বিশ্ব অভিবাসন দিবস

অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি

বংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। প্রতি বছর রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী বিভিন্ন দেশে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যান উন্নত জীবনের খোঁজে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১২ লাখ ১০ হাজার ২৫৬ জন অভিবাসী দেশ ছেড়েছেন। তার মধ্যে ৭০ হাজার ৯৭০ জন নারী শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি অভিবাসী গেছেন সৌদি আরবে।

বংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। প্রতি বছর রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী বিভিন্ন দেশে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যান উন্নত জীবনের খোঁজে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১২ লাখ ১০ হাজার ২৫৬ জন অভিবাসী দেশ ছেড়েছেন। তার মধ্যে ৭০ হাজার ৯৭০ জন নারী শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি অভিবাসী গেছেন সৌদি আরবে। অভিবাসী গমনে মালয়েশিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে। 

দেশের বিদ্যমান কর্মসংস্থান সমস্যার ও নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যার মুক্তির জন্য মানুষ ভিন্ন দেশে পাড়ি জমায়। এছাড়া অনুন্নত জীবনমান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদি অভিবাসনের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে অভিবাসীদের অধিকাংশই স্বল্প শিক্ষিত, অল্প বয়সী ও বেকার। এ কারণে তারা কোনো যাচাই-বাছাই না করেই অনিশ্চিত ও অজানা গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের উন্নত জীবন নামক সোনার হরিণ না ছুঁয়েই ফেরত আসতে হয়। অনিরাপদ অভিবাসন ও না জেনে বিদেশ গিয়ে তারা মানব পাচারের শিকার হচ্ছে। অনেকেই হারাচ্ছেন তাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকুও। আইওএম ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর যৌথভাবে ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস ইন বাংলাদেশ’ নামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৩০টি মানব পাচারের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। এছাড়া কর্মদক্ষতা না থাকায় বাংলাদেশের অভিবাসীরা নানা দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। তাদের নিম্নমান ও স্বল্প বেতনের কাজে নিয়োজিত করে থাকে যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশের অভিবাসীরা উচ্চ বেতনে কাজ করার সুযোগ পান। 

ব্যক্তি সচেতনতাই নিরাপদ অভিবাসনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বিদেশ যাওয়ার আগে সব কাগজপত্র, ভিসা, চুক্তিপত্র ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। প্রায়ই দেখা যায়, লেনদেনের কোনো প্রমাণ না রেখেই দালালকে চুক্তি অনুযায়ী সব টাকা ভিসা পাওয়ার আগেই দিয়ে দেয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দালাল কয়েকজনের থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। প্রমাণের অভাবে পরবর্তী সময়ে দালালের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থাও নেয়া সম্ভব হয় না। নিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) বার্ষিক রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী, আউটরিচ ক্যাম্পেইন, ডোর টু ডোর ওরিয়েন্টেশন, উঠান বৈঠক, ওকাপ অভিবাসী হেলপ লাইন ইত্যাদি বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রায় ৫৬ হাজার ৮২৩ জন মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করেছে, যা ২০১৯-এ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৫২৩ জন। এ ধরনের ক্যাম্পেইনগুলো যদি সরকারিভাবে সমগ্র দেশে করা যায় তবে অধিক মানুষকে সচেতন করা সম্ভব হবে। এছাড়া অভিবাসীদের উচিত দক্ষ হয়ে বিদেশ যাওয়া। এতে করে তারা উচ্চ বেতনে চাকরি করার পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিনা মূল্যে বা স্বল্প খরচে ট্রেনিং নেয়া যায়, যা বিদেশগামীদের ভালো চাকরির নিশ্চয়তাদিতে পারে।

অভিবাসন ও বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে কেন্দ্র করে অভিবাসী ও তাদের পরিবারের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০০ সাল থেকে দিনটিকে বিশ্বব্যাপী উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অভিবাসনসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে নানা আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপন করে থাকে। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ‘প্রবাসী কর্মীরা উন্নয়নের অংশীদার, সমুন্নত রাখব তাদের অধিকার’ এ স্লোগান সামনে রেখে ১৮ ডিসেম্বর দেশব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। 

স্বাধীনতার পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে অভিবাসী পাঠাতে শুরু করলেও এত বছরেও অভিবাসন প্রক্রিয়া নিরাপদ হয়নি। নিরাপদ অভিবাসন, মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন-কানুন থাকলেও বিদেশে যেতে গিয়ে প্রতিনিয়তই মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। অনেকেই আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে দেশে ফিরছেন, আবার অনিরাপদ উপায়ে যেতে গিয়ে কেউ-বা হারাচ্ছেন মূল্যবান প্রাণ। নারী শ্রমিকরা আরো বেশি দুঃসহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, ক্ষেত্র বিশেষে তা দ্বিগুণ বা তিন গুণের বেশি খরচ করতে হচ্ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের। এতো পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার পরও তারা বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রেও এমন ধরনের মাত্রাতিরিক্ত অর্থ নেয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে এ অতিরিক্ত টাকা কোথায় যাচ্ছে?

ইনফো মাইগ্রেন্টসের মতে, ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সমুদ্রপথে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার অভিবাসী, যার মধ্যে মোট ১২ হাজার ১০০ জন বাংলাদেশী ভূমধ্যসাগরের বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে ইতালিতে পৌঁছতে সক্ষম হন। সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে রয়েছে। নিয়মিত পথে উন্নত বিশ্বে অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বাধা থাকায় সাধারণত মানুষ অনিয়মিত পথই বেছে নিতে আগ্রহী থাকে। যদিও এ ধরনের যাত্রায় নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। তবু নিশ্চয়তা থাকে না যে সে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। এছাড়া প্রতিনিয়তই নৌকাডুবি বা অন্যান্য কারণে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সরকারিভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় অভিবাসনে পথ সুগম করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এতে করে অনিয়মিত বিদেশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো কমে আসবে বলে মনে হয়। 

অভিবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নের অংশীদার হচ্ছে। বিএমইটিএর তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে ২০২২ সালে প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তার কতটুকুই অভিবাসীদের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়? গত ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে, গত দুই বছরে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬ জন অভিবাসী স্থায়ীভাবে দেশে ফিরেছেন।

পাচারের শিকার ও স্থায়ীভাবে ফিরে আসা অভিবাসীদের জন্য আমাদের এখনই বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নেয়া দরকার। বিশেষত তাদেরকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসকারিভাবে যৌথ ও সম্মিলিত কর্মসূচি নিয়ে অভিবাসীদের কল্যাণে কাজ করা প্রয়োজন। এ দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘On International Migrants Day, we highlight the urgent need for safe migration governance rooted in solidarity, partnership, and respect for human rights.’ অভিবাসীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি তাদের যাবতীয় সমস্যা দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নিয়ে দেশ উন্নয়নের স্বার্থেই এ খাতকে আরো গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।

সিকদার মোহাম্মদ জাকারিয়া: প্রজেক্ট অফিসার,  অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ), ফাইট স্লেভারি অ্যান্ড ট্রাফিকিং-ইন-পারসনস (এফএসটিআইপি) প্রজেক্ট

আরও