প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন দুই লাখ টন কমতে পারে। একই সঙ্গে ধান, গম, ভুট্টাসহ সামগ্রিক শস্য উৎপাদন কমতে পারে তিন লাখ টনেরও বেশি। বৈশ্বিকভাবেও চাল উৎপাদন ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমার আশঙ্কা করা হয়েছে। সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা, উৎপাদক পর্যায়ে ধানের দাম কমে যাওয়া ও কৃষি উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বাড়ায় কৃষকের মুনাফা সংকুচিত হওয়াকেই এ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এফএওর এ সতর্কবার্তাকে আমলে নিয়ে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে সরকারকে বহুমুখী ও দৃশ্যমান নীতিসহায়তা নিতে হবে।
চাল উৎপাদন কমে যাওয়ার উদ্বেগ কেবল আবহাওয়াগত সংকটেই আটকে নেই। কৃষি অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের প্রকৃত মুনাফা প্রায় ঋণাত্মক। সরকারি হিসাবেই কেজিপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান সামান্য। এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেচ, পরিবহন ও মাড়াইয়ের খরচ আরো বেড়েছে। এরই মধ্যে চলতি বোরো মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় দুই লাখ টনের বেশি ধান নষ্ট হয়েছে। গত বছরও ভয়াবহ বন্যায় বহু ধান নষ্ট হয়েছে। এদিকে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেচ, পরিবহন ও মাড়াইয়ের খরচ ব্যাপক হারে বেড়েছে। সরকারি তথ্যমতে, কেজিপ্রতি বোরো ধানের উৎপাদন খরচ ২৪ টাকার কিছু বেশি দেখানো হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকের প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ধান বিক্রি করে কৃষকের ঘরে কাঙ্ক্ষিত লাভ আসছে না। এজন্য কৃষক ক্রমেই ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে অপেক্ষাকৃত লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এজন্য ধানের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নিরূপণ করে প্রতি মৌসুমের আগে লাভজনক ক্রয়মূল্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন করে কৃষককে লাভবান করতে হবে।
আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তার মধ্যেও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এশিয়ার একাধিক দেশ কার্যকর কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে। ভিয়েতনাম সরকার বিকল্প সেচন পদ্ধতি অবলম্বনে যে জাতীয় কর্মসূচি নিয়েছে তা সেচের পানির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) প্রযুক্তিগত সহায়তায় এ কর্মসূচিতে দেড় লাখের বেশি কৃষক পরিবার যুক্ত হয়েছে। এভাবে উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের আয় বাড়ানো গেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এরই মধ্যে জলবায়ু সহনশীল আউশ-আমন-বোরো জাত উদ্ভাবন করেছে এবং লবণাক্ততা ও বন্যাসহিষ্ণু জাতের গবেষণাও চলমান। প্রয়োজন হলো এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও ব্যাপক হারে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া, সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং এডব্লিউডির মতো পানিসাশ্রয়ী সেচপদ্ধতি জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে নেয়া।
এফএওর পূর্বাভাস এও বলছে, চাল উৎপাদন কমলেও দেশে এর আমদানি কমবে। এটি ইতিবাচক হলেও ঝুঁকি বিবেচনায় আগাম কিছু সিদ্ধান্ত জরুরি। দেশীয় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত আমদানি বিকল্প প্রস্তুত রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে একক উৎস বা বাজারের ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎস থেকে আমদানির বহুমুখী চুক্তি প্রস্তুত রাখতে হবে। আবার আমদানিনির্ভরতা যেন দেশীয় উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহ কমিয়ে না দেয়, সেজন্য আমদানি ও সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণে কৃষকের স্বার্থ সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
কৃষক দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে যাতে উৎপাদনে নিযুক্ত থাকতে পারে সেজন্য বীজ ও জ্বালানিতে ভর্তুকির আওতা এবং কার্যকারিতা আরো বাড়াতে হবে। কৃষক সহায়তার পরিধি দ্রুত করতে ডিজিটাল পদ্ধতির সম্পসারণ করতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সংবেদনশীলতা বিবেচনায় সেচ ব্যবস্থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পরিচালনা করা যেতে পারে। সেটি স্বল্পমেয়াদে সম্ভব নয় বিধায় সেচ পাম্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা ও সুলভ মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাজারে ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর উদ্যোগ জরুরি। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত বা স্বল্প সুদের ফসল বীমা চালু করতে হবে, যাতে আকস্মিক বন্যা বা খরায় ফসলহানির ক্ষতি আংশিক হলেও পুষিয়ে নেয়া যায়। কৃষি গবেষণা ও উচ্চফলনশীল, জলবায়ুসহিষ্ণু ধানবীজ উদ্ভাবনে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে কম খরচে বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব হয়। বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট এড়াতে সরকারি খাদ্য গুদাম নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে নেয়া সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ কর্মসূচি এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে এ বাবদ প্রায় ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের নগদ সহায়তা দেয়ার উদ্যোগও আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এগুলো যেন সব অঞ্চলেই সমভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ঋণ মওকুফ বা ভর্তুকি প্রকৃতপক্ষে কতজন প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতায় তা কতটা বিলম্বিত হচ্ছে—এসব নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন প্রয়োজন। কৃষি খাতে ভর্তুকির ধরন বদলে তা উৎপাদনশীলতা ও জলবায়ু অভিযোজনমুখী করাই বিচক্ষণ পথ।
কৃষকের প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কৃষি ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সরলীকরণ, জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণের পরিসর বৃদ্ধি এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি বিতরণের ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সংসদীয় কমিটি বা স্বাধীন নিরীক্ষা সংস্থার মাধ্যমে বাজেট ঘোষিত কৃষি সহায়তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশ্যে পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এফএওর পূর্বাভাস কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি আগাম সতর্কবার্তা। এ সতর্কবার্তাকে কাজে লাগিয়ে এখনই আগাম প্রস্তুতি রাখতে হবে সরকারকে।