আলোকপাত

ট্রাম্প এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির চিত্র

আমরা কঠোর ভূ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দ্বন্দ্বে প্রবেশ করেছি। তিন বছর ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-হামাস দ্বন্দ্ব একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের গভীর স্নায়ুযুদ্ধ এ দশকের কোনো এক সময় তাইওয়ানকে আরো উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। যদি নভেম্বরে আমেরিকার নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয় তাহলে বিশ্ব আবার অস্থিতিশীল হতে পারে। এসব ঝুঁকি এখনি অর্থনীতি ও

আমরা কঠোর ভূ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দ্বন্দ্বে প্রবেশ করেছি। তিন বছর ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-হামাস দ্বন্দ্ব একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের গভীর স্নায়ুযুদ্ধ এ দশকের কোনো এক সময় তাইওয়ানকে আরো উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। যদি নভেম্বরে আমেরিকার নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয় তাহলে বিশ্ব আবার অস্থিতিশীল হতে পারে। এসব ঝুঁকি এখনি অর্থনীতি ও বাজারের ওপর সীমিত প্রভাব ফেলছে। এটা কি শিগগিরই বদলে যেতে পারে? 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আগের মতোই নিষ্ঠুর রয়ে গেছে। এর প্রভাবগুলো সম্ভবত বিশ্বব্যাপী আরো পরিমিত হতে পারে। ন্যাটোর সরাসরি সম্পৃক্ততার ঝুঁকি বা রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার যুদ্ধে আগের তুলনায় বর্তমানে কম। একইভাবে যুদ্ধের শুরুতে জ্বালানি, খাদ্য, সার ও শিল্প ধাতুর মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ সময় ইউরোপ অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিমিত প্রবৃদ্ধির মন্দা দিয়ে এ ধাক্কা সামলেছে। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন, এটি ভয়াবহ মন্দা নয়। আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে রাশিয়ান হাইড্রোকার্বন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। শস্য রফতানির জন্য ইউক্রেন কৃষ্ণসাগরের করিডোর পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছে। এর পর থেকে খাদ্যের দাম কমেছে। এখনো ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সীমিত প্রভাব রয়েছে। তবে তা ঠিক, ২০২৩ সালে চতুর্থ প্রান্তিকে ইসরায়েলের জিডিপি তীব্রভাবে সংকুচিত হয়েছে। যতদিন এ সংঘাত অব্যাহত থাকবে ততদিন সম্ভবত জিডিপি সংকুচিত থাকবে। স্পষ্টত গাজার অর্থনৈতিক ক্ষতি আরো বেশি গুরুতর। সুয়েজ খাল মিসরের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি প্রধান উৎস। কিন্তু লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াত ইয়েমেনি হুথিদের আক্রমণের কারণে হ্রাস পেয়েছে। তা সত্ত্বেও, যদি এ দ্বন্দ্বের একই ধারা বিদ্যমান থাকে তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাজারের প্রভাবও সীমিত থাকবে।

সর্বোপরি এ ধরনের দ্বন্দ্ব বড় আকারে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। যেমন—লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বা ইসরায়েল (সম্ভবত আমেরিকা) ও ইরান যুদ্ধের পথে রয়েছে, যা গুরুতর বৈশ্বিক পতনের প্রত্যাশা বাড়াতে পারে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বড় আকারের যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানি ব্যাপক হ্রাস করতে পারে। ১৯৭৩ সালের ইওম-কিপপুর যুদ্ধ এবং ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির আঘাতে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়। সৌভাগ্যবশত তীব্র আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সম্ভাবনা আপাতত কম রয়েছে। 

যদিও আমেরিকা ও চীনের স্নায়ুযুদ্ধ বা কৌশলগত প্রতিযোগিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো খারাপ হতে পারে। তবে এ বছর তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি খুব বেশি নাও হতে পারে। 

গত বছরের শেষের দিকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ও প্রতিপক্ষ চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং কৌশলগত বন্ধুত্ব স্থাপনে সম্মত হয়। তাইওয়ানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফলের বিষয়েও চীনের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক সংযত হয়েছে। যদিও এ দশকের শেষের দিকে তাইওয়ান সমস্যা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তবে এই বছর বা পরের বছর তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চীনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতা আমেরিকা এবং পশ্চিমাদের  সঙ্গে তুলনামূলক কম সংঘাতের দিকে পরিচালিত করতে পারে। 

