(গতকালের পর)
চার
পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আর সুষম উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা একান্ত জরুরি। তবে শুধু একটি দেশের স্থিতিশীলতা নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও থাকতে হবে। কেননা এক দেশের অশান্তি অন্য দেশকে আক্রান্ত করে। সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বরাবরই সক্রিয় ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিও গভীরভাবে অনুধাবন করতেন, উন্নয়নে শান্তি অপরিহার্য। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে যে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে, তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে হাতে হাতে। বিগত ১৩ বছরের ধারাবাহিক শাসনামলে শেখ হাসিনা সরকার দেশকে উন্নতির শিখরের দিকে নিয়ে চলেছেন। একসময় যা অকল্পনীয় ছিল এ দেশে, তা এখন পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়। স্বাধীনতার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। বতর্মানে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ভাতা চালু, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি—যেমন আশ্রয়ণ প্রকল্প, ঘরে ফেরা, কম্যুনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মতো কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কৃষক ও কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের ফলে দেশ দ্রুত খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে শেখ হাসিনার সরকার বিএনপি-জামায়াত এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে এবং সেই সময়কার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি সুপরিচিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার অর্জনের পাশাপাশি নানা সামাজিক সূচকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করায় বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার, ২০২১ সালে তা ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্য হারের ব্যাপক অগ্রগতি সূচিত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে সে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে এবং অতি দরিদ্রের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাব মতে, ২০১০ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ১০ দশমিক ৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান দিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশের প্রমাণ মেলে তার বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের শেষ বছরে বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকা। শেখ হাসিনা সরকারের ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ১১ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয়। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ করেছে। পদ্মা সেতুর মতো দেশের বৃহত্তম সেতু নিজের টাকায় করে আত্মবিশ্বাস অনেক ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে, পাবনার রূপপুরে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবেলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের জন্য ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামে শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে।
পাঁচ
একসময় প্রবল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের চাপে পিষ্ট হতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটখাটো অভিঘাত এ অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী পিপিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থান ৩০তম। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ২৩তম স্থান দখল করবে। এইচবিএসসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এগিয়ে থাকবে।
ছয়
১০ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে সর্বস্তরের মানুষের। দেশের পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে হয়েছে প্রভূত উন্নয়ন। প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর সেতু দিয়ে গাড়ি করে মানুষ দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে সহজেই। এর ফলে অর্থনীতির প্রসার ঘটছে দ্রুত। বৈদেশিক কোনো সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে দেশের প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পাতালরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চন্দ্রা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পর চন্দ্রা-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশন, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম স্টেশন-রংপুর এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। নতুন রেলপথ নির্মাণ, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংযুক্তি, ই-টিকিটিং এবং নতুন নতুন ট্রেন চালুর ফলে রেলপথ যোগাযোগে নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। দেশের সব জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা হচ্ছে। বিমানবহরে ছয়টি নতুন ড্রিম লাইনার যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সক্ষমতা আরো বেড়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। দেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য রামপাল, মাতারবাড়ী, পায়রা ও মহেশখালীতে মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিশোর ও যুব সম্প্রদায়ের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম এবং অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে। দেশজুড়ে স্থাপিত সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থসেবা আজ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সুযোগ-সুবিধা। খাদ্যশস্য, মাছ এবং মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। চাল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান চতুর্থ এবং মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। সবার জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত প্রতি বছর ২ কোটি ৩ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি, উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী উদযাপনে প্রধানমন্ত্রী দেশের গৃহহীনদের বাসাবাড়ি দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন, কেউ গৃহহীন থাকবে না এবং এরই মধ্যে ১১ লাখের অধিক জনকে বাড়ি দেয়া হয়েছে।
