চলতি বিশ্ব

মূল্যস্ফীতির সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন কার্যকর বৈশ্বিক সমন্বয়

হঠাৎ করে মূল্যস্ফীতি কার্যত সব দেশের জন্যই একটি বড় রকমের সমস্যা হয়ে উঠেছে। লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে, উন্নত অর্থনীতিগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার অনেকাংশে বেশি। আমেরিকার বার্ষিক ভোক্তামূল্যসংক্রান্ত মূল্যস্ফীতির পরিমাণ বর্তমানে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউরোপীয় অঞ্চলগুলোয় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে ৭ শতাংশ। উদীয়মান

হঠাৎ করে মূল্যস্ফীতি কার্যত সব দেশের জন্যই একটি বড় রকমের সমস্যা হয়ে উঠেছে। লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে, উন্নত অর্থনীতিগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার অনেকাংশে বেশি। আমেরিকার বার্ষিক ভোক্তামূল্যসংক্রান্ত মূল্যস্ফীতির পরিমাণ বর্তমানে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউরোপীয় অঞ্চলগুলোয় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে ৭ শতাংশ। উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে স্থিতিস্থাপক এশীয় অর্থনীতিগুলোও ছুঁয়েছে উচ্চমূল্যস্ফীতির রেকর্ড। গত মার্চের হিসাব অনুযায়ী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এ হার যথাক্রমে ৭, ৬ দশমিক ২ ও ৪ দশমিক ১ শতাংশ। 

অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে দেশভেদে মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়ার সুনির্দিষ্ট কারণও বিদ্যমান। যেমন তুরস্কে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার চেষ্টা করছেন। শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চরম অব্যবস্থাপনা ও কৃষিনীতি সংস্কারকে দায়ী করা হচ্ছে।

যাই হোক না কেন, অর্থনীতির মধ্যে মূল্যস্ফীতি সাধারণ অর্থে সবচেয়ে কম বোধগম্য একটি বিষয়। অতীতের উচ্চমূল্যস্ফীতির ঘটনাগুলো, যেমন ১৯২৩ সালে জার্মানি ও ১৯৪৬ সালে হাঙ্গেরিতে সংগঠিত রেকর্ড ভাঙা মূল্যস্ফীতি কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকা ও অফ্রিকার কিছু অংশে সংঘটিত মূল্যস্ফীতির ঘটনাগুলো ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান কিন্তু আমাদের রয়েছে।

কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির সূক্ষ্ম সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনা এখন এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে, অর্থনীতি যেখানে এর সবচেয়ে দুর্বল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় আর্থিক ভারসাম্যবিষয়ক গবেষণাকে বাতিল করা হয়েছিল, কারণ গাণিতিকভাবে এর মডেল করা কঠিন। ফলে এখনো আমরা এর মূল্য দিচ্ছি। মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কথোপকথনের বেশির ভাগই পেশাদার শোনায়, তবে তা অনেকটা পাখির কিচিরমিচিরের মতো। সাধারণের বোধগম্য নয়। সাধারণ লোকের কথাবার্তাগুলোও অসংগতিপূর্ণ হতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞদের বকবক অর্থহীন বলেই মনে হয়।

এ পর্যায়ে আমরা যা করতে পারি তা হলো, মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে অপরিহার্য আর্থিক নীতির উন্নত বৈশ্বিক সমন্বয়। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এ ধরনের ন্যূনতম পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মূল্যস্ফীতি এ অঞ্চলগুলোর বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে চরম দারিদ্র্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

১৯৮১ সাল থেকে মার্কিন মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সূত্র ধরে নানাভাবে দায়ী করা হয়ে আসছে ফেডারেল রিজার্ভকে। আমার মনে হয়, সমালোচনার মাত্রা একটু বেশিই হয়েছে। প্রথমত, কিছু পর্যবেক্ষকের দাবির বিপরীতে বর্তমান মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ চাহিদা নয়, বরং জোগানের কারণে ঘটছে। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারী দ্বারা প্রাথমিকভাবে শুরু হওয়া বাধা, পরবর্তী সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়া। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে যা আরো বেড়েছে।

