কোটা সংস্কারে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বজুড়ে আবু
সাঈদ সাহসী প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে থাকবে। এমন অসংখ্য ছাত্র-জনতার জীবনের ত্যাগে একক
কর্তৃত্বের শাসনে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটে। জুলাই থেকেই সরকার সম্পূর্ণভাবে
জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমাকে শত্রু বানিয়ে শেষ পর্যায়ে ভূরাজনীতিতেও প্রায় একা
হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে গণ-আন্দোলনের মুখে তার নির্মম পরিণতি দেখে
বিশ্ব।
টিএস এলিয়ট কবিতায় বলেছেন এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস। কারণ এ মাসে
লাইলাক ফুল ফোটে। বিরানভূমিতে ফুলও নিষ্ঠুরতার কথা মনে করিয়ে
দিতে পারে কবিকে, কিন্তু আমাদের আছে ভয়াবহ বাস্তব কারণ। দেশ স্বাধীনের আগে ছিল নভেম্বর।
সে মাসে সত্তরের জলোচ্ছ্বাস ঘটেছিল। স্বাধীনতার বছর নিষ্ঠুরতম মাস ছিল কালরাত্রির মার্চ।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে প্রতি বছর ১৫ আগস্ট দিবসটি শোকের সঙ্গে পালন করলেও এ বছর শিক্ষার্থীরা আগস্ট মাসেও জুলাইকে টেনে হিসাব করেছেন। পরিণত করেছেন শোককে শক্তিতে।
নানা সংকটে দেশ ঢিমেতালে চললেও গত এক দশকে
বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এর মাঝে দেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম
সময় পার করছে। চোখের সামনে তরুণদের ক্রমবিস্তৃত একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংসতার
শিকার হতে থাকল। নিহত প্রায় ৩৫০। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। চোখ হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
অনেক। প্রথম আলো বলছে, নিহত ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ শিশু, কিশোর ও তরুণ। নিহতদের বেশির
ভাগের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির ক্ষতচিহ্ন। ছররা গুলি বা প্যালেট, রাবার বুলেটের ক্ষতচিহ্ন
এবং অন্যান্য আঘাত কম।
২০১৭ সালের মার্চে প্রথম আলোর উদ্যোগে বাংলাদেশে ১ হাজার ২০০
তরুণের মধ্যে একটি জরিপ করা হয়। সেখানে ৮২ শতাংশ তরুণই উদ্বিগ্ন
তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। অংশ নেয়া তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলেছিলেন, তারা জানেন না তাদের জীবনের
লক্ষ্য। ৫৬ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্ন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে অধিকাংশ তরুণ
অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। কারণ রাজনীতি মানে বিদ্বেষ, আন্দোলনের নামে নিরীহ মানুষের
প্রাণহানি।
আজ তা কঠিন বাস্তব। এর মাঝে জুলাই এসেছে তারুণ্যের হতাশার মাস
হিসেবে। কত জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি, সম্ভাবনার অকাল অবসান! আমি আপনি নিজের জায়গা থেকে,
তাদের বাবা-মা, ভাইবোন, স্বজনদের কথা বিবেচনা করি। কীভাবে সাঈদ, মুগ্ধ, কামরুল, তাহেরদের
মা সহ্য করবেন ব্যথা! বাবা কীভাবে কাটাবেন রাত? এমন পরিস্থিতিতে নবারুণ ভট্টাচার্যকে
মনে করি—এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না। পরের অংশে বলেছেন, যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী/প্রকাশ্যপথে এই হত্যার প্রতিশোধ
চায় না/আমি তাকে ঘৃণা করি।
এ অবস্থা জেনেও চুপ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, চুপ
দেশের কবি, লেখক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। অনেক আগে মারা গেছে অদ্ভুত
উটের পিঠে চলছে স্বদেশের কবি, বেঁচে থেকেও চুপ দূর হ দুঃশাসন
কবিতার রাজকবি। কুলুপ এঁটেছে সুবিধাভোগীরা। বইমেলায় হাজার হাজার বই, কীভাবে দেখাবে
মুখ নন্দলালের জীবন নিয়ে?
