টানা দুই বছর বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের জনসংখ্যা হ্রাসে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, একসময় যে চীন ছিল পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা জনবহুল দেশ, তাকে ছাড়িয়ে গেছে ভারত। দেশটির সরকারি উপাত্ত মতে, বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা ২০ লাখ ৮০ হাজার কমে দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি ৯০ লাখ। সেই তুলনায় ভারতের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪২ কোটি ৫০ লাখ।
পূর্ববর্তী বছর ৮ লাখ ৫০ হাজার কমে যাওয়া মানুষের চেয়েও ২০২৩ সালে দ্বিগুণ হারে কমেছে চীনা জনসংখ্যা। ৬০ বছরে এটিই তাদের প্রথম সর্বনিম্ন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। এর পেছনে দায়ী দশকের পর দশক ধরে কমতে থাকা জন্মহার এবং দ্রুত নগরায়ণ। বেইজিংয়ের অবস্থা জানান দিচ্ছে যে জন্মহার রেকর্ড সর্বোচ্চ কমেছে। বর্তমানে জন্মহার প্রতি হাজারে ৬ দশমিক ৩৯ জন। একই সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য উন্নত দেশেও জন্মহার কমেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে জন্মহার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৩ ও ৪ দশমিক ৯।
১৯৮০-১৫ সাল পর্যন্ত চীনে চলমান ছিল সমালোচিত এক সন্তান নীতি। এ নীতির ফলে চীনের জন্মহার হ্রাস পাচ্ছিল অনুধাবনসাপেক্ষে ওই নীতি পরিহার করা হয়। পাশাপাশি জন্মহার বৃদ্ধি করতে ভর্তুকি, সন্তানের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ট্যাক্স মওকুফ এবং উন্নত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করে চীন। ২০২১ সালে দম্পতিদের কমপক্ষে তিন সন্তান নেয়ার জন্য অনুমতি ও উৎসাহ প্রদান করে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারেনি। জীবনধারণের ব্যয় ও ক্যারিয়ার গঠনের প্রাধান্য তরুণদের নিরুৎসাহিত করছে বিয়ে ও সন্তান গ্রহণে। ফলে চীন জনসংখ্যাগত সংকটের কোনো সুরাহা এখনো করতে পারেনি।
তবে এ সংকট প্রসঙ্গে ভিন্ন কথা বলছেন সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধান পরিসংখ্যানবিদ পল চ্যাং। তার মতে, চীনের জনসংখ্যাগত চ্যালেঞ্জ সমাধান করার জন্য যথেষ্ট জনশক্তি ও সময় রয়েছে। তারা এখনো দুর্দিন থেকে বেশ দূরেই অবস্থান করছে। জাপান ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে চ্যাং বলেন, ‘ওই দুটি দেশ তাদের বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়েও অর্থনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রেখেছে।’
চীনের সাম্প্রতিক চিত্র গত কয়েক বছরের সংকটগুলোর কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। কভিড-পরবর্তী তিন বছর তাদের অর্থনীতির জন্য দুর্যোগময় ছিল। এছাড়া গত বছর চীনকে সম্পদের অপ্রতুলতা, ভোগ্যপণ্য হ্রাস এবং তরুণদের বেকারত্বের সংকটকেও মোকাবেলা করতে হয়েছে। কভিডের বছর বাদ দিয়ে গত তিন দশকে চীনের জিডিপি নিম্নমুখী। ২০২৩ সালে সর্বনিম্ন জিডিপি হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, জনসংখ্যার সংকোচন চলমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে। কেননা বিগত দশকগুলোয় জনসংখ্যাই ছিল তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এছাড়া ক্রমবর্ধমান অবসরপ্রাপ্ত জনসংখ্যার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পেনশন নিয়ে চীনকে আরো হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনুমান করা হচ্ছে, চীনে অবসরপ্রাপ্ত জনসংখ্যা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশ বেড়ে ৪০ কোটিতে পৌঁছবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
তবে যে কারণেই হোক, চীনের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ২০১২ সাল থেকেই নিম্নগামী। এ দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার বিপরীতে শিশু ও অবসরপ্রাপ্ত নির্ভরশীল জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। ২০১০-২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১২ থেকে ৪৪ দশমিক ১৪ শতাংশে। জাতিসংঘের হিসাবে ১৫-৬৪ বছর বয়সের জনসংখ্যা এ শতাব্দীর মধ্যে আরো ৬০ শতাংশ কমে যাবে। ২০২৩ সালে চীনে মৃত্যুহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজারে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ১৯৭৪ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে এটিই চীনের রেকর্ড সর্বোচ্চ নিম্ন মৃত্যুহার। ২০২২ সালে মৃত্যুহার ছিল প্রতি হাজারে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অনেকের ধারণা মহামারী করোনায় মৃত্যুর প্রভাব ২০২৩ সালেও পড়েছে।
তবুও উদ্ভূত জনসংখ্যা সংকটের প্রশ্নে ফ্যাথম ফাইন্যান্সিয়াল কনসাল্টিংয়ের সহকারী প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হ্যারিস জানিয়েছেন দেশটির গ্রামের সস্তা শ্রমিক দিয়ে শহুরে কারখানায় শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। যদিও চীনের নির্মাণ এবং উৎপাদন বিভাগে এরই মধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে জানান হ্যারিস। ফ্যাথমের হিসাবে, নির্মাণ বিভাগে এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিকই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু উৎপাদন করার কথা তাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। হ্যারিস আরো জানান, চীনের জনসংখ্যাগত সমস্যা তত দিন পর্যন্ত দেশটির অর্থনীতিকে চরম অভিঘাতের মুখে ফেলতে পারবে না যত দিন গ্রাম ও শহুরে শ্রমিকরা টিকে থাকবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে চীনের তুলনা দিয়ে হ্যারিস বলেন যে চীনের জনসংখ্যাজনিত চাপ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বেশি হুমকিস্বরূপ।
