আমরা ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের সেবা দিয়ে থাকি। বাসা, শিল্প-কারখানায় সর্বত্রই আমরা এলপিজি সরবরাহ করছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমরা প্রতিপক্ষ হয়ে গিয়েছি। এ কনক্লেভে জ্বালানি উপদেষ্টা তার বক্তব্যে কিছু কথা বলেছেন। সেগুলো শুনে আমার ধারণা তিনি সেভাবে এলপিজি আমদানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হননি। তিনি বোঝার চেষ্টা করেননি, এলপিজি আমদানি কীভাবে হয়? বাজারে এলপিজির দাম কীভাবে নির্ধারণ হয়?
এলপিজির বাজারদর ব্যবসায়ীরা নির্ধারণ করেন না। এলপিজির দাম সরকারই (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি) নির্ধারণ করে। সিপি (সৌদি কার্গো মূল্য) ছাড়া অন্য যেসব দাম আছে সেগুলো আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছে বিইআরসি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু বিইআরসি এলপিজির দাম পরিবর্তন করেনি। জ্বালানি উপদেষ্টা চান এলপিজির দাম ১ হাজার টাকায় নেমে আসুক। সরকার যদি আমাদের ৭ শতাংশ লাভ দেয়, আমরা সব এলপিজি আমদানি করে তাদের দিয়ে দেব। সরকার শুধু বিক্রি করে আমাদের লাভটা দেবে। তাতেই আমরা সবাই খুশি।
বর্তমানে এলপিজি বাজারের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। প্রত্যেকটি এলপিজি কোম্পানি রুগ্ণ। বর্তমানে ২৮টি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে।
এ লাইসেন্সগুলো যারা অপারেট করছে তারা প্রত্যেকেই আশাহত। প্রশ্ন আসতে পারে তার পরও এলপিজির সরবরাহ আছে কীভাবে? এটা আমরা বন্ধ করতে পারছি না, বন্ধ করলেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা যাবে না।
জ্বালানি উপদেষ্টা ১ হাজার টাকায় এলপিজি দেয়ার কথা বলেছেন। টাকা পাচার করে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন। এ ধরনের আলোচনা দুর্ভাগ্যজনক। এটি সঠিক চিন্তা নয়। ব্যবসায়ীদের দেশপ্রেম ও সততা কম নয়। ব্যবসায়ীরা যে টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেটা বাংলাদেশের জনগণের জন্যই।
দেশের এলপিজি খাত ‘এনএসপিজি’ পদ্ধতিতে চলছে। মানে এখানে নো সাবসিডি, নো পেট্রোনাইজেশন, নো গভর্ন্যান্স। অর্থাৎ ভর্তুকি, উৎসাহ ও সুশাসন নেই; যার যেভাবে ইচ্ছা-খুশি সেভাবেই চলছে। এর কারণ হচ্ছে এখানকার কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয় না। আমরা একাধিকবার বলেছি, এলপিজি সিলিন্ডার বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হচ্ছে। এর একটি কারণ আছে। এলপিজি অপারেটররা ডিলার বা ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে সিলিন্ডার সরবরাহ করে। যদি সম্ভব হয় বিনা পয়সায় দেয়। আমরা গ্যাস বিক্রি করি কিন্তু সিলিন্ডার বিক্রি করি না। কিন্তু অনেকেই সিলিন্ডার নিয়ে স্টিল কারখানায় উচ্চ দামে বিক্রি করে দেয়। এটা নিয়ন্ত্রণের জন্য সুষ্ঠু তদারকি ব্যবস্থাপনা দরকার। সরকারকে এটা নিয়ে কাজ করতে হবে। আমরা এটা নিয়ে সরকারকে অবহিত করেছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি!
এলপিজি দাহ্য পদার্থ। দেশে বিভিন্ন স্থানে ক্রস ফিলিং হচ্ছে। এ ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে কিংবা ছোট সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরি করে নেয়া হয় খালি সিলিন্ডারে। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি সিলিন্ডারে গ্যাস কম দেয়া হয়। এতে ঠকছেন গ্রাহক, বাড়ছে দুর্ঘটনা। এর জন্য আমরা দায়ী? না। সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ক্রস ফিলিং নিয়ে সরকার কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। এটা নিয়ে সরকারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
দাম নির্ধারণে আমরা সম্পৃক্ত না। বিইআরসি যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেটি যদি থাকে তাহলে এলপিজি শিল্পকে দীর্ঘদিন টিকা কঠিন। এ কারণে এ খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। এলপিজির দাম নির্ধারণে সিপি ছাড়া অন্য উপাদানগুলো নিয়ে আমাদের বসা উচিত। আমাদের সঙ্গে সরকারের তরফ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। সিপিসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু মিলিয়ে এলপিজির দাম ১ হাজার ২০০ টাকা অতিক্রম করবে। সেটা কোনোভাবেই ১ হাজার টাকা হবে না। এলপিজির দাম ১ হাজার টাকা করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার সেই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। আট থেকে ১০ মাস আগে একটা ডিপ সি টার্মিনাল করার প্রস্তাব দিয়েছি, সেটি এখনো করা হয়নি। এলপিজি এখন ছোট ছোট জাহাজে করে আসে। বড় জাহাজে যেগুলো আসে সেগুলোর জন্য লাইটার করতে হয়। এর জন্য ২৫ দিন চট্টগ্রাম বন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে এ অতিরিক্ত ব্যয় কোথায় যাবে? এটা কমানোর জন্যই ডিপ সি টার্মিনাল দরকার। এতে নিরাপত্তাও নিশ্চিত হতো।
এলপিজি সিলিন্ডার ফিলিং স্টেশনে ফিলিং হচ্ছে। এমন হলে এলপিজি অপারেটরের দরকার কি? কোনো দরকার নেই। সরকারের একটি অপারেটিং সিস্টেম আছে, তদারকির বিষয় আছে। বাংলাদেশে ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটা বাজার আছে। এটাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে কাজে লাগানোর কথা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। কিন্তু এখনো কোনো কাজ হয়নি।
এলপিজির দাম কমানোর দায়িত্ব কেবল আমাদের নয়। একজন মধ্যম সারির অপারেটরকে তার লাইসেন্স ফি বছরে ১ কোটি টাকা দিতে হয়। একদিকে বলা হচ্ছে এলপিজিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে, অন্যদিকে লাইসেন্স ফি ১ কোটি টাকা! বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) এগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট-১৯৭৪ থাকার কারণে বিপিসিকে একটা বাজার ফি দিতে হয়। সেটা ছিল ২ লাখ টাকা। এখন সেটা তারা ২৫ বা ৫০ লাখ টাকা চায়। আমাদের প্রতি বছর ২০টির মতো লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। নবায়ন ফিগুলো দেখলে মনে হবে, বাংলাদেশ থেকে এলপিজিকে বিদায় করার একটা প্রচেষ্টা চলছে। তাহলে কীভাবে আপনি স্বল্প মূল্যে ভোক্তার কাছে এলপিজি পৌঁছাবেন? অথচ এ ফিগুলো যৌক্তিক হওয়া উচিত। যেখানে এলপিজি অগ্রাধিকার পাবে। সরকার যেসব নীতিমালা তৈরি করছে, সেসব কারণে আগামীতে বাসাবাড়িতে ব্যবহার উপযোগী গ্যাসের দাম আরো বেড়ে যাবে।
অবকাঠামো তৈরি হলে আরো বাড়বে এলপিজির চাহিদা। যেমন শহরের ছোট ছোট এলাকায় পাইপের মাধ্যমে বাসায় গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এতে সিলিন্ডার নিয়ে ঝামেলা কমবে। এটা উন্নত দেশে আছে, আমাদের দেশেও সম্ভব। এখানে নিরাপত্তার বিষয় আছে। তাই রাজউকসহ অন্যান্য যেসব সংস্থা আছে সবার সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
আজম জে চৌধুরী: চেয়ারম্যান, ইস্ট কোস্ট গ্রুপ
[‘বাংলাদেশে এলপিজি: অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]