ব্র্যাক পরিবারে ১১ বছর কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। ব্র্যাকে ছয় বছর, ব্র্যাক ব্যাংকে সাড়ে তিন বছর আর ব্র্যাক আফগানিস্তান ব্যাংকে দেড় বছর। ব্র্যাকের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের কাছে ১১ বছর কিছুই না। ব্র্যাকে অর্থ ব্যবস্থাপক ও অর্থ বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়েছে। খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই সুবাদে আমার একটি বই, উদ্যোক্তাকে হ্যাঁ বলুন, ওনাকে উত্সর্গ করে লিখেছিলাম ‘সুউচ্চ পাহাড়ের উচ্চতা, পাদদেশে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় না, দূরে গিয়ে দেখতে হয়’।
আবেদ ভাই খুব লো প্রোফাইল জীবনযাপন করতেন। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক দাওয়াত আসত। টিভি চ্যানেল থেকে সাক্ষাত্কার চাইত। বিভিন্ন বিষয়ে মতামত চাইত। খ্যাতির লোভে কখনো পড়তে দেখিনি। বাংলাদেশে কারো খ্যাতি বা অর্জন অন্য অনেকের হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই হিংসা বা ক্ষোভের ঝাল এসে পড়ে প্রতিষ্ঠানের ওপর। ব্যক্তির জন্য প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওনার নিজের কারণে ব্র্যাক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই ভাবনা ছিল সর্বাগ্রে। এ কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাবও অনায়াসে ফেরত দিয়েছিলেন। আবেদ ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অনেক লেখা হবে, অনেক কথা বলাবলি হবে। তার গুণাবলি নিয়ে আলোচনা হবে। প্রকৃতপক্ষে তাঁকে নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হওয়া উচিত। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, মেরুদণ্ডহীন, আত্মপরায়ণতায় নিমজ্জিত এ মাটিতে কী করে তার মতো ঋজু, সত্, ন্যায়নিষ্ঠ, কর্মপাগল, আত্মনিবেদিত মানুষের জন্ম হলো; আমাদের স্বার্থেই আমাদের জানা উচিত।
ব্র্যাকের চাকরিতে বেতন বেশি ছিল না। অনেকে বলত, ব্র্যাক এত কম বেতন দেয়, কর্মীরা চলে কীভাবে? আশ্চর্যজনক ব্যাপার, তারপরও ব্র্যাকের কর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে ব্র্যাকে থাকে। ১৯৯৯ সালে ব্র্যাকের কর্মকৌশল নির্ধারণী সভায় মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মী নিজেদের পরিচয় দিচ্ছিল। ব্র্যাকে কারো বয়স ২০ বছর কারো ২৫ বছর। এতদিন লেগে থাকার পেছনে একটা বড় কারণ, কাজের স্বাধীনতা বা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ। ব্র্যাকের দুই হাজারের অধিক শাখা আছে। প্রত্যেক শাখা ব্যবস্থাপককে লিখিতভাবে ক্ষমতায়ন করা আছে। ক্ষুদ্রঋণের শাখা ব্যবস্থাপক একটা নির্দিষ্ট অংক পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করতে পারে। তার পরের স্তরে এরিয়া ব্যবস্থাপক পারেন আরেকটা অংক পর্যন্ত। তার পরের স্তরে জোনাল ব্যবস্থাপক। অর্থাত্ অনুমোদনের জন্য প্রধান কার্যালয়ে আসতে হয় না বা কদাচিত আসতে হয়। আমি ২০০২ সালে ব্র্যাক ব্যাংকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এসএমই বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিই। ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয়েছিল। আমার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, তাকে তখনো কোনো ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা দেয়া হয়নি (পরবর্তী সময়ে দেয়া হয়েছিল)।
আবেদ ভাই ছিলেন সূর্যের মতো। আমেরিকার ধনী বা এশিয়ার হতদরিদ্র, পৃথিবীর যে প্রান্তে থেকে থাকুক, সবাই ভাবে সূর্য তার। তাঁকে আলো, তাপ দেয়ার জন্যই সূর্যের উদয়।
তেমনি আবেদ ভাইকে সবাই নিজের মনে করত। ভাবত