এ বিষয়ে পুরো তথ্য পাওয়া কঠিন, তবে যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায় বাজারমুখী সংস্কার সম্পর্কে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পর চীনা পার্টি প্রস্তুতি নিতে সময় নিয়েছে, গবেষণা প্রশিক্ষণে বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়েছে, বিশ্বের পুঁজিবাদী কেন্দ্র দেশগুলোয় লোক পাঠিয়েছে, সেসব দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়েছে আর সংস্কার নিয়ে ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে। একটি দেশ কয়েক দশকে সমাজতান্ত্রিক নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি, হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পর কী করে বাজার অর্থনীতির সর্বাধুনিক ব্যবস্থাপনা, হিসাব পদ্ধতি ও নীতিমালা আয়ত্ত করে ফেলল তা এক বড় বিস্ময়ের বিষয়ই বটে। শুধু আয়ত্তই নয়, পুরনো ও প্রভাবশালী পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মোকাবেলা করে নিজেদের অর্থনীতি সংস্কার করে পাল্লা দিয়ে দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করল।
চীনের বাজারমুখী এ সংস্কার নিয়ে বিশ্বের পুঁজিবাদী সব প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক কোম্পানি, বহুজাতিক ব্যাংক ছাড়াও বিভিন্ন অর্থকরী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। কেননা এর সঙ্গে তাদের বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ সম্পর্কিত ছিল। প্রথম থেকেই চীনে তাই তাদের অবিরাম যাতায়াত এবং দেন-দরবার দেখা যায়। দুপক্ষের আগ্রহেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন হয়। দীর্ঘমেয়াদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে পরামর্শকের কাজ প্রধানত পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোই করেছে। এদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দুটো প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদী বিশ্বে বহুভাবে পরিচিত। এর একটি হলো ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ এবং অন্যটি হলো ‘মরগান স্ট্যানলি’। দুটো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই মার্কিন শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অর্থমন্ত্রী (যা মার্কিন রীতি অনুযায়ী ট্রেজারি সেক্রেটারি নামে অভিহিত) হেনরি পলসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থকরী খাতের, বিনিয়োগ বাজারের সহযোগী, অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান নির্বাহী। ওয়াল স্ট্রিটের কর্তাব্যক্তি মার্কিন নীতিনির্ধারণী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বহু বছর ধরেই একটা সাধারণ নিয়ম। ওয়াল স্ট্রিট এবং হোয়াইট হাউজ সেজন্য সবসময়ই একাকার। গোল্ডম্যান স্যাকসের কর্মকর্তা হিসেবে দ্রুত পদোন্নতি এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভের পেছনে চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে পুঁজিবাজারে আনায় তার ভূমিকাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। চীনে তিনি কীভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর লবিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তদবিরে সাফল্য পাওয়ার জন্য বিভিন্ন যোগাযোগ তৈরি করেছেন, বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবহার করেছেন তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে পলসন নিজেই একটি বই লিখেছেন (ডিলিং উইথ চায়না, ২০১৫), সেখানে তিনি বলছেন:
‘খুব বেশি দিন বাকি নেই, যে স্থান আমরা ১৫০ বছর ধরে দখল করে আছি, চীন আমাদের সেই অবস্থান ছাড়িয়ে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ...চীন এখন সবকিছুতে শীর্ষস্থানের ভূমি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন সুপারকম্পিউটারের দেশ, সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনার দেশ, দীর্ঘতম সমুদ্রসেতুর দেশ। এ দেশ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কয়লা, সিমেন্ট, লৌহপাত, শতকরা ৪০ ভাগ অ্যালুমিনিয়াম ও কপার ব্যবহার করে। পৃথিবীতে যত নির্মাণকাজ হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকই এখন চীনে। ...আজ আমরা খবরে পড়ছি নিকারাগুয়ার ভেতর দিয়ে পানামা খালের দ্বিগুণ আয়তনের পথ তৈরি করতে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পের কথা, পরদিন পড়ছি চীনা নির্মাতারা আইসল্যান্ডের একাংশ কিনে নিতে চায়, তারপর আমরা আবার পড়ছি ছয় মাসে পৃথিবীর উচ্চতম ভবন নির্মাণে তাদের পরিকল্পনার কথা। ...৪০ বছর আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনরা চীনের কাছ থেকে ১ সেন্ট ঋণ করার কথাও ভাবত না, এখন সেই চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঋণদাতা, আমাদের ঋণের মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার চীনের পাওনা।’
ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকার আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে ব্রিকস জোট। এ জোট থেকে বিশ্বব্যাংক ধরনের একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়, যার প্রস্তাবিত নাম ছিল ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’। চীনের উদ্যোগে ও কর্তৃত্বে যাত্রা করেছে ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (এআইআইবি)। এটি এশিয়ায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করছে এবং এশীয় অঞ্চলে বিনিয়োগে চীনের প্রভাব বাড়িয়েছে। এসব উদ্যোগ চীনের বৈশ্বিক ভূমিকার পথ আরো প্রশস্ত করে।