একই সময়ে পাশ্চাত্যের উপহাস, পুনর্বিবেচনা, বন্ধুত্ব-সঞ্চয় এবং পণ্য, পরিষেবা, মূলধন এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যের সীমাবদ্ধতা স্বল্পমেয়াদে খুব বেশি তীব্র হবে না। যতদিন তাদের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রিত থাকবে, ততদিন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব পরিমিত থাকবে।

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাজারের প্রতি সবচেয়ে বড় ভূ রাজনৈতিক হুমকি। কিন্তু এখানে স্বীকার করা দরকার, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাইডেন কিছু বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার ভাগাভাগি করে নেন। একইভাবে আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা চীনের বিষয়ে কঠোর এবং তা থাকবে। জো বাইডেন ও ডোনাল্ট ট্রাম্প উভয়ই ইসরায়েলের কঠোর সমর্থক। তবে তারা এটাও স্বীকার করে, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের কাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিকীকরণের জন্য শেষ পর্যন্ত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কিছু স্বীকৃতির প্রয়োজন হতে পারে।

ন্যাটো, ইউরোপ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মতবিরোধ। অনেকেই আশঙ্কা করেন, ট্রাম্প ইউক্রেনকে ত্যাগ করে রাশিয়াকে যুদ্ধে জিততে দেবেন। যেহেতু তার চীনের প্রতি কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই রাশিয়াকে ইউক্রেন দখল করতে দিয়ে (তাইওয়ান সম্পর্কে) সংকেত পাঠাবে। যাতে চীন তা নিয়ে চিন্তিত হতে পারে। তথাপি ট্রাম্প ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষায় আরো বেশি ব্যয় করতে চান। যদি তারা তা করে, তাহলে তিনি এই জোটের গুরুত্ব স্বীকার করতে পারেন। কারণ চীনকে এশিয়ার দিকে ঝুঁকতে বাধা দেবে। অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে বাজারকে প্রভাবিত করাই দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় উপায়। এতে কোনো সন্দেহ নেই, মার্কিন সংরক্ষণবাদী নীতিগুলো আরো কঠোর হয়ে উঠবে। 

ট্রাম্প এরই মধ্যে বলেছেন, তিনি আমেরিকার সব আমদানি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করবে (বর্তমানে গড় শুল্কের হার প্রায় ২ শতাংশ)। সম্ভবত চীন থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর আরো বেশি শুল্ক আরোপ করবে। তা কেবল চীনের মতো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেই নয়, ইউরোপ ও এশিয়ায় জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমেরিকার মিত্রদের সঙ্গেও নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের সূত্রপাত করবে।

বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে তুলবে, যা বৃহত্তম ভূ রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত করবে। আগামী মাসগুলোয় বাজারকে বিবেচনা করা উচিত। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বায়নের অবনতি, বিচ্ছিন্নতা, বিভাজন, সংরক্ষণবাদ, বৈশ্বিক সরবরাহ প্রবাহের বিভাজন ও ডি-ডলারাইজেশন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারকে আরো বড় বড় ঝুঁকিতে ফেলবে। 

ট্রাম্পসম্পর্কিত অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির নিষ্ক্রিয়তার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি অস্বীকৃতির মনোভাব। তিনি ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে আরো নরম ও নমনীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করবেন। পরিশেষে ট্রাম্পের আর্থিক নীতিগুলো ঘাটতি বাড়িয়ে দেবে, যা এরই মধ্যে অনেক বেশি। যে কর ছাড়ের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, তা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় আরো বেশি ব্যয় করা হবে। বন্ড সতর্কদের ঝুঁকি অবশেষে অনেক বেশি উৎপাদনসহ বন্ড বাজারকে বিস্মিত করবে। বেসরকারি এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ বেশি এবং বৃদ্ধি পাওয়ায় তা আর্থিক সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলবে। 

যেমনটি বলা হয়, এ অর্থনীতি বোকা। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক নীতি এজেন্ডা এখন বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

নুরিয়েল রুবিনি: নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক; সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ফিনটেক-বিষয়ক কোম্পানি অ্যাটলাস ক্যাপিটাল টিমের মুখ্য অর্থনীতিবিদ

ভাষান্তর: দিদারুল হক

আরও