বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি যতই বলে থাকুন না কেন যে নেপালকে তারা বাংলাদেশ হতে দেবেন না, কিন্তু পাশাপাশি সত্য তো এটাও যে বিশ্বব্যাপী মব বা উচ্ছৃঙ্খলা সৃষ্টিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে উঠিয়ে নিয়ে এসে পরে নিজেকে সে দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে ধরে নিয়ে আসার ব্যাপারে হুঙ্কার ছাড়া, ডেনমার্কের শাসনাধীন গ্রিনল্যান্ডকে সহসাই দখল করে নেয়ার কথা জানানো, গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতা করায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি, নোবেল পুরস্কার না দেয়ায় ক্ষেপে যাওয়া ইত্যাদি সবই বস্তুত পৃথিবীর বুকে এক নতুন ধারার মব ও দস্যুতা। আর বহু বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মব থেকেও অধিকতর ভয়ংকর। তবে গুণগত বৈশিষ্ট্য বিচারে এ উভয় শ্রেণীর মবের মধ্যেই এক ধরনের সাদৃশ্য ও সমরূপতা রয়েছে এবং সেটি হচ্ছে, এ উভয় মবই রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত। এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রের এরূপ হীনতাপূর্ণ প্রশ্রয়, সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এরই মধ্যে এর ব্যাপক মাত্রার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে। আশঙ্কা হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনীতির ওপরও হয়তো সহসাই অনুরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এরই মধ্যে পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে তা ৪ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে। অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার দাবি করেছে, যদিও ব্যাপকভাবে মনে করা হয় যে বিবিএসের অধিকাংশ তথ্যই আসলে অতিরঞ্জিত। সে যা-ই হোক, মবের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির হালচালও মোটামুটি একই রূপ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্কলন জানাচ্ছে যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ব অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধির হার পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ১ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের হুমকি প্রদান, গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) শাসানো, ইরানে আক্রমণ চালানোর লক্ষ্যে ক্ষণে ক্ষণে তেড়ে আসা ইত্যাদি সর্বসাম্প্রতিক মবীয় আচরণের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আরো নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এখন দেখা যেতে পারে, উল্লিখিত মবসুলভ আচরণের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি কোথায় কীভাবে বিপদে পড়তে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রথমেই আসা যাক ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়াসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর অর্থনীতি প্রসঙ্গে। এ দেশগুলোতে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, নিম্ন রফতানি হার ইত্যাদি নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের উপরোক্ত মবীয় আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা প্রায় প্রত্যেকেই এখন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী হবে। তার মানে হচ্ছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ ও উন্নয়ন খাতে তাদের অর্থ ব্যয় কমে আসবে। এমনকি কমে আসতে পারে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও, যা দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে নিম্নমুখী করে তুলতে পারে। ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে নেয়ার ব্যাপারে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তাতে ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, একুয়েডরসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর জ্বালানি তেল রফতানি বহুলাংশে কমে যেতে পারে এবং এতে করে দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার পশ্চাৎমুখী হয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে অনিবার্যভাবেই তেল আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড দখল করুন বা না করুন, এরই মধ্যে তা দখলের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করায় ইইউভুক্ত দেশগুলো এরই মধ্যে ভাবতে শুরু করছে যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ন্যাটো তথা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এরও প্রাকারান্তরিক অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই যে দক্ষিণ আমেরিকার মতো ইইউও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় কমিয়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী হবে এবং এতে করে প্রচণ্ড চাপে পড়বে দেশগুলোর অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা। অন্যদিকে এ সূত্রে কিছুটা হলেও শিথিল হয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দীর্ঘকালীন মৈত্রীয় সম্পর্কও। আর এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক যদি ন্যূনতম পরিসরে হলেও শ্লথ হয়ে পড়ে, তাতে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এ সুবাদে সেখানে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারদের যুক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে চীন ও জাপান অন্যতম।