১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চীনে শুধু একটি ব্যাংক ছিল, ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’। পরের ১০ বছরে ২০টি ব্যাংক, ৭৪৫টি ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ কোম্পানি এবং ৩৪টি সিকিউরিটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। সাংহাই ও শেনজেন এ দুটো বৃহৎ স্টক এক্সচেঞ্জই খোলা হয় ১৯৯০ সালে। ১৯৯৪ সালে অনেকগুলো আইন তৈরি করা হয় বৃহৎ ও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য। এ সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যাংক অব চায়না’, ‘চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক’, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না’ এবং ‘এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না’। অর্থকরী খাতে এগুলোই প্রধান প্রতিষ্ঠান। চীনে ব্যাংকসহ মোট ৩ হাজার ৭৬৯টি অর্থকরী প্রতিষ্ঠান আছে, যার শাখা সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। এগুলোর মধ্যে আছে পাঁচটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, তিনটি নীতিনির্ধারণী ব্যাংক, ১২টি মাঝারি আকারের অংশীদারি ব্যাংক, একটি ডাক সঞ্চয়ী ব্যাংক, ১৪৭টি নগর বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৮৫টি গ্রামীণ বাণিজ্যিক ব্যাংক, ২২৩টি গ্রামীণ সমবায়ী ব্যাংক, ৬৩টি ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ কোম্পানি, বহুসংখ্যক অর্থকরী লিজিং ও অর্থ ব্রোকারি প্রতিষ্ঠান, ৪০টি বিদেশী ব্যাংকের চীনা শাখা। এতগুলো ব্যাংক থাকলেও মাত্র পাঁচটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকই পুরো অর্থকরী খাত নিয়ন্ত্রণ করে। এ পাঁচটি ব্যাংক সরকারের ৫৯ শতাংশ বন্ড, ৮৫ শতাংশ রাষ্ট্রীয় বিল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ৪৪ শতাংশ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ব্যাংকের আয়ের মধ্যে নাগরিকদের অর্থ জমার ৫৮ শতাংশ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশ জমা এদের হাতেই। চীনে বিদেশী ব্যাংকগুলোর সংখ্যা ক্রমে বাড়লেও এখনো অর্থকরী খাতে তাদের অবস্থান ২ শতাংশের কম। চীনের বৃহৎ ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে প্রবেশ একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব, যার মধ্য দিয়ে এগুলো বিশ্বের বৃহৎ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একতালে অবস্থান গ্রহণ করে। এশিয়ার মধ্যে চীনের স্টক মার্কেট এখন বৃহত্তম।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে চীনের উল্লম্ফন
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উচ্ছ্বাস ও শঙ্কা দুটোই এখন অনেক। এ বিপ্লবের সহযোগী যে প্রযুক্তিগত বিকাশ, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে কারখানা, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও যোগাযোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নজরদারি, ব্যক্তিগত জগতে অনুপ্রবেশ, পণ্য বিপণন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে এক বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় ও বিদ্যায়তনিক পর্যায়ে এ প্রশ্ন বারবারই উঠছে যে এ প্রযুক্তিগত বিকাশে বিশ্বের দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যে কার কর্তৃত্ব বেশি—যুক্তরাষ্ট্র না চীন? সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি গবেষণার ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এর সূচনা যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে প্রধানত সামরিক বিষয়ক গবেষণার হাত ধরে। তবে বিশেষত গত এক দশকে চীন দ্রুত এক্ষেত্রে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। যোগাযোগসহ মানবজীবন ও কর্মতৎপরতার ধরনে কম্পিউটার-ইন্টারনেট-স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে প্রভাবশালী পরিবর্তন আনছে তা অভূতপূর্ব। সন্দেহ নেই যে এ প্রযুক্তির ওপর কর্তৃত্ব বিশ্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অধিক থেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ গবেষক উদ্যোক্তা কাই ফু লি দুই দেশে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে লিখেছেন (এআই সুপারপাওয়ারস, ২০২১)। তিনি বলছেন, চীনের শহরগুলো পরিণত হচ্ছে ক্যাশ বা নগদ টাকাবিহীন কেনাবেচার অঞ্চলে। পরিবহন, যোগাযোগ, শনাক্তকরণ ইত্যাদিতেও দ্রুত সব পরিবর্তন হচ্ছে। লির মতে, এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক পেছনে ফেলে পরিণত হয়েছে ডিজিটাল ডাটার ‘সৌদি আরব’। অর্থাৎ সৌদি আরব যেমন তেলসম্পদে শীর্ষস্থানীয়, তেমনি চীন এখন ডাটা সম্পদে শীর্ষস্থানে। প্রকৃতপক্ষে সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও অর্থনীতির পাশাপাশি এ নতুন প্রযুক্তি বিকাশ ও বিস্তারে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবলভাবে মোকাবেলা করছে। আধিপত্য হারানোর শঙ্কা তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অমূলক নয়।
(বিস্তারিত দেখুন: চীন-পরাশক্তির বিবর্তন। বণিক বার্তা প্রকাশনী, ২০২৩)
আনু মুহাম্মদ: প্রাক্তন অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়