২০১৯ সালে চীনের একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাসের ফলে চীনের প্রধান পেনশন তহবিল ২০৩৫ সালে শেষ হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাংক পিউ রিসার্চের গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, চীনে প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজনই মনে করে যে তাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ২০১৬ সাল থেকেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নভেল করোনাভাইরাস ওই সংকটকে আরো বাড়িয়েছে।
বলা জরুরি যে পুকুরে ঢিল ছুড়লে যেমন লহর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, চীনের জনসংখ্যা সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সেভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কেননা কর্মক্ষম জনশক্তি হ্রাস পাওয়া মানে শ্রমমূল্য বাড়বে। এর প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় ও ভোগ্যমূল্য বেড়ে যাবে। এমনিতেও বর্তমানে প্রাপ্ত সব তথ্যই জানান দিচ্ছে যে পৃথিবীর উৎপাদন কারখানা নামে পরিচিত চীনের উৎপাদন কার্যক্রম এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এরই মধ্যে কমে এসেছে।
চীনে জন্মহার বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ সফল না হওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে দেশটিকে অন্য পথে হাঁটার কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট জর্জ ম্যাগনাস। তিনি মনে করেন, এজন্য জোরালো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার মতে, দেশটির কর্মজীবী মানুষের অবসরের বয়স নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। চীনে পুরুষদের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবসরের বয়স ৬০ বছর, যা ওইসিডি-ভুক্ত দেশগুলোয় গড়ে ৬৪ দশমিক ২ বছর। সরকারি চাকরিজীবী নারীদের ক্ষেত্রে এ বয়সটা ৫৫ বছর এবং শ্রমজীবী নারীদের জন্য অবসরের বয়স ৫০ বছর। যদিও এর আগে অবসরের বয়স বাড়ানোর চেষ্টা ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়েছিল। কারণ দেশটির বয়স্ক শ্রমিকরা তাদের পেনশনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে চান না।
কৌতূহলের বিষয় হলো, এরই মধ্যে বিকল্প পথ হিসেবে চীন রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অটোমেশনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে কিন্তু এর প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়। অনেক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতিতে চীনা আধিপত্য বেশি দিন আর শুধু জনমিতিক লভ্যাংশ দিয়ে বজায় রাখা সম্ভব হবে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, চীন যদি ভিন্ন কোনো উপায় বের করে তাদের উন্নতিকে ধরে রাখতে পারে তবে তা মন্দ হবে না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, উৎপাদনের মতো তাদের ভিন্ন দিকেও মনোযোগ দেয়া উচিত।
২০১৬ সালের ১৬ মার্চ প্রকাশিত এক আর্টিকেলে সামান্থা চ্যান আরেকটি কৌতূহল জাগানো তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান যে গাছের শিরা-উপশিরা বয়ে যেভাবে পানি চলাচল করে, চীনে তেমনি এক ধরনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২১ সালে করা চীনের কমিউনিস্ট যুবলীগের এক জরিপমতে, চীনের শহরে প্রায় তিন হাজার তরুণ নারী বাস করে যাদের বয়স ১৮-২৬ বছর। শহরে বসবাস করা ২৫ ভাগ পুরুষের তুলনায় ৪০ শতাংশ তরুণ নারীর মধ্যে বিয়ের পরিকল্পনা নেই। এমন চিন্তা উৎসারিত হয়েছে সন্তান পালনের ব্যয় ও বহুকাল ধরে চলা এক সন্তান নীতি সম্পর্কিত আর্থসামাজিক ও শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য।
সমাজ অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বর্তমানে চীনের ১৬-৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনসংখ্যা ৮৭৫ মিলিয়ন। এটি মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ। যদিও আগামীতে এ সংখ্যা হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অ্যানালিস্ট ওয়াইআইয়ের মতে, ২০১৮ সালের চীনের জনমিতিক গঠন ১৯৯২ সালে জাপানের জনমিতিক গঠনের মতো। সুতরাং ২০২৪ সালে চীনের জনমিতিক গঠন ২০২০ সালের জাপানের জনমিতিক গঠনের মতো হবে।
তবে চীনের এ সংকট বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির একটি দ্বার উন্মোচিত করতে পারে। যদি কখনো চীন অভিবাসী গ্রহণে উদার নীতি গ্রহণ করে তাহলে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি পাঠিয়ে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি করা যাবে। অবশ্য এজন্য বাংলাদেশকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে মনোযোগী ও উদ্যোগী হতে হবে।
মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র, তথ্য অধিকার ও সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়াদির বিশ্লেষক