সাত
উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো দেশে স্থিতিশীলতা থাকা। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা শান্তি চাই, যুদ্ধ চাই না। বিশৃঙ্খলা চাই না। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। শান্তির জন্য, উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা চাই। গণতন্ত্রের নামে কথিত হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি, হাঙ্গামা, আন্দোলন মূলত দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে। আন্দোলন করলে করতে হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, শান্তিপূর্ণভাবে। সব রাজনৈতিক দলকে দেশের উন্নয়ন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জ্বালাও-পোড়াও গণতন্ত্রের হাতিয়ার নয়। ইয়েমেন, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া এসব দেশ এখন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির চূড়ান্ত ফল ভোগ করছে। তাদের পুরো অর্থনীতি বলা চলে ভেঙে পড়েছে। মাথাপিছু আয় কমে গেছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বেড়েছে। লাখ লাখ মানুষ বেকার। শিল্পবাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৭ সালে লিবিয়ায় দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর তাদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৬০ ভাগ কমে গেছে। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তাদের প্রায় ৭৮৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে কেবল অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে। আফগানিস্তানের অবস্থাও হয়েছে তাই। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার ফলে লাখ লাখ আফগানি কর্মহারা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার মতো অতিজরুরি পরিষেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আফগানিস্তানে জিডিপির মোটামুটি ৪০ ভাগই বৈদেশিক সাহায্য। কিন্তু তালেবানের ক্ষমতাগ্রহণের পর সব রকম বৈদেশিক সাহায্য-সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশটির সাধারণ মানুষ স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে। ইরাকের ক্ষেত্রেও আমরা একই রকম চিত্র দেখেছি। যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা একসময়ের বিপুল সম্ভাবনাময় ইরাকের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে। আমরা সে অবস্থা কখনো কামনা করি না আমাদের দেশে। এ কারণেই আমরা সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চাই। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলতে চাই। যেকোনো মূল্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। তাহলে খুব সহজেই এক দেশের স্থিতিশীলতার সুফল পাবে পাশের দেশগুলো।
সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রীও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সে কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা আছে বলেই তার ছোঁয়া লেগেছে আসামেও। সম্প্রতি আমি আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তখন মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তার কারণে আমরা নানা দিক থেকে লাভবান হয়েছি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর যেভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, কোনো প্রকারের সন্ত্রাস তিনি সহ্য করবেন না মর্মে যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তা আমাদের মুগ্ধ করেছে।’ তার কারণে বাংলাদশ কখনোই সন্ত্রাসীদের আবাসস্থলে পরিণত হবে না। সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না শেখ হাসিনার দৃঢ় অবস্থানের কারণে। তার এ বক্তব্য ও নীতির কারণে আমরাও লাভবান হয়েছি। এখন বাংলাদেশের মতো আসাম, মেঘালয়েও আর তেমন কোনো সন্ত্রাসী তত্পরতা নেই। আঞ্চলিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। সন্ত্রাসী তত্পরতা না থাকায় বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি এখন আসামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, বিনিয়োগের জন্য আসছে। আগে যেখানে এক-দুটি হাসপতাল ছিল, এখন সেখানে ১৭টি নতুন হাসপাতাল গড়ে উঠছে, তাও আবার বেসরকারি খাতে। অনেক উন্নয়ন হয়েছে এখানে। এজন্য আমরা শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আগে বাংলাদেশ রুট ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা সেখানে হামলা করত, এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা খুব দরকার। এ স্থিতিশীলতা যেন আমরা বজায় রাখতে পারি পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারত, বাংলাদেশ সব জায়গায়, সেটা আমাদের একটি মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কারণ স্থিতিশীলতা থাকলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে না। স্থিতিশীলতা থাকলে শুধু একটি দেশের না, প্রতিবেশী রাষ্ট্রেরও উন্নয়ন হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে বলেই সাম্প্রতিক সময়ে বছরে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ ভারতে সফর করছে, তাতে ভারতের পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগ লাভবান হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ উন্নত হয়েছে বলেই ভারতের অনেক মানুষ বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। স্থিতিশীলতার কারণেই এগুলো সম্ভব হয়েছে। এ কারণেই স্থিতিশীলতাটা জরুরি।
