলেন। দেখা হলেই কিংবা কখনো কখনো ফোন করেও তার দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত শুনানির উদ্যোগ নিতে আমাকে আর ব্যারিস্টার সারা হোসেনকে প্রায়ই তাগাদা দিতেন। খেলাধুলার একজন পৃষ্ঠপোষক হিসেবে খেলার মাঠগুলো দৈনদশা আর এগুলোর দখল তাকে ক্ষুব্ধ করত। জীবনের শেষ টি মাসে আমাকে বারবার তাগিদা দিয়েছেন ঢাকার সব খেলার মাঠ দখলমুক্ত করতে একটি জনস্বার্থমূলক মামলা করার জন্য। তেঁতুলতলা মাঠ আন্দোলনে মোবাশ্বের ভাই যে অবদান রেখেছেন তা অতুলনীয়। সরকারের পক্ষ থেকে মাঠ ব্যবহারের ঘোষণা এলে তিনি জানিয়ে দেন এলাকাবাসী চাইলে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট মাঠের নকশা বিনা খরচে করে দেবে। সে সময়টুকু মোবাশ্বের ভাই আর পাননি। যদিও তার নকশায় করা প্রশিকা, গ্রামীণ ব্যাংক ভবন এবং চট্টগ্রাম রেল স্টেশন তার কীর্তির সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের আংশিক সফলতা দেখে উচ্ছ্বসিত মোবাশ্বের ভাই আমাকে আর গ্রিনভয়েসের আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ মে, ২০২২ ছুটে গিয়েছিলেন ধূপখোলা মাঠে। একরের মাঠে নির্মিত হচ্ছে একটি মার্কেট। সে নির্মাণের বিরুদ্ধে যে উকিল নোটিস পাঠানো হয়েছে তাতে মোবাশ্বের ভাইও একজন অভিযোগকারী। সেদিন গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য চাইলেন মোবাশ্বের ভাই। বললেন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যান। একটু চিন্তিত হলেও কর্মচঞ্চল মোবাশ্বের ভাইকে এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলব তা বুঝতে পারিনি। ধূপখোলা মাঠে দাঁড়িয়েই পরিকল্পনা হলো দখলে থাকা সব মাঠ আমরা একে একে পরিদর্শনে যাব এবং ২০২৩ সাল থেকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করব। মোবাশ্বের ভাই কথা রাখলেন না।

চিন্তা-চেতনায় অত্যন্ত স্বচ্ছ স্পষ্ট ছিলেন মোবাশ্বের ভাই। বাফুফে যখন কক্সবাজারে বন কেটে ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তখন তিনি একটুও পিছপা হননি তার বিরোধিতা করতে। এখানেই তার সঙ্গে অন্যান্য ক্রীড়া নেতৃত্বের পার্থক্য।

কারো কারো হয়তো এমন ধারণা মোবাশ্বের ভাই কেবল নগর পরিবেশ নিয়েই ভাবতেন। মোবাশ্বের ভাই আসলে পুরো দেশ নিয়েই ভাবতেন। এর প্রমাণ মেলে বানীশান্তায় কৃষকের আন্দোলনে তার সর্বাত্মক সমর্থন। সেখানে কৃষকের তিন ফসলি জমিতে ড্রেজিং করা বালি ফেলছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। একজন মুক্তিযোদ্ধা মোবাশ্বের হোসেন বৈষম্যের উন্নয়ন মানতে পারেননি। আমরা কয়েকটি সংগঠন বানীশান্তায় কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকলেও মোবাশ্বের ভাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন ব্যক্তি হিসেবে। কথা ছিল ধান কাটার মোৗসুমে একসঙ্গে বানীশান্তায় যাওয়ার। তাও আর হলো না।