প্রাইভেট ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ১৫ হাজার ২৩৬। তাদের মধ্যে অধ্যাপক রয়েছেন ৪
হাজার ৬৬১ জন। তারা ব্যস্ত কীসে, কেউ কি জানেন? শিক্ষক নেতাদের
নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শতশত শিক্ষার্থী। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা শক্তি।
আমাদের সমাজের লজ্জা—নতুন কেউ শহীদ শামসুজ্জোহা হতে পারেনি, জাগতিক
লোভে। কেবল চেতনার গল্প বলে নিজে শহীদের পথে যায় না (সরকারি কলেজের তারা চাকরি করে,
ঘাস কাটে)।
প্রধানমন্ত্রীর এক সভায় সিনিয়র সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনার
সঙ্গে আছেন, প্রয়োজনে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত’। এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতার পারস্পরিক
স্বার্থের সম্পর্ক আরো পরিষ্কার হয়েছে। যেন ছাত্রলীগের ভূমিকা
রাখছে। আজ তারা কই, সবাই পালিয়েছে। অধিকাংশ যথাযথ চিত্র নেই,
কানার হাটবাজার। সম্পদ নষ্ট হচ্ছে দেখানো হয়, হাজার হাজার মানুষের কোনো খবর নেই। ক্ষমতাপ্রীতি সাংবাদিকতায় একটি রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই
প্রজন্ম এদের নিন্দা জানিয়েছে।
তারা ভুলে গেছে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা কোনো
চাকরি নয়। এখানে দায় ও দায়িত্ব আছে। আছে নীতিবোধের চর্চা, জ্ঞানকাণ্ডের
ব্যবহার। শিক্ষক-কবি-সাংবাদিক এরা যখন নষ্ট
হয়ে যায় তখন রাষ্ট্র ভালো থাকতে পারে না। তার উদাহরণ আজকের বাংলাদেশ।
যারা ঊনসত্তর, একাত্তর, পঁচাত্তর ও নব্বইয়ে
কবিতা-গানে মাতিয়ে রেখেছেন দেশ তারাও হারিয়ে গেছেন। বেঁচে থাকা
উল্লেখযোগ্য কবি-লেখকরা চুপ। পাঠকরা চায় তাদের লেখকরা কিছু বলুক,
পাশে থাকুক। এক সময় বাংলা একাডেমিতে কর্মরত লেখকরা কথা বলতেন,
লিখতেন। আজ তারাও চুপ।
গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বী এক বইয়ে উল্লেখ
করছেন, বাংলা একাডেমি একটা দ্বীপের মতো।
এটি জন্ম থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারও এর বিরুদ্ধে। এর কারণ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা
হয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে,
গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক। এ দেশে সরকার ও জনতা পরস্পরবিরোধী।
গণতন্ত্র ও সরকার সম্পূরক শক্তি নয় বরং বিরোধী। এর প্রাণ হচ্ছে লেখক গবেষক। ‘সেই প্রাণের আজ প্রাণ নেই। পদ-পদবি পুরস্কারে মাতাল। অনুভূতি অনুভোঁতা হয়ে গেছে সে কতকাল
আগে। সময় দেখে কেউ কেউ ভোল পাল্টাবে!’
সে সময়ের অস্থিরতা নিয়ে ১৬ জুলাই মতামত জানতে ফোন করেছি চার কবিকে। মহাদেব সাহা বলছেন, আমি অনেকদিন ঘরে, বাইরের
খবর জানি না। এ মুহূর্তে বাইরের বিষয়ে মতামত দিতে পারছি না। নির্মলেন্দু
গyণ বলছেন, আমি বাসায়, বাইরের অবস্থা ভালো
জানি না। হেলাল হাফিজকে চারবার ফোন করেছি। ব্যাক করে জানিয়েছেন, তিনি ভালো জানেন না, কম জেনে মন্তব্যে আগ্রহী
হননি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি
মুহাম্মদ সামাদকেও ফোন করেছি। তিনিও রিসিভ করেননি।
তারপর কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা কবি মোহন রায়হানকে ফোন করলে
তিনি জানান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—বাংলাদেশের
জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা থেকে জাতি আজ অনেক
দূরে! রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে সীমাহীন
নৈরাজ্য চলছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ সমাসন্ন। আজকের এ সংকটের চিত্র কে
আঁকবে? আমার একটি কবিতার বইয়ের নাম মুখোশপরা পাঠশালা। ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ হিসেবে
এ আলাপ করে রাখলাম।
কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টি প্রকৃত অর্থে
আদিতে ব্যাপকতা বোঝালেও সাম্প্রতিক সময়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে বললে
ভুল হবে না। আগে একজন শিল্পীর চোখ বা কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে সাহিত্য-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়াও সমাজ রাষ্ট্রের সংকট, পিছিয়ে পড়া
মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঞ্চিত, নিপীড়িত জনগণের জন্য কলম
ধরাকে বোঝাত, বর্তমানে সেটির চিত্র যথার্থ
বলে মনে হচ্ছে না। কারণ ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক পরিচয়, পদ-পদবির
টান ও পুরস্কারের লোভ৷ সুবিধাজনক আচরণ করে এক ধরনের ‘কোঠোর’ বানিয়ে তারা বসবাস করছেন।
আর সরকারের অবস্থা এমন—‘মাছের মায়ের পুত্রশোক নাই’-এর মতো। মাছ একবারে হাজারে
হাজারে বিয়ায়। তার কোনটি বাঁচল আর কোনটি মরল সে হিসাব রাখার সুযোগ তার নেই। আমাদের অবস্থাও সম্ভবত মাছের মায়ের মতো। কে কীভাবে মরল তাতে তার ক্ষতি কী! মানুষ মারার ফল ভালো হয়
না, রক্তের ক্ষমতা থাকে না বেশি দিন...
