১। বাজেটের আকার ও মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বর্ষে (২০২৪-২৫) মোট বাজেট থাকার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ৯ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা, উন্নয়ন বাজেটের প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা (কভিডের প্রভাব ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তখন ছিল অজানা)। বাস্তব প্রেক্ষাপটে বাজেটের আকার করতে হলো ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা ও উন্নয়ন বাজেট ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এই যে ছোট আকারের বাজেট (তবে আগের যেকোনো বাজেটের চেয়ে বড়) করতে হলো—এর কারণ কী?
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়ায় সরকারি মোট ব্যয় কমিয়ে রাখা যাতে ক্রয় চাহিদা বৃদ্ধি না পায়, তাতে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি থাকবে না। দ্বিতীয়ত, কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো যায়নি। ফলে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে রাখার জন্যই পরিমিত বাজেট করতে হয়েছে। গত তিন বছর বাজেট ঘাটতি ছিল ৫ শতাংশের ওপর, এবার বাজেট ঘাটতি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে এটা ছিল পরিমিত ও সংকোচনমূলক বাজেট করার বাস্তবতা।
২। বাজেটে সাহসিকতার পরিচয় মেলে:
মাননীয় অর্থমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ রহিত করতে চাচ্ছেন। যা বাস্তবায়ন হলে এটা হবে প্রায় বৈপ্লবিক অর্জন। এতে আপামর ভোটারকুল উল্লসিত হবে।
মাননীয় অর্থমন্ত্রী ভ্যাট সংগ্রহে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। লেনদেনের সংগৃহীত ভ্যাট এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে তাৎক্ষণিক তথ্য চলে যাবে। অতীতে এটা চালু করতে গিয়েও কেন থেমে গেছে, ভেতর থেকে কেউ বাধা সৃষ্টি করেছে কিনা তা বের করে পদক্ষেপ নিতে হবে। ইএফডি চালু হলে ভ্যাট সংগ্রহের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
ব্যবসা লাইসেন্স নতুন করতে গেলে কিংবা নবায়ন করতে হলে কর রিটার্ন সনদ দেখাতে হবে। এতে ব্যবসা ক্ষেত্রে করজাল বিস্তৃত হবে।
কর দেয়া সনদ প্রতিটি ব্যবসা স্থাপনায় দৃশ্যমানভাবে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কেউ কর সনদ দোকানে ঝুলিয়ে না রাখলে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। এতে করজাল বিস্তৃত হবে ও রাজস্ব আয় বাড়বে। এসবই উদ্ভাবনী পদক্ষেপ।
এবারের কর আরোপে প্রগতিশীলতা লক্ষ করা যায়। আয়কর ধার্য ধাপ এবার পাঁচটির পরিবর্তে ছয়টি করা হয়েছে। শেষ ধাপে কর দিতে হবে করদেয় আয়ের ৩০ শতাংশ।
৩। গতানুগতিক বাজেট?
