কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। এআই কেবল মানুষের কাজের গতি বাড়ায় না, বরং মানুষের সীমাবদ্ধতাগুলোকে অতিক্রম করে তথ্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ নিশ্চিত করে। এআই এমন এক প্রযুক্তিগত পরিমণ্ডল যেখানে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে অনুকরণের চেষ্টা করা হয়। আর এ অনুকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মেশিন লার্নিং। এটি এমন এক পদ্ধতি, যা পূর্বনির্ধারিত হার্ড কোড প্রোগ্রামিং ছাড়াই ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু শেখার সামর্থ্য রাখে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট, যেমন মাইক্রোসফট আজুর ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে এআই বাস্তবায়নের সবচেয়ে প্রায়োগিক কৌশলই হলো মেশিন লার্নিং। অর্থাৎ এআই হলো একটি বড় ছাতা, যার নিচে মেশিন লার্নিং একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। আর এআইয়ের বিকাশের ফলে গবেষণায় নতুন বিপ্লব ঘটেছে। কারণ এখানে তথ্যের যে মহাসমুদ্র তৈরি হয়েছে সেটি গবেষকদের কাজে আসছে।
বিশ্বজুড়ে গবেষণার জগৎ বর্তমানে এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনকে অনেকে বিশ শতকের ইন্টারনেটের উদ্ভাবন বা ব্যক্তিগত কম্পিউটারের প্রসারের সঙ্গে তুলনা করছেন। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির মতো ‘জেনারেটিভ মডেল’ এবং ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (এলএলএম) এখন কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞানের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন ইতিহাস, সাহিত্য, জীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি, চিকিৎসা এবং প্রকৌশলের মতো প্রতিটি একাডেমিক শাখার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি গবেষক তাদের পেশাগত কাজে নিয়মিত কোনো না কোনো এআই টুল ব্যবহার করছেন, যা মাত্র এক বছর আগেও ছিল ৪৫ শতাংশ। এ দ্রুত রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘দক্ষতা’। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভাণ্ডার প্রতি কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। একজন মানুষের পক্ষে এ বিশাল তথ্যসমুদ্র থেকে প্রয়োজনীয় অংশটুকু খুঁজে বের করে বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। এআই এ ‘তথ্য বিস্ফোরণ’ সামাল দেয়ার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এর অবারিত প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে একাডেমিক মহলে বিতর্কও কম নয়।
গবেষণার প্রাথমিক ধাপগুলোতে অর্থাৎ সৃজনশীল আইডিয়া তৈরি এবং খসড়া লেখনীর ক্ষেত্রে বর্তমানে চ্যাটজিপিটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় এআই টুল। এটি মূলত গবেষণার প্রাথমিক রূপরেখা বা আউটলাইন সাজানো এবং জটিল তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় রূপান্তরে সহায়তা করে। অন্যদিকে গুগলের জেমিনি সরাসরি ইন্টারনেটের বিশাল ডেটাসেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় এটি সাম্প্রতিকতম সংবাদ, পরিসংখ্যান এবং গবেষণার উপাত্ত খুঁজে পেতে গবেষকদের বিশেষ সুবিধা দেয়। দীর্ঘ গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ এবং অত্যন্ত মার্জিত ও পেশাদার ভাষায় সারসংক্ষেপ তৈরির জন্য ক্লডও গবেষকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। ক্লডের বিশেষত্ব এটি মানুষের মতো সংবেদনশীল ও সাবলীলভাবে লিখে যেতে পারে। তথ্য অনুসন্ধান এবং পূর্ববর্তী গবেষণাপত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এলিসিট (Elicit) একটি বিশেষজ্ঞ এআই সহকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি সরাসরি নির্ভরযোগ্য একাডেমিক ডেটাবেজ থেকে প্রাসঙ্গিক পেপার খুঁজে বের করে তার সারসংক্ষেপ প্রদান করে। সিম্যানটিক স্কলার (Semantic Scholar) ব্যবহার করে গবেষকরা লাখ লাখ পেপারের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং সবচেয়ে সাইটেশন-সমৃদ্ধ পেপারগুলো দ্রুত খুঁজে পেতে পারেন। তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পারপ্লেক্সিটি এআই (Perplexity AI) একটি নির্ভরযোগ্য সার্চ ইঞ্জিন। এটি প্রতিটি উত্তরের সঙ্গে মূল উৎসের (সাইটেশন) লিংক দিয়ে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে। এছাড়া নোটবুক এলএম (NotebookLM) গবেষকের নিজস্ব আপলোড করা ডকুমেন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয় নোট তৈরি এবং প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে।
