নগর ভাবনা

ঢাকা শহরে বর্জ্য পোড়ানো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

ঢাকা মহানগর আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও দূষিত নগরী হিসেবে পরিচিত। দ্রুত নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত সচেতনতার অভাব এ নগরীকে ক্রমে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে।

বিশেষ করে কঠিন বর্জ্য বা সলিড ওয়েস্ট পোড়ানোর প্রবণতা এবং উন্মুক্ত ল্যান্ডফিলে বর্জ্যের স্তূপ ঢাকা শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে খোলা স্থানে ফেলা হচ্ছে কিংবা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া, ক্ষতিকর গ্যাস এবং ভারী ধাতুর কণা ছড়িয়ে পড়ছে; যা মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও সামগ্রিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। নগর সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি এর সঠিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ঢাকা শহরে এখনো আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো পর্যাপ্ত নয়। ফলে বর্জ্য পোড়ানো যেন একটি সহজ কিন্তু বিপজ্জনক সমাধানে পরিণত হয়েছে।

ঢাকায় মানুষ বিভিন্ন কারণে কঠিন বর্জ্য বা সলিড ওয়েস্ট পোড়ায়। এর পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা সমস্যা জড়িত। ঢাকায় সলিড ওয়েস্ট পোড়ানোর প্রধান কারণ হলো দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য, পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। অনেকের কাছে এটি দ্রুত ও সহজ উপায় বলে মনে হয়, যদিও এর ফলে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। প্রথমত, ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা তৈরি হলেও অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না। ফলে রাস্তার পাশে, ড্রেনের ধারে বা খোলা স্থানে ময়লা জমে থাকে। এই জমে থাকা আবর্জনা দ্রুত সরানোর জন্য অনেক মানুষ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও দ্রুত নগরায়ণও একটি বড় কারণ। ঢাকায় অল্প জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করে। এতে প্রতিদিন প্রচুর প্লাস্টিক, পলিথিন, খাদ্যবর্জ্য ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষে সব বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ নিজেরাই বর্জ্য পুড়িয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। তৃতীয়ত, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেক মানুষ জানে না যে প্লাস্টিক, রাবার বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য পোড়ালে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। এসব ধোঁয়া বাতাস দূষিত করে এবং মানুষের ফুসফুস, চোখ ও ত্বকের ক্ষতি করে। কিন্তু অনেকেই তা গুরুত্ব দেয় না। চতুর্থত, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও একটি কারণ। নিম্ন আয়ের এলাকায় অনেক সময় সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকে না। বর্জ্য পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করতে খরচ লাগে বলে কিছু মানুষ সহজ উপায় হিসেবে আগুন ব্যবহার করে। পঞ্চমত, আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও এ সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে। যদিও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ, তবুও নিয়মিত নজরদারি ও শাস্তির অভাবে এ কাজ চলতে থাকে। এছাড়া বর্ষাকালে ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে অনেক মানুষ দ্রুত ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য ময়লা পুড়িয়ে ফেলে। বাজার এলাকায় ব্যবসায়ীরাও দিনের শেষে জমে থাকা বর্জ্য কমানোর জন্য আগুন ব্যবহার করে।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন রাস্তার পাশে, খোলা মাঠে, ড্রেনের পাশে কিংবা বাজার এলাকায় বর্জ্য পোড়ানোর দৃশ্য খুবই সাধারণ। প্লাস্টিক, পলিথিন, কাগজ, কাপড়, রাবার, চিকিৎসা বর্জ্য, ইলেকট্রনিক বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের কঠিন বর্জ্য একত্রে আগুনে পোড়ানো হয়। এসব বর্জ্য পোড়ানোর ফলে ডাইঅক্সিন, ফিউরান, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ডাইঅক্সিন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত। এটি ক্যান্সার, হরমোনজনিত সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং শিশুদের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া বাতাসে মিশে পুরো নগরীর বায়ুদূষণ বাড়িয়ে তোলে। ঢাকায় শীতকালে বায়ুদূষণের মাত্রা এমনিতেই বিপজ্জনক পর্যায়ে থাকে; তার ওপর বর্জ্য পোড়ানো এ পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে।

বায়ুদূষণের ফলে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের সংক্রমণ, অ্যালার্জি, চোখ জ্বালা, ত্বকের রোগ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে দূষিত বায়ু গ্রহণ করলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান মৃত্যুঝুঁকির কারণ। ঢাকা শহরে প্রতিনিয়ত যে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে, তার একটি বড় উৎস হলো বর্জ্য পোড়ানো। এ দূষণের ফলে নগরবাসীর গড় আয়ু কমে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ছে।