খ.
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে
হত্যা করে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক ও জব্বারকে পাকিস্তান। ১৯৫৪
সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়
এবং ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করলে বিদায় নেন তিনি। আইয়ুব খান সামরিক
আইনবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। এমন একটা অবস্থায় শরীফ কমিশনে গণবিরোধী সুপারিশ ছিল ভিমরুলের
চাকে ঢিল ছোড়ার মতো। বাঙালি জনগণের কাছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও শাসকদের মূল চরিত্র
উদ্ঘাটিত হয়েছিল। বাঙালি জনগোষ্ঠী উপলব্ধি করেছিল, পাকিস্তান
রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না।
তারপর ১৯৮৩ সালে মজিদ খানের ‘কুখ্যাত শিক্ষানীতি’ তার আগে থেকেই
শিক্ষার্থীদের উত্তাল করে তুলেছে। ছাত্রসমাজ তা প্রত্যাখ্যান করে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ডাক দেয় ছাত্র জমায়েতের। লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে
গুলি। মিছিলে প্রথম গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। আহত জয়নালকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে
খুন করে পুলিশ। এরপর একে একে জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ ১০ জন শহীদ হন। নির্মম বিদায়
নেন এরশাদ। এভাবে ছাত্রদের রক্তের ওপর কেউ থাকতে পারেনি
কোটা আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র
নিন্দা জানিয়ে সারা দেশে গুম-গণগ্রেফতারের
মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ এবং আটককৃতদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন সরকারি
ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত শতাধিক শিক্ষক। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আছে—আমি যদি কোনো বিষয়ে নিজেকে
বঞ্চিত মনে করি আমি সেটার জন্য মিটিং-মিছিল করতে পারব।" অথচ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে
ঢালাও মামলা দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন তাদের বিরুদ্ধে
মামলা দেয়াটা খুবই বেআইনি ও অসাংবিধানিক কাজ। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না; বরং
ছাত্রদের মধ্যে যে ক্ষোভ আছে সেই ক্ষোভ আরো বেড়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখেছিলেন, ‘জনাব নুরুল আমিন কত বড় অপরিণামদর্শী
কাজ করলেন। গুলি ছুড়লেন তাও ছাত্রদের উপর। মানুষের যখন পতন আসে, তখন পদে পদে ভুল করতে
থাকে।’
তার মেয়েই সাজায় নির্মম সরকার। বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে। এর মাঝে
কতজন মানুষ মারা গেছে, জানি না। সব আন্দোলনেই রক্ত ঝরেছে। বায়ান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি,
ঊনসত্তর ও নব্বই সালে রক্ত ঝরেছে। তবে এত রক্ত ঝরেনি। এক সপ্তাহে দুই শতাধিক আন্দোলনকারী,
পথচারী, ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রাণ হারিয়েছেন। একদা পাখি শিকারে বাধা ছিল না। শিকারিরা
পাখি দেখলেই গুলি করত। এমনকি পাখির ঝাঁকে ছররা গুলি চালাত। এতে ডজন ডজন পাখি মাটিতে
লুটিয়ে পড়ত। সম্ভবত সেখান থেকেই পাখির মতো গুলি করে মারার উপমাটি চালু হয়ে থাকতে পারে।
এখন পাখি মারা নিষিদ্ধ। তবে উপমাটি চালু রয়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা
‘জাস্টিস’ চেয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রতি ভয়াবহ অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর পর সড়ক নিরাপত্তা
আইন করা হলেও সড়কে নিরাপত্তা এ দেশের মানুষের আজও আসেনি।
এ দেশের ছাত্রসমাজ বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও অধিকারের একটা রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান আমল থেকে ত্যাগ স্বীকার করে আসছে। প্রথমে রাষ্ট্রভাষা বাংলার
দাবিতে রক্ত দিয়েছে। সাংবিধানিকভাবে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে, কিন্তু ৭৫ বছর পার করেও
শিক্ষাসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে প্রকৃতপক্ষে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠা হয়নি। ১৯৬২ সালে তারা
শিক্ষার অধিকার রক্ষার দাবিতে রক্ত দিয়েছে, কিন্তু ৬০ বছর পার করে শিক্ষা আরো বাণিজ্যিক পণ্য।
সেনা শাসক এইচএম এরশাদ যেদিন বঙ্গভবনে
গিয়ে পদত্যাগ করে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, সেদিন ঢাকা
শহর ছিল মিছিলে মিছিলে একাকার। কিন্তু এবারের মিছিলের সঙ্গে সেই মিছিল, এবারের গণজাগরণের
সঙ্গে সেই গণজাগরণের কোনো তুলনা হয় না। সে আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামপন্থী জোটসহ
বিভিন্ন দল নেতৃত্ব দিয়েছিল। গড়ে উঠেছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সঙ্গে যুক্ত
হয়েছিলেন পেশাজীবীরাও।
কিন্তু এবারের আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। নেতৃত্ব
দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা সেই অর্থে ছাত্রনেতা
ছিলেন না। কোটা সংস্কার কেন্দ্র করে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা,
যাদের কেউ কেউ ছাত্র সংগঠন করলেও বেশির ভাগ ছিলেন সাধারণ ছাত্রছাত্রী।
তাদের রক্তের ওপর মানে এসেছে বিজয়। নির্মম জুলাই শেষ করে রাষ্ট্র
গঠন ও সংস্কারে অনেক কাজ তারুণ্যের।
বিশেষ করে দীর্ঘ ত্যাগে বিজয় নিয়ে আনন্দ হতে পারে, পাশাপাশি
আনন্দ করতে গিয়ে কোনো অন্যায় যেন না করি, লুটপাট, ভাংচুর, স্থাপনা, মন্দির তথা সংখ্যালঘু
গোষ্ঠীর প্রতি দরদী মনে দেখতে হবে। আমাদের লড়াই সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে,
লড়াইটা জারি রাখতে হবে। শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার খবর পাওয়া মাত্রই একদল লোক
গণভবনে হামলা চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে লুটপাট চালায়। এগুলো ক্ষোভের
বহিঃপ্রকাশ হলেও অন্যায়, দুর্বৃত্তায়ন। তবে আশার সংবাদ হচ্ছে, রাতে দেখেছি সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে নিরাপত্তা দিচ্ছে ছাত্র-জনতা।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা বলেন, ‘আমরা যে বিশাল অর্জনের
দ্বারপ্রান্তে রয়েছি, সেই অর্জন এমন প্রোপাগান্ডা দিয়ে, উদ্দেশ্যমূলক এমন দুর্বিষহ
কিছু ঘটনা দিয়ে যেন ভূলুণ্ঠিত করতে না পারে। রাজপথে থেকে যেভাবে সবকিছু প্রতিরোধ করেছেন,
তেমনি এ অপচেষ্টাগুলোও প্রতিরোধ করতে হবে। তাহলে আমরা আসল উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে যেতে
পারব।
তার চলে যাওয়াও সবার জন্য শিক্ষা। কর্মের ফল হাতে হাতে। সেই
দীক্ষায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে কাজ
করে যেতে হবে। সজাগ থাকতে হবে চারপাশের গুজব নিয়েও। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে
হবে। মনে রাখতে হবে যে, কোনো স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা
কঠিন। কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-শিক্ষক সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। নোবেলজয়ীর হাতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ
নিয়ে রচনা হবে নতুন ইতিহাস।
ইমরান মাহফুজ: কবি, গবেষক ও সম্পাদক, কালের
ধ্বনি