এআই এখন অনেকের কাছে একজন অপরিহার্য ‘সহ-লেখক’। এটি অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখা, মেথডলজি সাজানো এবং উপযুক্ত কারিগরি শব্দচয়নে অভাবনীয় সহায়তা করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর গবেষকদের জন্য এটি একটি বড় আশীর্বাদ। অতীতে অনেক উচ্চমানের গবেষণা কেবল দুর্বল ইংরেজি ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রত্যাখ্যাত হতো। এআই এখন সেই ভাষাগত ব্যবধান ঘুচিয়ে দিচ্ছে, ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের গবেষকরাও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সমানভাবে নিজেদের মেধা প্রমাণ করতে পারছেন। গবেষণাপত্রের ভাষাগত ত্রুটি সংশোধনে গ্রামারলি (Grammarly) দীর্ঘকাল ধরে গবেষকদের আস্থার প্রতীক। এটি কেবল ব্যাকরণ নয়, বাক্যের টোন বা ভাবধারা ঠিক করতেও সাহায্য করে। কুইলবট (Quillbot) প্যারাফ্রেজিংয়ের মাধ্যমে লেখাকে আরো সুসংগত করে তোলে। বৈজ্ঞানিক লেখার জন্য ট্রিঙ্কা (Trinka) বিশেষভাবে তৈরি, যা কারিগরি ভুল শনাক্ত করতে পারদর্শী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুখবর হলো, ‘এআই রাইটার বাংলা’ এবং ‘অনুবাদিনী’র মতো টুলগুলোর উন্নয়ন। এর ফলে বাংলা ভাষায় উচ্চতর গবেষণা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ইংরেজি গবেষণাপত্রগুলো নির্ভুলভাবে বাংলায় অনুবাদ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যায় বর্তমানে তথ্যের পরিমাণ মানুষের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এআই অগোছালো তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা নকশা খুঁজে বের করতে অত্যন্ত দক্ষ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্রহের অবস্থান শনাক্ত করা থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য গবেষণায় মহামারীর পূর্বাভাস দেয়া—সব ক্ষেত্রেই এআই মানুষের বছরের কাজকে কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছে। ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং কম্পিউটেশনাল বায়োলজি ও বায়োইনফরমেটিকসের পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে একটি মৌলিক অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। কম্পিউটেশনাল বায়োলজিতে এআই এখন ‘ভুল থেকে শিক্ষা’ বা ট্রায়াল-এন্ড-এরর পদ্ধতির পরিবর্তে প্রকৌশলচালিত (ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রিভেন) উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জেনারেটিভ এআই মডেলগুলো এখন রক্ত-মস্তিষ্কের বাধা (ব্লাড ব্রেইন বেরিয়ার) অতিক্রম করতে সক্ষম এমন জটিল ওষুধ বা মাল্টি-স্পেসিফিক অ্যান্টিবডি ডিজাইন করছে। বায়োইনফরমেটিকসে এআই এখন ভিন্নধর্মী ডেটাসেটগুলোর মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছে। সাশ্রয়ী ‘লং-রিড সিকোয়েন্সিং’-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ জেনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রতিটি রোগীর জন্য একটি ‘ডিজিটাল টুইন’ বা ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা প্রিসিশন মেডিসিনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
জীববিজ্ঞানে জীবের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক জেনেটিক কোড বা জিন উদ্ঘাটন এবং জিন প্রকৌশলে মেশিন লার্নিং এবং এআইয়ের ব্যবহার আবশ্যক। এমনকি জিন প্রকৌশল বা জিন এডিটিংয়ের ফলাফল কী হবে তা এআই দ্বারা প্রাক অনুমান করা যায়। এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমে বিগ ডেটা বিশ্লেষণের লক্ষ্যে ‘ডেটা সায়েন্স’ এখন এক বিকাশমান বিজ্ঞান বা অধ্যয়নের বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা এখন আরো উন্নত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের মূল কৌশল হলো ‘আগে থেকে অনুমান এবং প্রতিরোধ’। এআই সিস্টেমগুলো এখন ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনভায়রনমেন্টাল সেন্সর বিশ্লেষণ করে কোনো এলাকায় মহামারীর আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইআইওএস সিস্টেম মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে রিয়েল টাইমে স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করছে। পূর্ব আফ্রিকার মতো স্বাস্থ্যকর্মী সংকটে থাকা অঞ্চলে এআই-চালিত ডায়াগনস্টিক টুলগুলো ৯০ শতাংশের বেশি নির্ভুলভাবে ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট প্রদান করছে। ‘ফেডারেটেড লার্নিং’-এর মতো কৌশলের মাধ্যমে ডেটার গোপনীয়তা বজায় রেখেই উন্নত মডেল তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরো নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করছে।