অতিরিক্ত তারল্য ও চাহিদার কারণে যখন মূল্যস্ফীতি ঘটে তখন পণ্য ও পরিষেবাজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি আরো অপরিবর্তনশীল হয়। কিন্তু আজ মূল্যস্ফীতির এ অবস্থার জন্য দায়ী জ্বালানি ও খাদ্য। আমরা যদি এ পণ্যগুলোকে সরিয়ে রাখি তাহলে ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতির পরিমাণ এক ধাপে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশ হবে। যদিও আমেরিকান মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে হবে মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোজোনের মধ্যে মূল্যস্ফীতির পার্থক্য নির্দেশ করে যে সামগ্রিক চাহিদা আজকের মূল্য চাপের প্রাথমিক কারণ না হলেও আমেরিকায় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। তদুপরি চাহিদা বৃদ্ধি ঘটেছে একটি সংগত কারণে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরকারি ব্যয় প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছে, যার মধ্যে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন আমেরিকার পুনরুদ্ধার কর্মসূচির সঙ্গে কভিড-১৯-এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সমর্থনের জন্য জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ মহামারীর অভিঘাত মোকাবেলায় ব্যয় করা হচ্ছে। তাই সেখানে মূল্যস্ফীতি বেশি হলেও দরিদ্র আমেরিকানরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

ব্যাপকসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ উদীয়মান অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটি মনে রাখা জরুরি, যখন একটি দেশ প্রধানত চাহিদাচালিত মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয় এবং বোর্ডজুড়ে দাম বেড়ে যায় তখন বিনিয়ম হারের সংশোধন প্রভাবটিকে এর সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। যদি একটি দেশের সব পণ্য ও পরিষেবার দাম এক্স শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং মুদ্রার মানের এক্স শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটে তাহলে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে এর স্পিলওভার প্রভাব হবে সামান্য। কিন্তু পণ্য ও পরিষেবাজুড়ে বর্তমানের অসম ও তির্যক মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্য শুধু একটি বিনিময় হার সংশোধনের মাধ্যমে একটি দেশে সীমাবদ্ধ করা যায় না। স্পিলওভার প্রভাব তখন অনিবার্য। আর বর্তমানে ঠিক তা-ই ঘটছে।

আজকের মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তুলনামূলকভাবে অকার্যকর মনে হওয়ার আরেকটি কারণ হলো বিশ্বায়নের অগ্রগতি। সপ্তদশ শতাব্দীতে সুইডেনের রিক্সব্যাংক (১৬৬৮) ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (১৬৯৪) যখন বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ছিল, বিষয়টি তখন থেকে বোঝা যায় যে একক অর্থনীতিতে একাধিক অর্থ সৃষ্টিকারী কর্তৃপক্ষ থাকা উচিত নয়। এ নীতি অনুসারে তত্কালীন প্রধান অর্থনীতিগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।

তবে অপ্রত্যাশিতভাবে এখন ব্যবস্থাটিকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। বিশ্বায়নের এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি (সাম্প্রতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সত্ত্বেও) পণ্য, পরিষেবা ও এক দেশ থেকে অন্য দেশে পুঁজিপ্রবাহের মাধ্যমে বিশ্ব ক্রমে একক অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে রয়েছে বর্তমানে ১৫০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সপ্তদশ শতাব্দীর নীতিনির্ধারকরা ঠিক যে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, আমরা সেখানে ফিরে যাচ্ছি। 

এর মানে এটি মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনার জন্য সমস্যাজনক। কোনো দেশ যদি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি রোধের চেষ্টা করে তাহলে সেখানে বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে অর্থপ্রবাহ বাড়বে এবং রফতানি হ্রাস পাবে। এভাবে প্রতিটি দেশ স্বভাবতই আর্থিক কড়াকড়ি আরোপে কম উৎসাহিত হবে। বরং তারা চাইবে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে।

জননীতির অন্য অনেক বিষয় যেমন সত্য, তেমনি সম্মিলিত এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আরো কার্যকর বৈশ্বিক সমন্বয় প্রয়োজন। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার ইস্যুকারী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এ প্রচেষ্টার জন্য বড় ধরনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও