রাজধানীর পরিকল্পনায় উপেক্ষিত পরিবেশ ও অর্থনৈতিক খাত

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অধিভুক্ত এলাকার জন্য পরিকল্পিত উন্নয়ন নির্দেশিকা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ। জমি ব্যবহারের ধরন, ভবন নির্মাণের নিয়ম, পরিবেশ সংরক্ষণ, খাল-নদী-জলাশয় রক্ষা, সড়ক ব্যবস্থা, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ইত্যাদি বিষয় নির্ধারণ করে ড্যাপ। এটি একটি আইনগত ও নীতিনির্ধারক দলিল, যা শহর পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নযোগ্য করে তোলার জন্য বানানোর কথা। রাজউক ড্যাপসহ ঢাকা মহানগর এলাকায় নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। তবে রাজউক নিজে এটি একা করেনি। ড্যাপ প্রস্তুত করতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিযুক্ত করেছে যাদের বিভিন্ন গবেষণা ও প্রস্তাবনার ফল এ ড্যাপ। রাজউক কর্তৃক ১৯৯৫ সালে প্রণীত ডিএমডিপি, যা ছিল ইউএনডিপির একটি প্রকল্প, একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (১৯৯৫-২০১৫), যা ঢাকার সার্বিক উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করে। এ ডিএমডিপি-এর তিনটি স্তর ছিল: এক. গঠনগত পরিকল্পনা (স্ট্রাকচার প্ল্যান) ২০ বছরের জন্য, দুই. আরবান এরিয়া প্ল্যান (ইউএপি) পাঁচ বছরের জন্য, তিন. ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নির্দিষ্ট এলাকার জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা। অর্থাৎ ড্যাপ হচ্ছে ডিএমডিপির একটি অংশ বা বাস্তবায়নযোগ্য স্তর। ডিএমডিপি একটি কৌশলগত কাঠামো (গাইডলাইন), আর ড্যাপ সেই কাঠামো অনুযায়ী এলাকার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন নির্ধারণ করে। অথচ ডিএমডিপির এর ঔরস্যে জন্মানো ড্যাপ গেজেট হয়ে গেলেও রাজউক ডিএমডিপি-কে এখনো গেজেট করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি, যা যেকোনো পরিকল্পনা দলিলের জন্য একটি কালো অধ্যায়।

ঢাকার জন্য একটি পরিকল্পনা দলিলের প্রয়োজনীয়তা অনেক কারণেই অপরিহার্য। কিন্তু সেটি শুধুই নগর পরিকল্পনা নয়, বরং টেকসই উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবেশ পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ইত্যাদিরও প্রয়োজন ছিল, যা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত ড্যাপে। নিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার, ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব ও সমতাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, রাজধানীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগর কৃষি রক্ষা, বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ, খাল-নদী, জলাশয়, সবুজ খোলা জায়গা রক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নগরসেবা নিশ্চিতকরণ, দুর্যোগ সহনশীল নগরায়ণ, সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা—সব বিষয়ই মাথায় রেখে রাজধানীকে নিয়ে পরিকল্পনা দলিল তৈরির প্রয়োজন ছিল কিন্তু তা করা হয়নি। ড্যাপের এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় বিদ্যালয়কেন্দ্রিক মহল্লা কর্মপরিকল্পনার কার্যপদ্ধতি দেয়া আছে প্রথম খণ্ডের অধ্যায় ৫-এর ৫.১.২তে, যেখানে সম্পূর্ণরূপে পরিবেশ ও অর্থনীতি উপেক্ষা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে তারা বিদ্যালয়ের যে পরিকল্পনা প্রদান করেছে সেখানেও কেন্দ্রীয় এলাকার বিদ্যালয় এবং বহিঃস্থ নগরের বিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্য রেখে প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নগর ও দেশের শিক্ষা খাতের জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। একইভাবে অধ্যায় ৬-এ বিষয়/খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায়ও পরিবেশ ও অর্থনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গেজেট করা হয়েছিল ড্যাপে, যা একটি দেশের রাজধানীর জন্য অভিশাপস্বরূপ। অথচ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা টেকসই উন্নয়নের তিনটি ভিত্তির মধ্যে দুটিই হচ্ছে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ড্যাপের পরামর্শক মনে হয় ভুলেই গেয়েছিলেন, ঢাকা শুধু একটি শহরই নয়, এটি একটি দেশের রাজধানী।

