চারদিকে দুঃখ-কষ্ট ও আতঙ্কের খরব। আজ পাঁচ মাসাধিক কাল ধরে করোনা মহামারীপ্রসূত আতঙ্ক চলছে। তার সঙ্গে পরে যোগ হয় তিন দফা বন্যা। এখন শুরু হয়েছে মূল্যস্ফীতি-জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি। মানুষের বাঁচার উপায় কী? ফেব্রুয়ারি-মার্চে শুরু হওয়া কভিড-১৯-এ হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত। ঘরে ঘরে আতঙ্ক। বয়স্করা বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন না, সঙ্গে শিশুরাও। মিল-কারখানা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। অফিস-আদালত অনিয়মিত। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। লোক কর্মহীন, চাকরিচ্যুত, ব্যবসাচ্যুত। ক্রয়ক্ষমতা নেই মানুষের। হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। বাড়িভাড়া হচ্ছে না। নিত্যদিন খারাপ খবর। কোনো অনুষ্ঠানই ভালোভাবে পালন করা যাচ্ছে না। দুটো পবিত্র ঈদ গেল। স্বস্তিতে তা পালন করা গেল না। স্বধীনতা দিবস গেল মার্চে, এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ, মে মাসে শ্রমিক দিবস—এর কোনোটাই আমরা শান্তি ও যথাযথযোগ্য মর্যাদায় পালন করতে পারিনি। মুজিব বর্ষ যাচ্ছে, তাও মর্যাদার সঙ্গে পালন করা যাচ্ছে না। আগস্ট শোকের মাস, তা পালিত হচ্ছে সীমিত পরিসরে। এসবের মধ্যেই বাজেট ঘোষিত হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট চালু হয়েছে জুলাই থেকে। সরকারি মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ। ভালো পারফরম্যান্স, যদিও কেউ কেউ এ পরিসংখ্যানে আস্থা স্থাপন করতে পারছেন না। দেখা যাচ্ছে রফতানি, রেমিট্যান্স, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি খুব বেশি অসন্তোষজনক নয়, বিশেষ করে যেখানে অর্থনীতি স্থবির, ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে না, কেনাকাটা সীমিত। এ সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে রফতানির পরিমাণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৯৮০ কোটি ডলার। ২০১৮-১৯-এর তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। না, তা হয়নি। বরং ১৫ শতাংশ কম। কিন্তু তবু এই রফতানির পরিমাণকে মোটেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। এদিকে রেমিট্যান্স পরিস্থিতি ভালো এবং সন্তোষজনক। যেখানে সবার আশঙ্কা ছিল সারা বিশ্বের টালমাটাল অবস্থায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমবে, সেখানে দেখা যাচ্ছে এর পরিমাণ বরং বেশ ভালোভাবেই বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৮ বিলিয়ন (এক বিলিয়ন সমান শতকোটি) ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। রেমিট্যান্সের ওপর ‘ডলার-প্রিমিয়াম’ এর একটি কারণ। দ্বিতীয় কারণ বাংলাদেশী ওয়েজ-আর্নাররা দেশে ফেরার সময় সব সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এছাড়া ছিল দুটো ঈদ, যখন সবসময়ই রেমিট্যান্স বাড়ে। আরেকটি কারণ হুন্ডি ব্যবসায় মন্দা। সব মিলিয়ে রেমিট্যান্সকে চাঙ্গা রেখেছে। এতে গ্রামাঞ্চলে কিছু ক্যাশ গেছে। এদিকে রাজস্ব আহরণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে খুব বেশি খারাপ ছিল না, যদিও তা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম ছিল। রাজস্বের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। অর্থনীতির এই পারফরম্যান্স হয়তো আরেকটু ভালো হতে পারত, যদি তিন দফায় বন্যায় আমরা আক্রান্ত না হতাম।
কভিড-১৯-এর ধংসাত্মক ভূমিকা তো আছেই, তারই মধ্যে বন্যা এসে ৩৭টি জেলাকে কবলিত করে। দৈনিক বণিক বার্তার খবর থেকে দেখা যাচ্ছে, এ বন্যা সারা দেশের ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে আউশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ লাখ কৃষক। আমনের ক্ষতি হয়েছে। আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ভাদ্র মাস চলছে। বলা হচ্ছে আরেক দফা অতিবৃষ্টি-বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। কাগজে দেখলাম বরিশালের অনেক শহর জলের তলে। যদি আরেক দফা বন্যা হয় তাহলে ফসলের যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শাকসবজির উৎপাদন। লালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, বরবটি, শিম, শসা, লাউ ইত্যাদি সবজি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মোট কথা শীতকালীন সবজির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এমনিতেই সরকার ভাবছে চাল আমদানির কথা। আমরা গম আমদানি করি। চাল আমদানি ইদানীংকালে কম। যদি চাল আমদানি করতেই হয় তাহলে একটা বিপদের কথা। কারণ বিষয়টি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। ধরে নেই আর বন্যা হবে না। তাহলে আমন ফসল ও সবজি ফলন আশানুরূপ হতে পারে। যদি তা হয় তাহলে দ্রব্যমূল্য ঠিক থাকতে পারে। তা না হলে এসবের বাজার গরম হতে পারে। তিন দফায় বন্যায় বাজার অস্থিতিশীল রয়েছে। চাল, ডাল, সয়াবিন ও সবজির দাম বেশ বেড়েছে। প্রতিদিন তা বাড়ছে। আরেকটি বন্যা না হলে শীতকালীন সবজি পেতে আরো তিন-চার মাস। এই ‘লিন’ পিরিয়ডে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, শাকসবজির দাম বাড়ে তাহলে সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্টের সীমা থাকবে না। কভিড-১৯ মানুষকে পথে ফেলে দিয়েছে, বিশেষ করে ছোট-মাঝারি দোকানদার, হাজার রকমের স্বনিয়োজিত লোকদের। দিনমজুর, কাঠমিস্ত্রী, ওস্তাগার, হেলপার, সেলুন কর্মী, পান-বিড়ির দোকানদার, হোটেলকর্মী, পর্যটনকর্মী, ছোট ছোট চাকরিজীবীদের হাতে কোনো ‘ক্যাশ’ নেই। তাদের হাতে কখনো সঞ্চয় থাকে না। তারা দিন আনে দিন খায়। একদিন কাজ না থাকলেই তারা উপোস থাকে। এরই মধ্যে গ্রামাঞ্চল থেকে বন্যাপীড়িত লোকজন ঢাকায় আসছে কাজের সন্ধানে। গ্রামে কোনো কাজ নেই। গ্রামে মানুষের হাতে টাকা নেই। এ পরিস্থিতিতে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে তাহলে মানুষের মরণ ছাড়া গতি নেই। তাহলে করণীয় কী?