এত উন্নতির পরও এআই ব্যবহারের কিছু নৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি রয়েছে। এআইয়ের ব্যবহারে গবেষণার গতি বাড়লেও কিছু মারাত্মক ঝুঁকি বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভ্রান্ত তথ্য উৎপাদন। এআই মাঝে মাঝে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক রেফারেন্স তৈরি করে। কোনো গবেষক যদি যথাযথভাবে যাচাই না করে এ তথ্যগুলো ব্যবহার করেন, তবে ভুল বিজ্ঞান সমাজে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি এআইয়ের সহজলভ্যতা ‘পেপার মিল’-এর মতো অসাধু চক্রগুলোকে আরো শক্তিশালী করেছে। এ চক্রগুলো এআই ব্যবহার করে ভুয়া ডেটা ও তথ্য সাজিয়ে হুবহু আসল মনে হয় এমন গবেষণাপত্র তৈরি ও বিক্রি করছে। এভাবে একাডেমিক সততাকে ধূলিসাৎ করা হচ্ছে। এছাড়া পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়াও এখন সংকটের মুখে। অনেক পরীক্ষক নিজের মেধা প্রয়োগের বদলে এআই দিয়ে রিভিউ রিপোর্ট তৈরি করছেন, যা গবেষণার গোপনীয়তা নষ্ট করছে এবং প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। একে বলা হচ্ছে ‘অভিজাতদের ত্বরণ’—অর্থাৎ যারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে, তারা দ্রুত কাজ শেষ করে সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু বিজ্ঞানের গুণগত মান তাতে কতটা রক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এটি সত্য, বাংলাদেশের জন্য এআই এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের বৈপ্লবিক প্রভাবের সুফল পেতে হলে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের পাঠক্রমে এআই সন্নিবেশ করা প্রয়োজন। কিন্তু এ প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। দেশের সীমিত ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং বিশাল তথ্য বিশ্লেষণের অভাব এআই পূরণ করতে পারে। কৃষি গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ বা দুর্যোগ মোকাবেলায় পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের গবেষকরা এআইকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ভাষাগত বাধা দূর হওয়ায় বাংলাদেশী গবেষকদের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের হার ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘প্রযুক্তিগত বিভাজন’। উন্নত বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রিমিয়াম এআই টুল থাকলেও আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের সেই সামর্থ্য নেই। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘কগনিটিভ অফলোডিং’ বা চিন্তাশক্তি যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ক্যালকুলেটর যেমন আমাদের গাণিতিক দক্ষতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে, এআইয়ের ওপর অতিনির্ভরতা আমাদের মৌলিক গবেষণার বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
এআই যাতে বিজ্ঞানের ক্ষতি না করে সহায়কের ভূমিকা পালন করে, সেজন্য কিছু পদক্ষেপ জরুরি। প্রতিটি গবেষণায় এআইয়ের কতটুকু এবং কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এআই খসড়া তৈরি করতে পারে, কিন্তু তথ্যের সত্যতার চূড়ান্ত দায়ভার গবেষককেই নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর গবেষণার শুরুতেই ‘এআই নীতিশাস্ত্র’ বা এথিকস কোর্স বাধ্যতামূলক করা উচিত। সম্প্রতি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বা অনৈতিক তৎপরতা এ দেশে উদ্বেগের কারণ হিসেবে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয়। আর এ নৈতিক স্খলনের কারণে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত এ দেশের গবেষকদের অনেক প্রকাশিত প্রবন্ধ রিট্রাক্ট বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এটি খুবই অনৈতিক বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও আমাদের দেশে নির্লজ্জভাবে এ অপরাধের কারণে গবেষকের শাস্তির নজির বিরল। ফলে ক্রমশ প্রকাশিত প্রবন্ধের রিট্রাক্ট হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দেশের ভাবমূর্তির জন্য এক বিরাট হুমকি। এমন অবস্থা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশন করতে ইচ্ছুক বাংলাদেশের প্রকৃত গবেষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ বিষয়ে আমাদের একাডেমিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে।
পরিশেষে, গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার কোনো সাময়িক ফ্যাশন নয়। এটি এক চিরস্থায়ী বিবর্তন। বর্তমানে এআই জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মরণব্যাধি—পৃথিবীর জটিল সব সমস্যার সমাধান দ্রুততর করতে এটি আমাদের পথ দেখাচ্ছে। তবে এ গতির মূল্য যেন বিজ্ঞানের সততা ও নির্ভরযোগ্যতা দিয়ে মেটাতে না হয়। ভবিষ্যতের গবেষণা কেবল ‘মানুষ বনাম এআই’ নয়, বরং হবে ‘মানুষ এবং এআইয়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ মেলবন্ধন’। আমাদের মেধা, কৌতূহল ও নৈতিকতাকে অটুট রেখে এআইকে কেবল একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
ড. মো. তোফাজ্জল ইসলাম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি