এদিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতেই রয়ে গেছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাত হানে ইরান। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি দিতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র টাকো অর্থাৎ ‘ট্রাম্প অলয়েজ চিকেনস আউট’ (ট্রাম্প সবসময় লেজ গুটিয়ে পালান) মোডে ফিরে গেছে এবং যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও মন্থর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে স্থবিরতাজনিত মূল্যস্ফীতির শঙ্কা বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এসব ঘটনা ভোটারদের ক্ষুব্ধ করার জন্য যথেষ্ট।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিণতি আসলে কী হবে? এক্ষেত্রে আমরা চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারি।
প্রথম: এখন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সফল আলোচনার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং আবারো হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। ট্রাম্প সম্ভবত এমন কিছু প্রত্যাশা করছেন যে ইরানে কোনো মধ্যপন্থী গোষ্ঠী (তা হতে পারে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে) কট্টরপন্থীদের যদি বোঝাতে পারে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে আপস করলে এ নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তাতে প্রণালি দিয়ে জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থা বাবদ রাজস্বও মিলবে। তবে এমন প্রত্যাশার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রেজিম ট্রাম্পের মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে (অন্তত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রাখলে)। তাছাড়া শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে ইরানের উচ্চাভিলাষই এখানে চূড়ান্ত নয়। আরো অনেক প্রসঙ্গে দুই পক্ষের অবস্থান অনেক দূরে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির বিরোধিতা করছে। বিরোধিতা করছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইসলামপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনকে। ক্ষুব্ধ হয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের আরোপ করতে চাওয়া টোলের সিদ্ধান্তে। এছাড়া আরো অনেক বিষয়েই মতপার্থক্য স্পষ্ট। এসব মতপার্থক্যের যেকোনো একটিরও নিষ্পত্তি করতে হলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ আলোচকদের সমন্বয়ে দীর্ঘ এবং জটিল আলোচনা দরকার।
দ্বিতীয়: এটি বিদ্যমান বাস্তবতারই প্রতিফলন। এক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকবে। কিন্তু আলোচনা আরো কয়েক মাস দীর্ঘায়িত হবে। আলোচনার সময়ে হরমুজ বন্ধই থাকে। আজকের পরিস্থিতিও কিন্তু এমনটাই। এ ধরনের পরিস্থিতি মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। এ ধরনের অচলাবস্থা গোটা বিশ্ব অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি করছে। জ্বালানিপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। টানা ৪০ দিনের সক্রিয় যুদ্ধের সময় যে হারে দাম বেড়েছিল, সেটিকেও এখন ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকবে। তবে দ্বিতীয় পরিস্থিতিটি সাময়িক। সর্বোচ্চ দুই কি তিন মাস অব্যাহত থাকতে পারে। এটি হয় প্রথম পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে (কোনো একটি পক্ষ এক্ষেত্রে নমনীয় হয়ে প্রণালি আবার খুলে দিতে এবং আরো স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত আপস করতে রাজি হবে)। কিংবা আরো বড় সংঘাতের দিকে এগোবে। গত সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে দিয়েছে, কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়া যুদ্ধবিরতি আসলে কতটা ভঙ্গুর।
তৃতীয়: ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে কিংবা দেশটির গোটা শাসন ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের কাছে থাকা সব ধরনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য উপায় ব্যবহার করে গোটা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তুলবে। আত্মসমর্পণে ইরানের শাসন ব্যবস্থাকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার জন্য চাপ দেয়া হবে এবং বিনা শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার বিষয়ে রাজি হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীনসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্য এটিই হবে সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান। এক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে। সেটি হলো এ ধরনের ভয়াবহ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও ইরানের শাসন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে।