ল্যান্ডফিল বা ভাগাড়ের সমস্যাও ঢাকা শহরের পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। রাজধানীর প্রধান ল্যান্ডফিলগুলো যেমন মাতুয়াইল ও আমিনবাজার প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য গ্রহণ করছে। এসব ল্যান্ডফিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আধুনিক স্যানিটারি ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে বর্জ্য স্তূপে জমে থাকা জৈব পদার্থ পচে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করছে, যা অত্যন্ত দাহ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী অন্যতম গ্রিনহাউজ গ্যাস। অনেক সময় এ মিথেন গ্যাসের কারণে ল্যান্ডফিলে আগুন লেগে যায় এবং দিনের পর দিন ধোঁয়া বের হতে থাকে। এতে আশপাশের এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়। দুর্গন্ধ, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। ল্যান্ডফিলের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, বমি ভাব, ত্বকের সমস্যা এবং মানসিক চাপ বেড়ে যায়।

ল্যান্ডফিল থেকে নির্গত তরল বর্জ্য বা লিচেটও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এ দূষিত তরল মাটির ভেতর প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে। একই সঙ্গে এটি পাশের খাল, নদী ও জলাশয়ে গিয়ে জলদূষণ সৃষ্টি করে। ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলো এমনিতেই শিল্পবর্জ্য ও পয়োবর্জ্যে দূষিত; তার ওপর ল্যান্ডফিলের বিষাক্ত লিচেট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। দূষিত পানির কারণে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে এবং কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। এভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থা শুধু নগর পরিবেশ নয়, সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো এতে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হয়। কার্বন ডাইঅক্সাইড ও ব্ল্যাক কার্বনের মতো গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। ঢাকা শহর এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাবের মুখোমুখি। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং তাপপ্রবাহ নগরবাসীর জীবনকে কঠিন করে তুলছে। বর্জ্য পোড়ানো এ পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করছে। নগর এলাকায় গাছপালার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং উন্মুক্ত স্থানের অভাবে দূষণের প্রভাব আরো বেশি অনুভূত হয়।

বর্জ্য পোড়ানোর কারণে পরিবেশের সৌন্দর্য ও নগর জীবনের মানও নষ্ট হচ্ছে। রাস্তার পাশে ধোঁয়া, দুর্গন্ধ এবং ময়লার স্তূপ নগরীর নান্দনিকতা ধ্বংস করছে। বিদেশী পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের কাছেও শহরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম শর্ত হলো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কিন্তু ঢাকা শহরে এখনো এ খাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ফলে নাগরিকদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং নগর উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্জ্য পোড়ানোর সঙ্গে জড়িত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ঢাকা শহরের হাজার হাজার মানুষ জীবিকার তাগিদে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান আলাদা করার কাজে নিয়োজিত। এদের অনেকেই শিশু। তারা প্রতিদিন বিষাক্ত ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও বিপজ্জনক রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই তারা কাজ করে। ফলে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হয় এবং তাদের জীবনমান অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবও এ সমস্যাকে তীব্র করেছে।

ঢাকা শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, জনসংখ্যার তুলনায় বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের অবকাঠামো অপর্যাপ্ত। দ্বিতীয়ত, নাগরিক সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেক মানুষ এখনো যত্রতত্র ময়লা ফেলে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার মতো ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার করে। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক ও পলিথিনের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। চতুর্থত, কার্যকর আইন ও তার বাস্তবায়নের অভাব রয়েছে। যদিও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। ফলে অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা ও পোড়ানোর ঘটনা অব্যাহত থাকে।

এ সমস্যা সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বর্জ্যকে উৎসস্থলেই আলাদা করার ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে জৈব, অজৈব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পৃথকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। দ্বিতীয়ত, উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, পুনর্ব্যবহার ও কম্পোস্টিং ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে। জৈব বর্জ্য থেকে সার উৎপাদন এবং প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করলে বর্জ্যের পরিমাণ অনেক কমে যাবে। চতুর্থত, নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

এছাড়া আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ল্যান্ডফিলে গ্যাস সংগ্রহ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকলে মিথেন গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে পরিবেশ দূষণ কমবে এবং জ্বালানি উৎপাদনও হবে। উন্নত দেশগুলোতে বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকা শহরেও এ ধরনের প্রযুক্তি ধীরে ধীরে চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।

শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমেও এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যাতে দূষণের প্রভাব কমানো যায়। সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং নগর বনায়নও বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

ঢাকা শহরের ভবিষ্যৎ টেকসই করতে হলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি শহরের সভ্যতা ও উন্নয়নের অন্যতম সূচক হলো তার পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সুরক্ষা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আরো ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষতিকর প্রভাব শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন ও স্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে। তাই সরকার, সিটি করপোরেশন, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সচেতনতা, প্রযুক্তি, আইন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।

পরিবেশ রক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাই, যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলি এবং বর্জ্য পোড়ানোর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি, তাহলে ঢাকা শহরকে আরো বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। সুস্থ পরিবেশ ছাড়া সুস্থ জীবন সম্ভব নয়। তাই পরিবেশ সুরক্ষার এ সংগ্রামে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকা শহরের আকাশকে ধোঁয়ামুক্ত, বাতাসকে বিশুদ্ধ এবং পরিবেশকে নিরাপদ রাখার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ড. শফি মুহাম্মদ তারেক: অধ্যাপক, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ফেলো, রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি এবং চার্টার্ড পরিবেশবিদ, যুক্তরাজ্য

আরও