রাশিয়ার সঙ্গে আরো বহু আগে থেকেই ভেনিজুয়েলাসহ দক্ষিণ আমেরিকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের ভেনিজুয়েলা আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে এ মিত্রতা স্বভাবতই এখন আরো জোরদার হওয়ার দিকে ঝুঁকবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ককে বাড়তি উত্তেজনা ও টানাপড়েনের মধ্যে ফেলে দেবে। অন্যদিকে ইরানের বর্তমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ইন্ধন জোগানো, ইরানের ওপর আক্রমণ পরিচালনার বিষয়ে হুমকি প্রদান ও দেশটির ক্ষমতাচ্যুত শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির পুত্র রেজা পাহলভিকে সমর্থনদানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং এর অনিবার্য প্রভাব দেশ দুটির, বিশেষত ইরানের অর্থনীতিকে যথেষ্টই ভোগাবে। কারণ দেশটির উপর বর্তমানে পশ্চিমের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে তা আরো কঠোর হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ইরান খুব স্বাভাবিকভাবেই তার তেল উত্তোলন ও রফতানির ক্ষেত্রে নতুন কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে এবং এতে করে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে এবং এতে করে সবচেয়ে বেশি ভুগবে বাংলাদেশের মতো অনগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ইসরায়েল ২০২৩ সালে গাজা তথা ফিলিস্তিনে এবং ২০২৫ সালে ইরানে যে আক্রমণ পরিচালনা করে, তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশের ওপরও যথেষ্টই পড়েছে বৈকি এবং এর প্রভাবে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার মাঝে মাঝেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার উপক্রম হচ্ছে। এর অনিবার্য প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকেও নিয়তই এক ধরনের টালমাটাল চাপের মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে এবং সে কারণে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারও কভিডের (২০২০) পর থেকে আর কখনই ধনাত্মক হয়ে ওঠতে পারেনি। ধারণা করা যায়, ট্রাম্পীয় মবোক্র্যাসির কারণে সামনের দিনগুলোতে তা আরো খারাপের দিকে যাবে। এ সূত্রে বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ক্ষেত্রগুলোর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির মূল বিষয় হলেও সুয়েজ খালসহ আরব সাগর ও ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক জলপথ নিয়ন্ত্রণও এ নীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিবেচনা। সে কারণে মাঝে মাঝে এটিও দৃশ্যমান হয়ে ওঠছে যে, ঐসব জলপথ সন্নিহিত দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ভেনিজুয়েলা বা ইরানের মতো অতোটা কঠোর না হলেও কোনো না কোনো আঙ্গিক ও স্তরে তা থাকছেই এবং সেটিও বিশ্বঅর্থনীতিকে অহরহই ঝুঁকি ও সমস্যার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মবসুলভ নানা আচরণের কারণে চীন, ভারত, রাশিয়া, ইইউ ইত্যাদি দেশ ও অঞ্চল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধিতে আকস্মিকভাবেই এমনসব নতুন নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এ ধরনের আকস্মিক, অযাচিত ও অবাঞ্ছিত সিদ্ধান্তের মুখে বিশ্ব অর্থনীতিকেও হঠাৎ হঠাৎই নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে এবং সেটিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে বহুলাংশে মন্থর করে তুলছে। তবে সতর্কতার খাতিরে বলা প্রয়োজন যে ট্রাম্প এসব মব সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বকে নানাভাবে ভুগিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর ছাড়লেও এ ভোগান্তি থেকে আখেরে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও রেহাই পাবে বলে মনে হয় না। কেন মনে হয় না—তার একটি ছোট্ট ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনাটি শেষ করছি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তথা যুক্তরাষ্ট্র এসব অন্যায় ও অমানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর জীবনকে এরই মধ্যে এতটাই অতিষ্ঠ করে তুলেছে যে ভুক্তভোগী দেশ ও দেশের মানুষ এখন আত্মরক্ষার্থে আরো অধিক সৃজনশীল ও কৌশলী হয়ে উঠতে চেষ্টা করছে, যা তাদের সমস্যা মোকাবেলার ও দক্ষতাপূর্ণ উৎপাদনের সামর্থ্যকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত ও বুঁদ হয়ে থাকছে নিজেদেরকে ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রমাণের অহমিকায়, যা ক্রমান্বয়ে তাদেরকে ক্ষয়িষ্ণুতার পথে ঠেলে দিচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সোমালিয়া ইত্যাদির ন্যায় কতিপয় অকার্যকর রাষ্ট্র ব্যতীত পৃথিবীর অনেক দেশই যদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মানবিক মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়।