ব্যস্ত শহর—সে নিউইয়র্ক হোক বা ঢাকা—আগে বাসিন্দারা হাহুতাশ করত রাস্তায় জ্যাম-আতঙ্কে। কিন্তু করোনা সেই হিসাব বদলে দিয়েছে অনেকটা। এখন বলে জুম আতঙ্ক—একেবারে ঘরে ঘরে, সব কম্পিউটারে, ল্যাপটপে এবং ট্যাবে। জুম হয়ে উঠেছে ছেলেমেয়ের শ্রেণীকক্ষ, মা-বাবার অফিসরুম এবং সভা-সমাবেশের মিলনমাধ্যম। সেই ফাঁকে জুমের তো পোয়াবারো। গত এক বছরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা লাফ দিয়ে বেড়েছে ১০ মিলিয়ন, সেটা শতকরা ২০০০ শতাংশ বৃদ্ধি। জুম পুরোটাই যে আতঙ্কের তা নয়। জুমের বদৌলতে করোনাকালে নিরাপদভাবে অনেক কাজকর্ম করা যাচ্ছে, পড়াশোনা, রুটি-রুজি কিছুটা হলেও চলছে। তবে জুমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সামাজিক উদ্বেগ। এখানে জুমের কিছু আপদ এবং তা থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে আলোকপাত করছি।
জুম উদ্বেগের গভীরে যেতে চাইলেই কার্ল মার্ক্স হানা দেন। তিনি শিল্পায়নের যুগে মানুষের সঙ্গে যে তার কাজের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তা নিয়ে ভাবতেন। যেমন যান্ত্রিকীকরণে ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ শিল্পী থেকে হয়ে ওঠে অবসাদগ্রস্ত, অনুৎসাহিত কর্মচারী। মার্ক্স ভাবতেন, একটা জামা পুরোটাই নিজে তৈরির যে শৈল্পিক আনন্দ, কাপড়ের কারখানার শ্রমিক হয়ে শুধু জামার একটা বোতাম বারবার, সারা দিন, সারা সপ্তাহ সেলাই করে ওই আনন্দ পাওয়া যাবে না। হয়তো বোতাম সেলাইয়ের সময় কমছে, বারবার এক কাজ করার কারণে বেশি দক্ষ হয়ে উঠছেন শ্রমিক। এভাবে স্পেশালাইজেশন যতই বাড়ে, শ্রমিক যেকোনো আউটপুটের (যেমন জামা) খুব ছোট মাত্র কাজ করেন। আউটপুট থেকে এই যে দূরত্ব, তা শ্রমিককে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত করে; তিনি কাজের আনন্দ ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলেন। এটা সার্ভিস সেক্টর বা সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে জুমের কালে সার্ভিস সেক্টরের শ্রমিকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বিচ্ছিন্নতা; তারা দৈহিকভাবে আলাদা হয়ে গেলেন তাদের সহকর্মী ও কাস্টমারদের থেকে। এ বাস্তবতার কুফল আছে
গড়পড়তা হিসাবে আমাদের বেশির ভাগ যোগাযোগ হয় নন-ভারবাল অর্থাৎ অমৌখিকভাবে। জুমে অমৌখিক যোগাযোগ কিন্তু পুরোটা ফুটিয়ে তোলা যায় না। এই যেমন ধরুন করোনাপূর্ব শ্রেণীকক্ষে পাঠদানকালে ছাত্রছাত্রীদের চোখের দিকে তাকালে কিছুটা হলেও বোঝা যেত তারা কি আলাপের সঙ্গে আছে, নাকি বিরক্ত। এখন তা পরিষ্কারভাবে বোঝার জো নেই। ক্রেতা বা সহকর্মীদের সঙ্গে সামনাসামনি বৈঠক না করলে অনেক নন-ভারবাল যোগাযোগ কিন্তু হারিয়ে যায়। তাছাড়া সারা দিন অনলাইনে বসে কাজ করলে মনে হয় কাজ নয় যেন চেয়ার নামের শিকলে আটকানো আমাদের দেহ আর মন। এ বিষয়ে প্রফেসর সুজান ডেগেস-হোয়াইট বলেন, জুমে আমাদের অভিনয় করতে হয় অনেক, মুখোশ পরতে হয়ে বেশি। সারাক্ষণ অভিনয়মূলক চেহারা ধরে রাখার অনেক কুফলের মধ্যে আছে খিটখিটে মেজাজ, অন্য জায়গায় গিয়ে (যেমন পরিবার) কুব্যবহার করা। কয়েক দশক আগে বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আরলি রাসেল হকশ্চাইল্ড তাই পেয়েছেন ইন্ডাস্ট্রি জরিপ করে। তিনি বলেন, কাজের ক্ষেত্রে অভিনয় অনেকটা শ্রমিকের নিজের অনুভূতি থেকে নিজেকে জোর করে আলাদা করার মতো (৪)। যেন আপনি বসে আছেন এক দ্বীপে আর আপনার মন আছে আরেক দ্বীপে। মার্ক্স এই বঞ্চনার কথা ভাবেননি বলে হকশ্চাইল্ড পেয়ে যান বেশ খ্যাতি।