চতুর্থ: এ পরিস্থিতিতে ইরান তার মজুদে থাকা অবশিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌবাহিনী ব্যবহার করে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরো বেশি জ্বালানি অবকাঠামোর স্থায়ী ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। এদিকে প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রচেষ্টাও করবে। এমনটি হলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের কাছাকাছি কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে এ মূল্যও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সত্তর দশকের মতো স্থবিরতাজনিত মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক মন্দা ও পুঁজিবাজারে শূন্যাবস্থা তৈরি হবে। অবশ্য উত্তেজনা বাড়লে দুই পক্ষকেই আলোচনাসাপেক্ষে সমাধানের পথ খোঁজার জন্য চাপ দেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় পরিস্থিতি থেকে তৃতীয় বা চতুর্থ পরিস্থিতিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রথম পরিস্থিতিতে পৌঁছতে পারে। কিন্তু এমনটির সম্ভাবনাও অনেক কম। কারণ তখন আবার আমাদের যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ফিরতে হবে। এ ধরনের আলোচনা যে কতটা কম ফলপ্রসূ তা এরই মধ্যে আমরা দেখতেই পেরেছি। তাই উত্তেজনা বাড়লে তা যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় ফেরার বদলে আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রথম পরিস্থিতি প্রত্যাশা করলেও এটা অলীক কল্পনা বৈ কিছু নয়। তেহরানে কট্টরপন্থী উগ্রপন্থীরাই তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তারা এরই মধ্যে অবরোধের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার ইচ্ছা ও সামর্থ্যের কথাই জানিয়েছে। আসছে শরতে তাদের ভোটারদের মুখোমুখিও হতে হবে না।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও বাজার-সংক্রান্ত প্রভাবের কথা বিবেচনা করলে তৃতীয় পরিস্থিতিটি আদর্শ। এর মানে হলো প্রণালি স্থায়ীভাবে জাহাজ চলাচলে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সেটি না হলে দ্বিতীয় বিকল্প হবে প্রথম পরিস্থিতি। তবে এটি হলেও সংকট আছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যখনই হুমকি দেবে, ইরান তখনই প্রণালি বন্ধের ছুতা খুঁজে পাবে। এমনটি হলে যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে জ্বালানি পণ্যের দাম ১৫-২০ শতাংশ বাড়বে। তার পরও বর্তমান পরিস্থিতি আরো খারাপ। কারণ যতদিন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মতো বিষয়ে স্থায়ী নিষ্পত্তি না হবে, ততদিন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমতে থাকবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকবে। এটির চেয়ে খারাপ ফলাফল ওই চতুর্থ পরিস্থিতি।
এত গভীর ঝুঁকির কথা ভাবলে অনেকেরই অবাক হওয়ার কথা। কারণ ঝুঁকির পরও যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এমনটি হওয়ার পেছনে দুটি কারণ দেখতে পাচ্ছি। প্রথমত, বিনিয়োগকারীরা হয়তো আশা করছেন দুই পক্ষের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি শিগগিরই স্থায়ী রূপ পাবে। এতে তেলের দাম অনেক কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, অনেকের মধ্যে এমন একটি ধারণা আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারের বিপ্লবের অনুকূল প্রভাব যুদ্ধের প্রতিকূলতার চেয়েও অনেক শক্তিশালী থাকবে। তবে এমনটি বিশ্বাস করলে আপনাদের কঠিন এক বাস্তবতারই মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্ববাজারগুলো স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা (৭৫ শতাংশের বেশি) যতটা প্রামাণ্য বলে ধরে নিচ্ছে, বাস্তবে সেটা নয়। যদি সত্যিই উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও আরো বেশি অর্থনৈতিক ও বাজার অস্থিরতা নিম্নমুখী ঝুঁকি তৈরি করবে। এমনভাবে উত্তেজনা বাড়লে শাসন ব্যবস্থাও আত্মসমর্পণের দিকে যায়। সত্তরের দশকের স্থবিরতাজনিত মূল্যস্ফীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের অবস্থা শঙ্কা বাড়াচ্ছে এ কথা সত্য। কিন্তু বৈশ্বিক বাজার এখনো এ ঝুঁকির আঁচ পাচ্ছে না বা কম অনুভব করছে। এজন্যই যারা ভুল পক্ষে বাজি রাখবেন, তাদের জন্য যন্ত্রণা বা চাপ বছরের পর বছর হয়তো স্থায়ী হবে না। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসও যদি তা স্থায়ী হয়, এর যন্ত্রণার তীব্রতা কম অনুভূত হবে না।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
নুরিয়েল রুবিনি: জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক কৌশলবিদ, হডসন বে ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট। ইমেরিটাস অধ্যাপক, স্টার্ন স্কুল অব বিজনেস, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘মেগাথ্রেটস: টেন ডেঞ্জারাস ট্রেন্ডস দ্যাট ইমপেরিল আওয়ার ফিউচার অ্যান্ড হাউ টু সারভাইভ দেম’ (লিটল, ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি, ২০২২) গ্রন্থের লেখক।
ভাষান্তর: আমিরুল আবেদিন