পরিবেশের বাইরেও মোবাশ্বের ভাই জনঅধিকার রক্ষার অনেক ক্ষেত্রেই অসংগতি, অন্যায় আর অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বারবার গ্যাস বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সরকারের আয়োজিত গণশুনানিতে অংশ নিয়েছেন, আদালতেও গিয়েছেন। মোবাশ্বের ভাই ছিলেন ক্রিকেট বোর্ডের একজন সাবেক পরিচালক। ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনে অনিয়ম নিয়েও তার ক্ষোভ ছিল। তার দায়ের করা একটি মামলায় একপর্যায়ে হাইকোর্ট ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনকে সামনে রেখে বোর্ডের সংবিধান সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে, যদিও পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগ ভিন্ন রায় দিয়েছিল। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষে ২০২২ সালের ৩১ জুলাই মোবাশ্বের ভাইয়ের দায়ের করা এক মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থতা এবং সেখানকার কর্তাব্যক্তির বেতন-ভাতা বিষয়ে হাইকোর্ট যে আদেশ দেন জনস্বার্থ রক্ষা প্রশাসনিক সংস্কারের পক্ষে তা মোবাশ্বের ভাইয়ের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

একজন সংগঠন মোবাশ্বের ভাই সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল অব এশিয়া এবং কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের। তিনি কেবল ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালকই ছিলেন না, ছিলেন ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের একজন সাবেক সভাপতি। এতসব বড় বড় সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা মোবাশ্বের ভাই অসংখ্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনকেও দিয়েছেন নেতৃত্ব উপদেশ। ব্যক্তি পর্যায়ে অসহায় মানুষের পাশে উদারভাবে তার দাঁড়ানোর কিছু দৃষ্টান্ত আমি জানলেও আমার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল তা প্রকাশের। তার ইচ্ছাকে সম্মান করে আজও তা প্রকাশ করলাম না যদিও ভাবতে অসহায় লাগছে যে ভবিষ্যতে আর কোনো বিপদগ্রস্তের প্রয়োজনে মোবাশ্বের ভাইকে আর ফোন করা হবে না।

মোবাশ্বের ভাই একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা অভিযান পরিচালনা করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে তিনি সব সময়, সব বৈরী আবহে তার অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে ভূমিকা নিয়েছেন। তিনি ছিলেন মুক্তমনা। তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান কখনো নাগরিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করেনি। সবকিছুর ওপরে তিনি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। সে কারণেই প্রায় সব যৌক্তিক নাগরিক আন্দোলনে তার ছিল সাবলীল অংশগ্রহণ এবং গ্রহণযোগ্যতা। অনেক হতাশা আর ক্ষোভের মাঝেও মোবাশ্বের ভাই নিঃশঙ্ক চিত্তে এবং নির্মোহভাবে কাজ করে গেছেন, যা সত্যিই অনুসরণীয়।

মোবাশ্বের ভাই একজন প্রাণবন্ত বক্তা ছিলেন। তার সঙ্গে ফোনালাপ কখনো সংক্ষিপ্ত হয়েছে, মনে পড়ে না। তার ছিল সব বিষয়ের দার্শনিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা। যখন গাছ কেটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় প্রকল্প গৃহীত হয় তখন নির্দ্বিধায় তার বিরোধিতা করেন মোবাশ্বের ভাই। আমাকে বুঝিয়ে দেন ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো উদ্যানের কোন অংশে ঘটেছিল আর কোন অংশে নেয়া হয়েছে প্রকল্প, যার প্রয়োজনে গাছ কাটা। -সংক্রান্ত মামলার শুনানির প্রস্তুতিতেও তিনি আমাকে সাহায্য করেন। বিশ্বের কোথায় কোথায় গাছ রেখে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ একজন পরিবেশবাদী স্থপতিরই তো জানার কথা।

মাত্র দিন আগেই ছিল মোবাশ্বের ভাইয়ের ৭৮তম জন্মদিন। সেদিন হাসপাতালে অচেতন তিনি। কথা হলো তার মেয়ে কৃষ্টির সঙ্গে। আমাদের দুজনেরই খুব আশা ছিল চিরতরুণ মুক্তিযোদ্ধা স্থপতি আবার অন্তত একবার হলেও চোখ খুলবেন, কথা বলবেন। তা আর হলো না। শেষবার কথা হয়েছিল নতুন ড্যাপের অসংগতি এবং সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে। মোবাশ্বের ভাই আর সে প্রক্রিয়ায় আমাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করবেন না। কিন্তু আমরা সে প্রক্রিয়ার সব ধাপে তাকে স্মরণ করব গভীর শ্রদ্ধায় আর ভালোবাসায়। একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকের কর্মের, আদর্শের আর চেতনার মৃত্যু হয় না।

 

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট

প্রধান নির্বাহী, বেলা

আরও