পিএইচডি করতে এসে আমি প্রায়ই পড়াইও। সহকর্মী ও সুপারভাইজার প্রফেসরদের সঙ্গে প্রায়ই জুম আতঙ্ক নিয়ে আলাপ হয়। আরো ঘাঁটাঘাঁটি করি জুমের যোগাযোগ-উদ্বেগ কাটানোর গবেষণা নিয়ে। এ নিয়ে এখনো তেমন চূড়ান্ত ফলাফল আসেনি, তাই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা মুশকিল। তবে কয়েকটি পুরনো পদ্ধতি অনেকে জুমের মাধ্যমেও কার্যকরী বলে মনে করেন (যেমন সাইকোলজিস্ট ব্রাড স্টেন্নারসন ও প্রফেসর সুজান ডেগেস-হোয়াইট)।
প্রস্তুতি
যেকোনো সামাজিক যোগাযোগের আগে প্রস্তুতি নিলে তা নিয়ে উদ্বেগ অনেকটা কমে আসে। যেমন আপনার যদি জুমে প্রেজেন্টেশন দেয়া লাগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, তা প্র্যাকটিস করে নিন। নিজের লুক নিয়ে বেশি উদ্বেগ অনুভব করলে আগেই ড্রেসআপ করে ক্যামেরার সামনে প্র্যাকটিস করুন। দেখুন মুখভঙ্গি আর কথা মিলে আপনার মনমতো হচ্ছে কিনা, আপনার কথার গতি বেশি ধীরে বা আস্তে হচ্ছে কিনা। নিজের প্রেজেন্টেশনের রেকর্ড দেখুন—আপনার কেমন লাগছে। শ্রোতা বুঝে ক্যাজুয়াল বা ফরমাল কাপড় পরেন। ঠিক একইভাবে যতটুকু সম্ভব শ্রোতা বুঝে বসার জায়গাও ঠিক করে নিন; আশেপাশের শব্দদূষণও খেয়াল রাখবেন।
মনোযোগিতা
প্রস্তুতি নেয়া শেষ; তো এবার জুমে বৈঠক করার পালা। তবে ক্যামেরার সামনে নিজের দিকে না তাকিয়ে বরং যার বা যাদের সঙ্গে কথা বলছেন তাদের দিকেই চোখ এবং মনোযোগ রাখুন। পুরো সময়টাই শ্রোতাদের ঢেলে দিন উজাড় করে। কেউ চ্যাট বক্সে কিছু লিখলে তার স্বীকৃতি দিয়ে আরো প্রাণবন্ত করে তুলুন জুম কথা। কেউ কিছু বললে তা অনেক গভীরভাবে শুনুন, কথার টোন ধরার চেষ্টা করুন। বেশি নার্ভাস হয়ে গেলে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর একটু নজর দিন। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে প্রাইভেট চ্যাট বক্সে সম্মানের সঙ্গে প্রশ্ন করুন, চট করেই নিজেকে আনমিউট করে চেঁচানো শুরু করবেন না কিন্তু!
জুম শেষে
জুম বৈঠকে সবকিছু একেবারে পরিকল্পনামাফিক না-ও যেতে পারে। কিছু বেমানান মুহূর্ত আপনার মনে খচখচানি তৈরি করতে পারে। তা স্বাভাবিক। তবে খচখচ মন যেন না হয়ে যায় নির্ঘুম রাতের নিয়ামক। বরং জুম বৈঠক শেষে ভেবে দেখুন কী কী ভালো ব্যাপার ঘটেছে। সেগুলো লিখে রাখুন যেন আপনি তার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। বেমানান বিষয়গুলো পরবর্তী প্র্যাকটিস সেশনের জন্য তুলে রাখতেই পারেন।
এ আলোচনা জুমের মতো অন্যান্য মাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। হ্যাপি জুমিং!
আব্দুল্লাহ শহীদ: পিএইচডি গবেষক, সমাজবিজ্ঞান
কর্নেল ইউনিভার্সিটি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র