বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক উৎপাদন সময়ের দাবি

বাংলাদেশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতি বছর দ্রুত বাড়ছে। কৃষি সেচ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, লিফট, এয়ার কন্ডিশনার, ডেটা সেন্টার, মোবাইল টাওয়ার এবং অসংখ্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু এ চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরনো হওয়ায় প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ঝড়, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এ বাস্তবতায় সূর্যের অফুরন্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং দৈনিক গড় সৌর বিকিরণও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনুকূল। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে স্রেডা নেট মিটারিং কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং সৌরযন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী দেশে নেট মিটারিংয়ের আওতায় দুই হাজারেরও বেশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে, যার মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। নেট মিটারিং ব্যবস্থা (দ্বিমুখী বিদ্যুৎ বিলিং) সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এ ব্যবস্থায় বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেল থেকে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায় এবং সে বিদ্যুতের মূল্য গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও আর্থিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। সরকার এ কর্মসূচি সম্প্রসারণে বিভিন্ন ও অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালু করেছে।

সোলার সিস্টেমে প্যানেলের ভেতরে থাকা ফটোভোল্টাইক (পিভি) সেল সূর্যের আলো শোষণ করে ডিসি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। পরে ইনভার্টার এ ডিসি বিদ্যুৎকে এসি বিদ্যুতে রূপান্তর করে, যা বাড়ি, অফিস বা শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা রাখা হয় অথবা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এ প্রযুক্তির কারণে দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতেও ব্যবহার করা সম্ভব হয়, যদি উপযুক্ত ব্যাটারি সংযুক্ত থাকে। বর্তমানে তিন ধরনের সোলার সিস্টেম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। প্রথমটি অফ-গ্রিড সোলার সিস্টেম, যেখানে কোনো জাতীয় গ্রিডের সংযোগ থাকে না এবং ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ জমা রেখে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়টি অন-গ্রিড সোলার সিস্টেম, যেখানে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে পাঠানো যায় এবং ব্যবহারকারী বিদ্যুৎ বিলে সমন্বয়ের সুবিধা পান। তৃতীয়টি হাইব্রিড সোলার সিস্টেম, যেখানে গ্রিড ও ব্যাটারি উভয় ব্যবস্থাই থাকে। বর্তমানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য হাইব্রিড সিস্টেম সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এতে কয়লা, তেল কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়াতে হয় না। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ হয় না। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণও কমায়। যেহেতু সূর্যের আলো বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তাই একবার সোলার সিস্টেম স্থাপন করার পর দীর্ঘদিন খুব কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। সোলার প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।

গ্রামীণ বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সুবিধাভোগী বেশ লক্ষণীয়। যেখানে জাতীয় গ্রিড পৌঁছায়নি বা বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ পাম্প, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, মসজিদ, বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সহজেই পরিচালিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও সোলার প্রযুক্তি অত্যন্ত লাভজনক। শুরুতে খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি সাধারণ এক কিলোওয়াট সোলার সিস্টেম স্থাপনে আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তিন কিলোওয়াট সিস্টেমের জন্য প্রায় ৩-৫ লাখ টাকা এবং পাঁচ কিলোওয়াট হাইব্রিড সিস্টেমের জন্য প্রায় ৫-৮ লাখ টাকা বা তারও বেশি খরচ হতে পারে। তবে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে সোলার যন্ত্রপাতির দাম ধীরে ধীরে কমছে। সোলার প্যানেলের স্থায়িত্বও অত্যন্ত সন্তোষজনক। উন্নতমানের সৌর প্যানেল সাধারণত ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। এ সময়ে প্রতি বছর উৎপাদনক্ষমতা সামান্য কমলেও অধিকাংশ প্যানেল দীর্ঘদিন ভালোভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। আধুনিক ইনভার্টারের আয়ু সাধারণত ১০-১৫ বছর এবং উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ু ৮-১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করলে পুরো সিস্টেম দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে। তবে সোলার প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রথমত, প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, সূর্যের আলোর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ায় বর্ষাকাল বা টানা মেঘলা আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। তৃতীয়ত, ব্যাটারি পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়। চতুর্থত, শহরের ছোট ছাদে বড় ক্ষমতার সিস্টেম স্থাপন করা সম্ভব হয় না। এছাড়া নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় সোলার প্যানেল পাওয়া যায়। যেমন মনোক্রিস্টালাইন, পলিক্রিস্টালাইন, বাইফেসিয়াল, ফ্লেক্সিবল ও বিল্ডিং-ইন্টিগ্রেটেড সোলার প্যানেল। এগুলোর মধ্যে মনোক্রিস্টালাইন প্যানেলের দক্ষতা বেশি হলেও দাম তুলনামূলক বেশি। পলিক্রিস্টালাইন প্যানেল তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। এছাড়া ভাঁজযোগ্য ও বহনযোগ্য ছোট সোলার প্যানেলও এখন জনপ্রিয় হচ্ছে। দেশেই যদি সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, চার্জ কন্ট্রোলার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ উৎপাদন করা যায়, তবে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হবে। বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে সৌরবিদ্যুতে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক। ভারতও বৃহৎ আকারে সৌর পার্ক নির্মাণ করছে এবং কৃষিক্ষেত্রে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করেছে। জার্মানি সূর্যালোক তুলনামূলক কম পেলেও উন্নত প্রযুক্তি ও সরকারি নীতির মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে অন্যতম সফল দেশ। বাংলাদেশও এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৮০৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ২০২৮ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করছে সরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৬০ লাখেরও বেশি ‘‌সোলার হোম সিস্টেম’ এবং রুফটপ সোলারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা কোটিরও ওপরে পৌঁছেছে। তবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন (প্রায় ৬০৯ গিগাওয়াট)। দেশটি একাই বিশ্বের মোট সৌরশক্তির প্রায় ৩২ শতাংশ ব্যবহার করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ২০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে এবং ২০৬০ সালের মধ্যে তাদের কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। চীনের অব্যবহৃত সমুদ্রপৃষ্ঠগুলো এখন মাইলকে মাইল সোলার প্যানেলে ঢাকা। বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি দেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ নিম্নরূপ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ইউএসএ) প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার মেগাওয়াট, জাপান ৮৯ হাজার, জার্মানি ৮১ হাজার, ভারত ৭৩ হাজার, ব্রাজিল ৩৭ হাজার মেগাওয়াট।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার: অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও