কিন্তু শিক্ষা কাঠামো অর্থাৎ শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত, অবকাঠামোগত মূল্যায়ন এবং পেশার মর্যাদা বাড়াতে টেকসই বিনিয়োগের অভাব রয়ে গেছে। ফলে দেশে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে সনদ আছে, দক্ষতা নেই। সরকারি উদ্যোগে শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি বেড়েছে, বেড়েছে পাসের হার। কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করছে না। এসব ব্যর্থতার পেছনে পাঠ্যক্রম ও প্রযুক্তি উপকরণের অভাবকে একটি কারণ বলা হলেও মূল সমস্যা শ্রেণীকক্ষের সংস্কৃতিতে। শ্রেণীকক্ষগুলো বহুলাংশে দক্ষ শিক্ষকের অপেক্ষায়। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান সেই সত্যটিকে সংখ্যার ভাষায় হাজির করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ সবার পেছনে। বিশেষত মাধ্যমিক স্তরে গড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিক্ষক ন্যূনতম যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করেন। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলক অনগ্রসর দেশগুলোর বিচারেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। বিষয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য উদ্বেগজনক, কারণ এ স্তর উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অভিগম্যতার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা অবকাঠামোয় শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন স্তরে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রশিক্ষণের গুণগত মান আজও প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষকদের অনেকেই আধুনিক পাঠদানের কৌশল, প্রযুক্তি উপকরণ ব্যবহারে পর্যাপ্ত দক্ষ এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় পরিপূর্ণভাবে পারদর্শী হচ্ছেন না। তার প্রয়োগ শ্রেণীকক্ষে নেই বলেই শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ছে না কিংবা স্বাভাবিক গাণিতিক সমস্যার সমাধান পেতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের এ সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষার ভিতও দুর্বল হচ্ছে। মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করায় শিক্ষকদের অনেকেই প্রশিক্ষণ শেষে শ্রেণীকক্ষে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন না। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিরাট তফাত রয়েছে। এ বৈপরীত্যই দেশের শিক্ষা সংকটের কেন্দ্রবিন্দু—সংখ্যাগত অগ্রগতি, কিন্তু গুণগত স্থবিরতা। প্রশিক্ষণ এখন অনেক ক্ষেত্রেই পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে একটি আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
দক্ষ শিক্ষকের ক্ষেত্রে শুধু প্রশিক্ষণের মানই বড় সমস্যা নয়। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবও নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া প্রশিক্ষণে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না পাঠিয়ে তদবিরের মাধ্যমে অনেককে পাঠানোর অভিযোগও মিলেছে বহুবার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পদোন্নতির শর্ত পূরণের স্বার্থে অনেকে প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এসব সমস্যা সমাধানের জন্যই শিক্ষকদের দক্ষতা মূল্যায়ন এবং গুণগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। একই সমস্যায় ভুগেছিল এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া। দেশটিতে একসময় সাক্ষরতা ও বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল। কিন্তু শিক্ষার গুণমান ছিল তলানিতে। এজন্য বিশেষ সার্টিফিকেশন কার্যক্রম চালু করলেও সামঞ্জস্যতার অভাবে পাঠদানের মান বাড়ানো যায়নি। পরবর্তীতে ‘গুরু পেঙ্গেরাক’ বা ‘মুভার টিচার’ মাধ্যমে শিক্ষকদের অনুশীলনমূলক ও সহকর্মী-শিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় ফল পেতে সময় লাগলেও পদ্ধতির পরিবর্তনটি যে ইতিবাচক তা অনেক গবেষকই স্বীকার করেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ এখন জনবহুল তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবিধা নিতে চাইছে। কিন্তু সেই সুবিধা কেবল সংখ্যায় নয়, দক্ষতায় আসে। যদি আমাদের তরুণ প্রজন্ম বিশ্লেষণ করতে, সমাধান তৈরি করতে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারে তবে জনমিতির লভ্যাংশ জনমিতির বোঝায় পরিণত হবে। আর এ লভ্যাংশ আদায়ে শিক্ষকের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। একজন দক্ষ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান পৌঁছে তিনি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসু মন তৈরি করেন, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়েন, বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ স্থাপন করেন। এটিই শিক্ষার উৎপাদনশীল রূপ। কিন্তু এ রূপান্তর তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষক নিজে যথেষ্ট সক্ষম, অনুপ্রাণিত এবং সম্মানিত। এজন্য কিছু সমাধান খুঁজতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক ও মানসম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষকতায় প্রবেশের আগেই বিষয়ভিত্তিক, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি বিএড প্রতিষ্ঠানগুলোর মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনীতিমুক্ত করার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত, স্বচ্ছ, বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা প্রয়োগে নজরদারি ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। বিষয়ভিত্তিক, চলমান এবং শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগযোগ্য প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদ প্রদান করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন কাঠামো এমন হতে হবে যাতে দেশের মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় শিল্প ও কৃষি খাতের সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। শিক্ষক যদি নিজে বাস্তব জীবনে বিষয়টির প্রয়োগ জানেন, তবেই তিনি শিক্ষার্থীকে সেটি শেখাতে পারবেন। আবার সংকটের জন্য শুধু শিক্ষক বা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকেই দায়ী করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মূল্যায়নের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষক। একজন দক্ষ শিক্ষকই শিক্ষার্থীর আগ্রহ তৈরি করতে পারেন, শেখার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেন এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষাকে কার্যকর করতে পারেন। বর্তমান সমস্যাটির গুরুত্ব স্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা কেবল কমিটির রিপোর্টে থাকলে চলবে না, বাস্তবায়নের পথে নামতে হবে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, তবে শিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সংখ্যার অগ্রগতি দিয়ে নয়, গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত না করতে পারলে তার মূল্য দিতে হবে গোটা জাতিকে।