বাজেট প্রতিক্রিয়া

সীমিত কিছু সুবিধা দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়

প্রায় সব সরকারই নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের ব্যাপারে নীতিগতভাবে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। কিন্তু সেই অঙ্গীকারের যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায় না।

এবার নতুন সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের একটি লক্ষ্যমাত্রা দেখিয়েছে। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায়নি। বলা যায়, বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের নির্দিষ্ট একটি অংশকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এতে সামগ্রিক খাতের উন্নয়নের বদলে একটি অসম ও সীমিত কাঠামো তৈরি হয়েছে। এমনটি দেশের টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের পথে নানা প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং অগ্রিম কর শূন্য শতাংশে নামিয়ে এনেছে। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সমস্যা হলো এ সুবিধা সৌরশক্তি খাতের সব অংশীজনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। অথচ এ খাতকে সত্যিকার অর্থে বিকশিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমান সুযোগ ও প্রণোদনা দিতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেবা কোম্পানি (রেসকো) ও ক্যাপেক্স (ক্যাপেক্স) মডেলের আওতায় বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি (পিপিএ) এবং বিদ্যমান এসআরও কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সুবিধা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এসব মডেলের আওতায় পরিচালিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ২০-২২ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে রেসকো ও ক্যাপেক্স মডেলের বাইরে থাকা হাজারো আমদানিকারক, পরিবেশক, ডিলার, খুচরা বিক্রেতা, প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব কর সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। অথচ সৌরশক্তির বিস্তারে তাদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ খাতের এত বড় একটি অংশকে বাদ দিয়ে সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে কখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা, সৌর স্ট্রিট লাইটিং এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের (বেজ) জন্য কোনো প্রণোদনা রাখা হয়নি। এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প চালু আছে। এগুলোর ব্যবহার করতে গিয়ে প্রতি বছর ডিজেল আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। সরকার যদি কৃষকদের সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পর্যাপ্ত কর সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা দিত, তাহলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেত। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী করত।

বর্তমান এসআরও অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপাদানের পরীক্ষণ সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ ছয় মাস সময় নেয়া যেতে পারে। এত দীর্ঘ সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব সৃষ্টি করে এবং ব্যয় বৃদ্ধি করে। দীর্ঘদিন ধরেই সৌরশক্তি খাতের উদ্যোক্তারা পরীক্ষণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট কিংবা বর্তমান এসআরও—কোনোটিতেই এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বর্তমানে সব আমদানীকৃত সৌর উপাদানের পরীক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়। কেবল নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতাধীন প্রকল্পগুলোর জন্য পরীক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য তৈরি করছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের আরেক সমস্যা হলো ওজনভিত্তিক শুল্কায়ন পদ্ধতি। এ পদ্ধতির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং প্রকল্পের মোট খরচ অযৌক্তিকভাবে বাড়ে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেনদেন মূল্যভিত্তিক শুল্কায়ন পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার এখনো এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রস্তাবিত বাজেটে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি, ব্যাটারি প্যাক এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণ উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শুল্ক ও কর অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। তবে মাত্র তিন বছরের জন্য এ সুবিধা দেয়া হলে আন্তর্জাতিক মানের ব্যাটারি শিল্প গড়ে তোলা কঠিন হবে। উৎপাদন অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন এবং প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তাই এ সুবিধা অন্তত ১০ বছরের জন্য বহাল রাখা উচিত।

বৃহৎ পরিসরের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সরকার রেসকো ও ক্যাপেক্স মডেলের প্রকল্পগুলোর জন্য কর সুবিধা ও কর রেয়াত ঘোষণা করলেও এসব প্রকল্প সম্প্রসারণে কোনো অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের কথা বলেনি। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ নিয়েও বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এ তহবিলের আকার ১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। তবে ৩০ কোটি টাকার ঋণসীমা এখনো ১০ মেগাওয়াটের মতো ইউটিলিটি স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থায়নের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে অনেক বিনিয়োগকারী এ সুবিধা পাচ্ছেন না। বৃহৎ পরিসরের প্রকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড (আইডিসিওএল) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া অনেকের জন্য জটিল। উচ্চমাত্রার জামানত, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং বিপুল পরিমাণ নথিপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনেক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ যদি সফল ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে। সৌরশক্তি খাতের সব অংশীজনের জন্য অন্তত আগামী পাঁচ বছর শূন্য শতাংশ করহার বহাল রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত এবং পূর্ণ আয়কর সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। ডিজেলচালিত সেচপাম্পের পরিবর্তে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কার্যকর আর্থিক প্রণোদনা চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে সব আমদানীকৃত সৌর উপাদানের পরীক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং একক জানালা ব্যবস্থার মাধ্যমে এক মাসের মধ্যে পরীক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচির আকার আরো বাড়াতে হবে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেন প্রকৃতপক্ষে ৫ শতাংশ সুদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ঋণ প্রদান করে তা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। পাশাপাশি আইডিসিওএলের ঋণ প্রক্রিয়া আরো সহজ, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করতে হবে, যাতে অধিকসংখ্যক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী এর সুবিধা নিতে পারেন।

মো. রাজিব: গবেষণা সহকারী, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)

আরও