প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ

মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও জেলেদের জীবিকা সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ লাখ ১১ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণকারী জেলে ৬ লাখ ৫০ হাজার ২৫১ জন, হাওরাঞ্চলের জেলে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৮ জন এবং সমুদ্রগামী জেলে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২১১ জন। কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিকল্প নিরাপত্তা ও আয়ের নিশ্চয়তা।

প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবিকা রক্ষা—এ দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের স্বার্থে যখন আহরণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই সম্পদের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক মানুষ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট জেলে ও খামারিদের জীবনে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংক্রামক রোগ কিংবা মাছ আহরণে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা—এসবের অভিঘাত সরাসরি তাদের আয় ও জীবিকার ওপর পড়ে। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং জীবিকা সুরক্ষার মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এ বাস্তবতা সামনে রেখেই সরকার কল্যাণমুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাকে উন্নয়ন নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। মানবিক সহায়তাকে শুধু সংকটকালীন ত্রাণ হিসেবে নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা সুরক্ষার কার্যকর উপায় হিসেবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মানবিক উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। খাদ্য সহায়তা, আর্থিক প্রণোদনা, বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রাণিচিকিৎসা, টিকাদান, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে মানবিক সহায়তাকে উৎপাদন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন করছেন, অন্যদিকে দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্বও এ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে আরো স্পষ্ট করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মৎস্য খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ অবদান রেখেছে। প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান জিডিপিতে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে প্রায় ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ দুটি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এ খাতে যে কোনো সংকটের প্রভাব পড়ে লাখো পরিবারের আয়, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর।

মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও জেলেদের জীবিকা সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ লাখ ১১ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণকারী জেলে ৬ লাখ ৫০ হাজার ২৫১ জন, হাওরাঞ্চলের জেলে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৮ জন এবং সমুদ্রগামী জেলে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২১১ জন। কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিকল্প নিরাপত্তা ও আয়ের নিশ্চয়তা। সেই লক্ষ্যেই বছরের বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ মৌসুমে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এর ফলে একদিকে জেলেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের প্রজনন ও প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ মৌসুমে ৪০ হাজার ইলিশ জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০ জেলে পরিবারকে মাসিক ২৫ কেজি হারে মোট ১৫ হাজার ৫০৩ দশমিক ৫০১ টন ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় চার মাসে ৩ লাখ ৬৭ হাজার জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৫৮ হাজার ৭২০ দশমিক ১৬১ টন চাল দেয়া হয়েছে। সমুদ্রে ৫৮ দিনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ে ৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ জেলেকে ২৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ৬২৫ টন চাল এবং কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণে বিরত থাকা ২৬ হাজার ৮৪৫ জন জেলেকে তিন মাসে ১ হাজার ৬১০ দশমিক ৭০১ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি শুধু জেলেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি; বরং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

মানবিক সহায়তা শুধু খাদ্য বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাছ ধরতে গিয়ে নিহত ২৬ জন জেলের পরিবারকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা, নিখোঁজ ১৩ জন জেলের পরিবারকে একই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা এবং অক্ষম একজন জেলেকে ২৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ২৯৫ জন উপকারভোগীকে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, সবজি বাগান স্থাপনের উপকরণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১৩ হাজার ১৮০ জন মৎস্যচাষী, উদ্যোক্তা ও হ্যাচারি অপারেটরকে আধুনিক অ্যাকুয়াকালচার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধি ও নিরাপদ মাছ চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মৎস্য খাতের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ খাতেও মানবিক সহায়তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, উৎপাদন ক্ষতি হ্রাস এবং নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় সারা দেশে ১৪ কোটি ৪৬ লাখ ডোজ প্রতিষেধক টিকা সরবরাহ ও প্রয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়েছে, রোগজনিত ক্ষতি কমেছে এবং খামারিদের আর্থিক ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের স্বাবলম্বী করতে বিনামূল্যে ৭৮ হাজার ৩৪টি মুরগি, ৪৯ হাজার হাঁস, ১৭ হাজার ৪২৭টি ছাগল এবং ৪ হাজার ২৬০টি ভেড়া বিতরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী, ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের জন্য এ সহায়তা নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এককালীন অনুদানের পরিবর্তে আয়বর্ধক সম্পদ সৃষ্টির এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক হচ্ছে।

খামারিদের দোরগোড়ায় সরকারি প্রাণিচিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে দেশব্যাপী পরিচালিত মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকের মাধ্যমে ৪ লাখ ৯০ হাজার সেবাগ্রহীতাকে চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, টিকাদান, চিকিৎসা পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার খামারিরাও সহজেই সরকারি সেবা পাওয়ায় প্রাণিসম্পদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।

মানবিক সহায়তার পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারের ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনায় ৪৪ হাজার ৪২৪ জন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডেইরি উদ্যোক্তাকে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, উন্নত প্রজনন, রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। একই সময়ে মোট ৭৩ হাজার ৪৬৫ জন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উদ্যোক্তা, খামারি ও সেবাদাতাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে হাজারো উঠান বৈঠক, প্রচার কার্যক্রম এবং তথ্যসামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব কার্যক্রম উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ, নিরাপদ ও টেকসই করে তুলতে সহায়তা করছে।

দুর্যোগকালীন মানবিক সহায়তায়ও মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য গবাদিপশুর খাদ্য ক্রয়ে আর্থিক সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খাত পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৯টি গবাদিপশুকে জরুরি চিকিৎসা ও টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে রোগের বিস্তার রোধ করা যায় এবং কৃষকের সম্পদ সুরক্ষিত থাকে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতেও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু সংকটকালে সহায়তা দেয়া নয়; বরং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে এনে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, প্রাণিচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত বাস্তবায়নের ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, আয় বাড়ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি আরো শক্তিশালী হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এসব কার্যক্রম দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করছে। নিরাপদ মাছ, দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে, তেমনি জেলে, খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সরকারি সহায়তা দ্রুত প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মানবিক উদ্যোগ দেখিয়েছে যে সামাজিক নিরাপত্তা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন তা উৎপাদন, দক্ষতা এবং আত্মনির্ভরশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার যে সমন্বিত কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে, তা একটি নিরাপদ, পুষ্টিসমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

মো. মামুন হাসান: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

আরও