এ মুহূর্তের জরুরি কাজ হচ্ছে মানুষের হাতে ‘ক্যাশ’ দেয়া। এজন্য জরুরি হচ্ছে কর্মসংস্থান। বড় বড় মিল-ফ্যাক্টরি, গার্মেন্টের কর্মসংস্থানের কথা বলছি না। আসল কর্মসংস্থানের জায়গা হচ্ছে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ। এদের সংখ্যা দেশে লাখ লাখ। এসব প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ বলতে গেলে বসে গেছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আবার বসে গেলে মালিকরা আর এদের দাঁড় করাতে পারেন না। ধার-দেনা করে সবাই ফতুর হয়। পুঁজি খেয়ে ফেলে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে না পারলে বা উজ্জীবিত করতে না পারলে কোনোভাবেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। প্রণোদনা কর্মসূচি ব্যাংক ঋণনির্ভর। ব্যাংকের টাকা গরিবদের কাছে ছোট ছোট দোকানদার-প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানো একটি দুঃস্বপ্নের কথা। এসব হয় না বলেই গরিবের ফিন্যান্সের জন্য মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান হয়েছে দেশে হাজার হাজার। গ্রাামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে। সরকারকে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে। কিছু টাকা সরকার পিকেএসএফকে দিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। মনে রাখা দরকার কৃষিকে পুনরুজ্জীবিত রাখতে না পারলে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার দাঁড় করাতে না পারলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা যাবে না। এদের হাতে ক্যাশ গেলেই সেই ক্যাশ বাজারে আসবে। তা বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করবে। আমরা চাহিদা সৃষ্টির উদ্যোগ নিচ্ছি কম। সরবরাহের দিকে বেশি নজর দিচ্ছি। কৃষির অবদান জিডিপিতে এখন সামান্য। কিন্তু কর্মসংস্থান এখানে সবচেয়ে বেশি। অতএব, কৃষি খাতে প্রচুর টাকা সরকারের দেয়া উচিত। বিনা মূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, সস্তায় কৃষিঋণ জরুরি ভিত্তিতে দেয়া দরকার। ১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে এক কোটির ওপর। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের টাকা পায়, এমন লোকদের অ্যাকাউন্ট আছে। সরকার এসব অ্যকাউন্টে ক্যাশ সরবরাহ করতে পারে, যা শেষ বিচারে বাজারে যাবে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচি ব্যাংকঋণনির্ভর। রাজস্ব খাত থেকে, উন্নয়ন খাত থেকে বরাদ্দ কম। আমি মনে করি, গ্রামাঞ্চলে অবিলম্বে মেরামত কাজ শুরু করা দরকার। রাস্তাঘাট নষ্ট হয়েছে, অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। এসব পুনর্নির্মাণ শুরু হলে মানুষ কিছু কাজ পাবে। মনে রাখা দরকার আশ্বিন-কার্তিক মাস আমাদের দেশে সাধারণত ‘আকালের’ মাস ছিল। বহু কষ্টে এসব ‘আকাল’ বা মন্দা দূরীভূত হয়েছে। কিন্তু করোনা এবং বন্যা আবার এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তা হবে খুবই আশঙ্কাজনক বিষয়। ২৫ শতাংশ মানুষ এমনিতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে। অনেকের ধারণা, করোনা ও বন্যা আরো ১৫-২০ শতাংশ লোককে দারিদ্র্যসীমার নিচে ফেলে দিয়েছে। সরকার ছাড়া তাদের আর কোনো ভরসা নেই। তাদের ‘ক্যাশ’ দরকার, কাজ দরকার। যতদিন তা না হয়, ততদিন বিনা মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা অবশ্যই দরকার। স্বল্পমূল্যের কার্যক্রমও চলতে পারে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে গরিবদের মধ্যে ‘কার্ড’ প্রথা, যা চালু করা হয়েছে, একে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সঠিক তালিকা তৈরি করা দরকার; যাতে সাহায্যের অপচয় না হয়।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক