প্রতি বছর কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি গবাদিপশু কোরবানি হয়। এ বিপুলসংখ্যক পশুর চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। দেশের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় অর্ধেক আসে শুধু কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। অথচ যে সম্পদ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারত, সেই চামড়া শিল্প আজ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট, অদক্ষ বিপণন ব্যবস্থা, অর্থায়নের সংকট এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। একসময় চামড়া শিল্প ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত। দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো। বাংলাদেশের চামড়ার গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশংসিত ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাপক উত্থান ঘটলেও চামড়া শিল্প একই গতিতে এগোতে পারেনি। বরং নানা সংকটের কারণে শিল্পটি ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে শুরু করে। চামড়ার বাজার নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার এ সম্পদ কোথায় হারিয়ে যায়? কেন কোরবানির পর এতিমখানা, মাদরাসা, মসজিদ কমিটি এবং সাধারণ মানুষ তাদের চামড়ার ন্যায্যমূল্য পায় না? কেন প্রতি বছর একই সংকট ফিরে আসে? কেন সরকার মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য কার্যকর হয় না?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি। কোরবানির পর চামড়া সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়ায় অসংখ্য ফড়িয়া ও দালাল সক্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা—একাধিক হাত ঘুরে চামড়া ট্যানারিতে পৌঁছায়। ফলে প্রকৃত মালিক বা সংগ্রাহক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। একটি চামড়া ট্যানারিতে যে দামে বিক্রি হয়, তার সামান্য অংশ পৌঁছায় এতিমখানা, মাদরাসা বা সাধারণ মানুষের হাতে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য এখন প্রায় নিয়মিত—চামড়া বিক্রি করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মানুষ, কিন্তু ক্রেতা নেই। কোথাও নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, কোথাও আবার চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ফেলে দিতে হচ্ছে। কখনো কখনো চামড়া মাটিচাপা দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অথচ এ চামড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো এ সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হয় এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা। দেশের হাজার হাজার এতিমখানা, হাফিজিয়া মাদরাসা ও কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতি বছর কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করে। বহু প্রতিষ্ঠানের জন্য চামড়ার অর্থ সারা বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা। শিক্ষার্থীদের খাবার, পোশাক, আবাসন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় নির্বাহে এ অর্থ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন চামড়া পানির দামে বিক্রি হয় কিংবা বিক্রিই করা যায় না, তখন মূলত এতিমদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারা কেবল অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও একটি প্রশ্ন।
প্রতি বছর সরকার কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু বাস্তবে সেই মূল্য অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী। অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র ঈদের আগে থেকেই বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল নির্ধারণ করে। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় না। ব্যবসায়ীরা একযোগে কম দামে চামড়া কিনে থাকেন এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। এ সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ বিক্রেতা অসহায় হয়ে পড়ে। চামড়া শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অদক্ষ বিপণন ব্যবস্থা। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে এখনো দেশের অধিকাংশ কাঁচা চামড়া বিক্রি হয় শত বছরের পুরনো পদ্ধতিতে। সরাসরি বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বহু বছর ধরে ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, কেন্দ্রীয় নিলাম ব্যবস্থা কিংবা অনলাইন ট্রেডিং প্লাটফর্ম চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ফলে সংগ্রাহক ও ক্রেতার মধ্যে বহুস্তরীয় মধ্যস্বত্বভোগী সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, দেশের কৃষক যদি মোবাইল ফোনে ধান বিক্রি করতে পারে, একজন উদ্যোক্তা যদি অনলাইনে পণ্য রফতানি করতে পারে, তাহলে চামড়া কেন এখনো পুরনো ও অকার্যকর বিপণন ব্যবস্থার মধ্যে আটকে থাকবে?
চামড়া শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো অর্থায়নের অভাব। কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহের জন্য বড় অংকের মূলধন প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন যে ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়া যায় না। ঋণ প্রক্রিয়া জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বাজারে সক্রিয় হতে পারেন না। বাজার সীমিত কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং মূল্যও নেমে আসে।
ঋণ সংকটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী চামড়া কিনে সংরক্ষণ করার ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে কোরবানির পর বিপুল পরিমাণ চামড়া দ্রুত বিক্রির চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতির সুযোগ নেয় সিন্ডিকেট। চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ট্যানারি শিল্পের ভবিষ্যৎও। রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আশা করা হয়েছিল, এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে উঠবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণে অনেক বিদেশী ক্রেতা এখনো আস্থা ফিরে পাননি।
বিশ্ববাজারে এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো পরিবেশগত মানদণ্ডকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্প যদি এ মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে রফতানি বাজার আরো সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা যে কত বড়, তা বিশ্ববাজারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বৈশ্বিক চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারের আকার শত শত বিলিয়ন ডলার। জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, গ্লাভস, জ্যাকেট ও ফ্যাশন পণ্যের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাংলাদেশের কাছে রয়েছে পর্যাপ্ত কাঁচামাল, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়। এ সুবিধাগুলো কাজে লাগানো গেলে চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখনো কাঁচা চামড়া নিয়ে বেশি ব্যস্ত, চামড়াজাত পণ্য নিয়ে নয়। অথচ প্রকৃত মূল্য সংযোজন হয় জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে। একটি কাঁচা চামড়ার তুলনায় প্রক্রিয়াজাত ও ব্র্যান্ডেড পণ্যের মূল্য কয়েকগুণ বেশি। তাই কাঁচামাল রফতানির পরিবর্তে মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
সমাধানের পথও অজানা নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা।
প্রথমত, কোরবানির চামড়া সংগ্রহ ও বিক্রির জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি ডিজিটাল বিপণন প্লাটফর্ম চালু করতে হবে। যেখানে মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও সাধারণ মানুষ সরাসরি নিবন্ধন করে চামড়া বিক্রির সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয়ত, চামড়া ক্রয়ের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, চামড়া বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজি দমনে কঠোর নজরদারি এবং আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বা বেসরকারি সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যাতে বিক্রেতারা কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য না হন।
পঞ্চমত, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে এবং পরিবেশগত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্র্যান্ড উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। প্রতি বছর কোরবানির ঈদে যে বিপুল সম্পদ আমাদের হাতে আসে, তা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারলে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং এতিম ও দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে।
চামড়া কোনো বর্জ্য নয়; এটি একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। সেই সম্পদকে অবহেলা, অদক্ষতা ও সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেয়া মানে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে অপচয় করা। তাই এবার প্রয়োজন সাময়িক উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কার। কারণ চামড়া শিল্পের পুনর্জাগরণ শুধু একটি শিল্পের পুনরুদ্ধার নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, রফতানি সম্প্রসারণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ড. মোহা. হাছানাত আলী: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়