টেকসই উন্নয়নের মাপকাঠিতে রাজধানী ঢাকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হলে অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ—তিনটি স্তম্ভের সমন্বয়ে গঠিত একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ কাঠামোর প্রতিটি উপাদান স্বতন্ত্র হলেও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান খাত ঢাকার জনগণের জীবিকা, শহরের উৎপাদনশীলতা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে পরিবেশ ও জলবায়ু খাত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য শহর নিশ্চিত করতে হলে অপরিহার্য; ঢাকার খাল, নদী, জলাভূমি ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া টেকসই নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। তেমনি প্রশাসন ও সুশাসনের অনুপস্থিতিতে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভোগান্তি, দুর্নীতি ও বৈষম্য তৈরি হয়, যার ফলাফল হলো পরিকল্পনার ব্যর্থতা। জ্বালানি ও শক্তি খাত শহরের চলমান জীবনযাত্রার রক্তসঞ্চালন; বিদ্যুৎ, গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে অর্থনৈতিক ও আবাসিক খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাত হলো শহরের টিকে থাকার ভিত্তি; ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা বা বন্যার মতো বিপর্যয়ের মুখে প্রস্তুতি ছাড়া টেকসই শহর কল্পনাও করা যায় না। অথচ ড্যাপে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে এক ধরনের অবহেলা করা হয়েছে। পরিকল্পনায় প্রধানত ভূমি ব্যবহার, ভবনের উচ্চতা ও ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোযোগ বেশি দেয়া হলেও অর্থনীতি, শক্তি, দুর্যোগ প্রস্তুতি, সুশাসন বা পরিবেশগত অভিযোজনমূলক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করা হয়নি। ফলে ড্যাপ কার্যকর হলেও তা টেকসই উন্নয়নের পরিপূর্ণ কাঠামো তৈরি করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে। একটি রাজধানীর উন্নয়ন কেবল ভবন ও রাস্তা নির্মাণ নয়; বরং একটি সহনশীল, বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেজন্য ড্যাপের প্রতিটি খাতে আন্তঃখাতিক সমন্বয় ও টেকসই উন্নয়ন সূচকের (এসডিজি) ভিত্তিতে পরিকল্পনা অপরিহার্য।

ড্যাপ প্রণয়নের সময় যেসব তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই এক দশক বা তারও বেশি সময় আগের। ফলে রাজধানী ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ঘনত্ব, পরিবেশগত সংকট, ভৌত অবকাঠামোর বাস্তব চিত্র কিংবা অর্থনৈতিক গতিশীলতার সঙ্গে এসব তথ্যের সরাসরি কোনো সামঞ্জস্য নেই। নগর উন্নয়ন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ, সমস্যা ও সম্ভাবনার সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ রাজউক যে তথ্যের ভিত্তিতে ড্যাপ তৈরি করেছে, তা পুরনো, অবসানপ্রাপ্ত এবং বর্তমান বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক নয়। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগেই অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ঢাকার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ, বাসযোগ্য ও টেকসই করার লক্ষ্যে রাজউকের উচিত হবে পুরনো ও অনুপযোগী সব তথ্য বাতিল করে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩-এর নির্দেশিকা অনুসরণসহ বর্তমান প্রেক্ষাপটভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে একটি আপডেটেড, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তবভিত্তিক ড্যাপ প্রস্তুত করা। অন্যথায় বর্তমান ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে তা কেবল জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে না, বরং একটি টেকসই রাজধানী গঠনের পথকেই রুদ্ধ করবে, যা কিনা শুধু রাজধানীবাসীকেই নয়, পুরো জাতিকেই কলংকিত করবে।

মো. মাহামুদুর রহমান পাপন: স্থপতি ও পরিবেশবিদ

আরও