এটা দেশের ৫৪তম বাজেট। বাজেটের সব বরাদ্দ ১৪টি খাতে প্রদর্শন করে অর্থ মন্ত্রণালয় আর উন্নয়ন বাজেট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রদর্শন করে ১৫টি খাতে। বাজেটের দুটি জানালা—একটি আবর্তক ভর্তুকি ও প্রণোদনা অংশ। অন্যটি হচ্ছে উন্নয়ন বাজেট (উন্নয়ন প্রকল্প ও স্কিম)। এটাই বাজেটের বরাবরের ছক। বছর থেকে বছরে খাতওয়ারি বরাদ্দের হেরফের হতে পারে। করনীতির হারে পরিবর্তন হতে পারে। সব বার্ষিক বাজেট এ ছক মেনেই প্রণীত, কাজেই গতানুগতিক কিংবা গতিশীল বাজেট সংজ্ঞায়নের সুযোগ কোথায়? কারিগরি দিক থেকে সব বাজেটই একই ছকে প্রণীত।
৪। মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রয়াস আছে করনীতিতে
পরিমিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও এবার কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা গতবারের চেয়ে কম। সরকারি ব্যয় কমানোয় মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হবে। এতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশা জলাঞ্জলি দিতে হবে হয়তো। পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানিগুলোর করপোরেট করহার এবার কমানো হয়েছে। আগের করহার ছিল সাড়ে ২৭ শতাংশ, যা ২৫ শতাংশে কমানো হয়েছে। এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোম্পানির করপোরেট করহার কমেছে সাড়ে ২২ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নতুন কোম্পানির করহার সাড়ে ২২ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে করা হয়েছে। করপোরেট করহার কমানোর দাবি অর্থনীতিবিদরা অনেক দিন থেকেই করে আসছেন, যা এবার ব্যাপক পরিসরে কমানো হলো। এতে কোম্পানিগুলোর মুনাফা অধিক হবে, প্রতিযোগিতামূলক পণ্যবাজারে পণ্যের দাম কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
কৃষি প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের উৎসকর ৫০ শতাংশ কমানোর ফলে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, গুঁড়াদুধ, আদা, রসুন ইত্যাদির দাম নিম্নমুখী হবে। কর কমানোর ফলে আরো দাম কমবে শুকনা ফল, মাশরুম, চা, গ্রিন টি, কফি, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট, ল্যাপটপ ইত্যাদির। বাজেট দেয়ার পর এবার পণ্যের দাম বাড়েনি বরং চাল, ভোজ্যতেল চিনির দাম কমেছে।
৫। সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক দিক:
প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনাকালে অর্থনীতির ইতিবাচক দিকগগুলো আমরা বিবেচনায় নিতে পারি, এতে বুঝতে পারব বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক সঞ্চয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যখন আমাদের দেশজ আয় প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের নিচে। অনেক প্রচেষ্টার পর মে মাস পর্যন্ত আমাদের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার সাড়ে ১৫ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল সাড়ে ৯ শতাংশ।
মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ বোরো ধান। এবার বোরো উৎপাদন গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে। খরা, বান, বন্যায় এবার বোরো উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। সে কারণে চালের দাম নিম্নমুখী। বর্ষা শুরু হয়েছে। এ সময় এবং খরিপ মৌসুমে এবার শাকসবজির উৎপাদন চমৎকার। মোটা দাগে শাকসবজির বাজার স্থিতিশীল। আমাদের অর্থনীতির গতিসঞ্চারি প্রবাসী আয় মে মাস পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি এসেছে ২ বিলিয়ন ডলার, রফতানি আয় বেড়েছে ওই একই সময়ে ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। বিনিময় হার প্রায় স্থিতিশীল। ব্যাংকগুলো অফশোর ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট খোলার কার্যক্রম শুরু করেছে যেখানে প্রবাসীরা আকর্ষণীয় সুদহারে ডিপোজিট রাখতে শুরু করেছেন, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়ক হবে মনে করা হয়। পাকিস্তান অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে ভালো সাড়া পেয়েছে।
৬। প্রবৃদ্ধির পথ পুনরুদ্ধারে প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
সমৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও এ বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে ঘোষিত হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সেজন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, দেশের আয়ের ২৭ শতাংশ। উচ্চ সুদের এই সময়ে ব্যক্তি খাতে ২৪ শতাংশ হার থেকে ২৭ শতাংশে উন্নীতকরণ অবশ্যই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা। এখন লক্ষ্য হবে ব্যাংকের সুদহার যেন আর না বাড়ে। কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পক্ষে ১৪-১৫ শতাংশ সুদে বিনিয়োগে যাওয়া প্রায় কঠিন। পলিসি রেট, বন্ড রেট এবং ব্যাংক সুদের হার কীভাবে নিম্নমুখী ধারায় ফেরানো যায়, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষ আসে সে প্রচেষ্টা নিতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাজেট বছরের শুরু থেকেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সংশোধিত উন্নয়ন বাজেট করা পরিহারের প্রচেষ্টা অর্থবছরের শুরু থেকেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, বিশেষ করে অর্থ সংকট ব্যবস্থাপনার সময়ে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ভোজ্যতেল, চিনির ঘাটতি প্রতীয়মান হলে (অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রবণতা সে সংকেত দেবে) ব্যবসায়ীদের দ্রুত আমদানির সুযোগ দিতে হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমতির নামে অনেক সময় ‘বিলম্ব আমদানি’ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে এবং জন অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাজার সংকেত অনুযায়ী আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা যেন সক্রিয় থাকতে পারেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সে নিশ্চয়তা দিতে হবে। বাজারকে কাজ করতে দিতে হবে উদ্ভূত বাজার অব্যবস্থাপনা মোকাবেলায়। পণ্য ঘাটতি না থাকলে সিন্ডিকেট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে আমদানি পর্যায়ে সম্ভাব্য সিন্ডিকেট বন্ধে পরিবীক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত থাকতে হবে।
৭। ব্যাংক ঋণের বদলে বিদেশী ঋণ বেশি নিতে হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশী ঋণ নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা গত বাজেটে (চলতি বছর) ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। সুদের হার বাড়লেও বিদেশী ঋণের সুদের হার দেশে ব্যাংকের গড় সুদের হারের চেয়ে এখনো কয়েক শতাংশ কম। বিদেশী ঋণ ব্যবহারে পরিবীক্ষণ ও জবাবদিহিতা বেশি। প্রতিশ্রুত বিদেশী ঋণ পাইপলাইনে আছে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আমার বিবেচনা হচ্ছে, দেশে ব্যাংক থেকে ঋণ (প্রস্তাবিত ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) কম নিয়ে অন্তত ৩৭ হাজার কোটি টাকা বিদেশী ঋণ নিলে, ক্রাউডিং আউটের যে ভয় কাজ করছে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মনে তা আর থাকবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমার পরামর্শ থাকবে বিদেশী ঋণ বেশি নেয়া।
৮। সমাপ্তি সুপারিশ
যেহেতু আমরা প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের অনেক পেছনে। আমাদের করনীতিতে বিদেশী এফডিআই নিরুৎসাহিত না করি। সেহেতু রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কিংবা বিশেষ শিল্প এলাকায় কর অব্যাহতি রহিতকরণ অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে দেয়া যায়।
আমাদের পোশাক শিল্প চার দশকের পরিণত শিল্প। সরকারি প্রণোদনা ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধায় তারা এ পর্যন্ত ৪৫ বিলিয়ন রফতানি অর্জনে সম্ভব হয়েছে। গার্মেন্ট রফতানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ। প্রায় ৪০ শতাংশ টাকার অবমূল্যায়নের পুরোটা সুযোগ রফতানি খাত পেয়েছে। ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ ঘোষিত হলে সব রফতানি পণ্যে ভর্তুকি প্রণোদনা উঠিয়ে নিতে হবে। কাজেই টাকা সাশ্রয়ে গার্মেন্ট খাতে রফতানি প্রণোদনা উঠিয়ে নেয়ার কথা বিবেচনা করা যায়।
বিদেশী মিডিয়া ও অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, বাংলাদেশ থেকে বিগত কয়েক বছরে বছরপ্রতি প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং এবং হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। আমাদের রিজার্ভ সংকটের হয়তো এটাও অন্যতম কারণ। এই টাকা পাচার বন্ধ ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ড. শামসুল আলম: একুশে পদক প্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ। সাবেক সদস্য, পরিকল্পনা কমিশন ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
[গত ২০ জুন বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি আয়োজিত বিএআরসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি: জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক সেমিনারে মুখ্য আলোচক হিসেবে প্রদত্ত বক্তব্য]