বাংলাদেশ সবসময় স্থিতিশীলতার পক্ষে সোচ্চার ও সরব অবস্থানে রয়েছে। কারণ আমাদের এখানে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির মতো দেশী-বিদেশী নানা চক্র যেমন আছে, তেমনই আছে ১২ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা। রোহিঙ্গা হলো হতাশাগ্রস্ত স্টেটলেস জাতি। তারা যেকোনো সময় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে ফেলতে পারে। দেশের বাইরে থেকে তাদের ইন্ধন দেয়া হতে পারে। আন্তর্জাতিক শক্তিও তাতে জড়িত থাকতে পারে। এর আগে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি বাইরের শত্রুদের ইন্ধনে কী ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। শ্রীলংকায় এক প্রকার লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলেছিল তামিলরা। বিভিন্ন বিদেশী শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে লিবারেশন টাইগার অব তালিম ইলমের সদস্যরা দেশব্যাপী ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। দেশজুড়ে গুপ্ত হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, হামলা-হাঙ্গামা বাধানোই ছিল তাদের কাজ। দেশের অভ্যন্তরে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে তারা শ্রীলংকার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে সে সময়। বর্তমানে যদিও তাদের কার্যক্রম অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে তা বলা যাবে না। আমরা সবসময়ই সোচ্চার আছি তামিলদের মতো রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে কোনো পক্ষ যেন দেশের অভ্যন্তরে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে। আগামীর পৃথিবী হবে এশিয়ার। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠী এশিয়া প্যাসিফিকের দিকে অধিকতর নজর দিচ্ছে। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগ ছাড়াও মার্কিন সরকারের “East Quad”, “West Quad” এবং ১৪টি দেশের সমন্বয়ে Indo Pacific Economic Forum (IPEF) তৈরি হয়েছে। তাছাড়া ASEAN I Colombo Secerity Concave ও তৈরি হয়েছে। ইউরোপিয়ান-চাইনিজ-মার্কিনিরা বহুবিধ উদ্যোগ নিচ্ছে। চাইনিজরা “Global Development Initiative” (GDI) চালু করেছে। এসব বিভিন্ন তত্পরতায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এসবের টিপিং পয়েন্টে রয়েছে। সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে দেখা গেছে, বড় বড় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। ফলে Global Supply Chain and Global Financial Transaction বাধাগ্রস্ত হয়। এসব থেকে মুক্ত থাকার জন্য আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অতিপ্রয়োজন।
বাংলাদেশ কোনো আইসোলেটেড আইল্যান্ড নয়। অন্য দেশে যখন সাধারণ জনগণ নির্যাতিত হয়, বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতবর্ষে, তখন এখানেও তার প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতে উভয় দেশেই কিছু উগ্রপন্থী লোক আছে যারা কখনো কখনো কোনো কোনো বিছিন্ন ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফিফিয়ে তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করে। জনমনে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা বা অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়—এদের থেকে সাবধান। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তা উভয় দেশের করা উচিত বৈকি। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তিনি শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। সুতরাং তাকে কিংবা তার আদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা আমাদের করতে হবে।
আমাদের ভুললে চলবে না ২০০১-০৬ বাংলাদেশে বোমাবাজি ও সন্ত্রাসীর যে তত্পরতা আমরা অবলোকন করেছি, ‘বাংলা ভাই’-এর উত্থান, ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ’ (জেএমজেবি) হরকাতুল জিহাদ ইসলামী বাংলাদেশ (হোজি.বি) ইত্যাদির উত্থান আমরা কি ভুলতে পারি? ২০০১ সালের নির্বাচনের পরপরই হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ্য হয়েছে তা কি ভোলা যায়? একই দিনে দেশের ৬৪ জেলার ৬৩টিতে ৪৯৫টি বোমাবাজি হয়েছিল। ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী সিলেটের মাজারে গেলে তার ওপর বোমাবাজি হয়, তিনি আহত হন এবং দুজন মারা যান। জননন্দিত নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার, সাবেক অর্থমন্ত্রী শামস কিবরিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ ইউনূসকে হত্যা, ফাহিমা-সাবরিনা-মাহিমার ওপর অত্যাচার, এমনকি আদালতের এজলাসে বোমাবাজি এবং সর্বোপরি তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা যখন সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বোমাবাজির বিরুদ্ধে জনসভার আয়োজন করেন, তখন ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে সে শোভাযাত্রায় গ্রেনেড হামলা ও বোমাবাজির ফলে ২৪ সহকর্মী মারা যান, ৩৭০ জন আহত হন। যাদের অনেকেই এখনো জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আমরা শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সেসব অসহনীয় নির্মম ও দুঃস্বপ্নের দিন থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনো সময় সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বাড়িঘর ভাঙার বিছিন্ন ঘটনা ঘটে। এগুলো যাতে আর কখনো না হয়, তার জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। তবে সরকারের হাতকে এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সমর্থন ও সাহায্য। তাহলেই আমরা এসব কলঙ্ক দূর করে একটি শান্তিময় ও স্থিতিশীল দেশ গড়ে তুলতে পারব।
তবে এটাও সত্য, বাংলাদেশের একার পক্ষে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। অন্যান্য দেশের সহযোগিতা ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণ প্রয়োজন। এ কারণেই আমরা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আঞ্চলিক দেশগুলোকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের স্বার্থেই। বাংলাদেশের উন্নয়নে গতি ধারা ও অভাবনীয় অর্জনগুলোকে ধরে রাখতে এবং টেকসই করতে বাংলাদেশসহ প্রতিটি দেশের উন্নয়ন ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
ড. এ কে আব্দুল মোমেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার