সময়ের ভাবনা

সব শঙ্কা কাটিয়ে আমন উৎপাদনে স্বস্তি

সারা বিশ্ব বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে করোনা মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়েছে বিশ্বের খাদ্য পরিস্থিতি। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনগুলো কেমন কঠিন হবে তা সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে

সারা বিশ্ব বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে করোনা মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়েছে বিশ্বের খাদ্য পরিস্থিতি। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনগুলো কেমন কঠিন হবে তা সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে জনসংখ্যা ঘনত্ব প্রায় ১ হাজার ২০০ তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের প্রায় সব উপকরণই বিদেশনির্ভর। এমন অবস্থায় খাদ্য উৎপাদনের বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে একটাই লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, তা যেভাবেই হোক। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে। এজন্য এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না।’ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সব দপ্তর ও সংস্থার সমন্বয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

অকাল বন্যা ও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এ বছর বোরো এবং আউশের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে, এতে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে কিছুটা অস্বস্তি কাজ করছে। সে সঙ্গে বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় এ অস্বস্তি আরো প্রকট হয়েছে। এ অস্বস্তি দূর করার জন্য আমনের উৎপাদন বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই ধানের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৫৯ লাখ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৬১ লাখ টন নির্ধারণ করে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সব উপকরণ—বীজ, সার, কীটনাশক ও সম্পূরক সেচ প্রদান, সঠিক সময়ে সঠিক বয়সের চারা রোপণ ও যথাসময়ে কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।

আমন মৌসুমের শুরুতেই অপ্রতুল ও অসম বৃষ্টিপাতের কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় একটি ধাক্কা আসে যার কারণে সময়মতো বীজ বপন ও চারা রোপণ কিছুটা ব্যাহত হয়। ফলে কৃষক ও জনমনে আশঙ্কা সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে আমন উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুততম সময়ে সেচ পাম্প ও সেচ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কৃষিমন্ত্রী কেবিনেট সভায় সেচের জন্য ১৫ দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চান। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদের সব সদস্য বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেন এবং প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সব সেচ পাম্প ও সেচ প্রকল্পগুলো চালুকরণের মাধ্যমে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা হয়। দ্রুত এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত কম হলেও সেচপাম্প দিয়ে প্রয়োজনমাফিক সেচ দিয়ে যথাসময়ে আমন চাষ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক হওয়ায় আমন চাষাবাদে আর কোনো সমস্যা হয়নি।

ফলে সারা দেশে এ বছর আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। এ বাম্পার ফলনের কারণ খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেক বিষয়ের প্রভাব লক্ষ করেছি। প্রথমত, আবহাওয়ার প্রভাব। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আমনের ভালো ফলনের জন্য পরিষ্কার সূর্যালোক, অধিক সৌর বিকিরণ, অধিক গড় তাপমাত্রা, কম আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং মেঘমুক্ত আকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধানের অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়, প্রজনন এবং সমগ্র জীবত্কালে যথাক্রমে মোট ৬০৯, ৪০১ এবং ১০১০ ঘণ্টা সূর্যালোক প্রয়োজন। চলতি আমন মৌসুমে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে ৬১০ ঘণ্টা, প্রজনন পর্যায়ে ৪২৫ এবং সমগ্র জীবত্কালে ১ হাজার ১২ ঘণ্টা ছিল। এছাড়া আবহাওয়ার রেকর্ড থেকে দেখা যায়, আমন ২০২২ মৌসুমে সূর্যালোক ছাড়াও সৌর বিকিরণ ও গড় তাপমাত্রা বেশি, আপেক্ষিক আর্দ্রতা কম এবং মেঘমুক্ত আকাশ থাকায় ফলন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এছাড়াও কুশি গঠনের জন্য সর্বোত্তম গড় তাপমাত্রা হলো ২৫-৩১ সে.। চলতি আমন মৌসুমে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৬৬ সে.। তাই অসম বৃষ্টিপাতের দরুন ধানের বপন ও রোপণ ১০-১৫ দিন বিলম্ব হলেও অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে (জুলাই-আগস্ট) তাপমাত্রাসহ অন্যান্য উপাদানগুলো অনুকূল থাকায় গাছের সার ব্যবহার দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়, যা গাছের সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে গাছের অঙ্গজ বৃদ্ধি ত্বরান্বিত এবং কুশির সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে প্রজনন পর্যায়ে সর্বোত্তম গড় তাপমাত্রা ২৫-২৮ শূন্য সে.। চলতি আমন মৌসুমে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ৫৫ শূন্য সে. যা প্রজনন পর্যায়ে ফুল ফোটার জন্য সর্বোত্তম। প্রজনন পর্যায়ে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, মোট সূর্যালোক ও সৌর বিকিরণ ফলন বৃদ্ধির অত্যন্ত সহায়ক হওয়ায় ফুল ফোটা, পরাগায়ণ ও গর্ভাধানে পজিটিভ প্রভাব ফেলে, যা চিটার পরিমাণ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

ধানের পরিপক্ব পর্যায়ে (অক্টোবর-নভেম্বর) দানা গঠন প্রক্রিয়ার সময় অধিক সৌর-বিকিরণ ও সূর্যকিরণকাল, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা ধীরে ধীরে কমে আসায় (২৮-২৫ শূন্য সে.) ধানের শীষে বিদ্যমান দানায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উত্পন্ন কার্বোহাইড্রেট সরাসরি সরবরাহ করে, যা ধানের প্রতিটি শীষে পুষ্ট দানার সংখ্যা বৃদ্ধি করে ফলনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ বছর পরিপক্ব পর্যায়ে তাপমাত্রা ২৭-২৪ সে. থাকায় অধিক ফলনে ভূমিকা রেখেছে।

গত পাঁচ বছরের (২০১৭-২১) আমন মৌসুমের আবহাওয়ার উপাদানগুলো (সূর্যালোক, সৌর বিকিরণ, তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং মেঘমুক্ত আকাশ) এবং ফলনের ওপর এদের প্রভাবের গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমনের ফলন প্রাক্কলন করে দেখা যায়, ২০২২ সালে আমনের ফলন হবে হেক্টরপ্রতি ২ দশমিক ৭৬ টন, যা বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। সে হিসাবে এ বছর আমনে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টন চাল উৎপাদন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধির দ্বিতীয় কারণ বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় অনেক নিচু জমি আমন চাষের আওতায় এসেছে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ফলন হয়েছে। অন্যান্য বছর এসব জমিতে ধান রোপণ সম্ভব হয় না। অনেক সময় রোপণ করা গেলেও উপর্যুপরি বন্যায় ফসল নষ্ট হয় এবং কিছু টিকে থাকলেও পোকামাকড়ের আক্রমণে ফলন অনেক কমে যায়।

এ আমন উত্তোলনের পর দেশে সারা বছরে খাদ্য পরিস্থিতি কেমন হবে? আমাদের হিসাবে আগামী জুন পর্যন্ত আউশ (৩ দশমিক শূন্য টন), আমন (১৬ দশমিক ৩ টন) ও বোরোর (২০ দশমিক ৪ টন) মোট উৎপাদন হবে ৩৯ দশমিক ৭ টন। প্রতিদিন জনপ্রতি ৪০৫ গ্রাম করে চালের হিসাব করলে ১৭ কোটি মানুষের জন্য চালের প্রয়োজন হবে ২৫ দশমিক ১৩ টন। অন্যান্য চাহিদা ২৬ দশমিক ১২ শতাংশ হিসাব করে চালের প্রয়োজন ১০ দশমিক ৩৭ টন। সে হিসাবে উদ্ধৃত্ত থাকবে ৪ দশমিক ২ টন বা ৪২ লাখ টন। এ হিসাবে যত ত্রুটিই আমরা বিবেচনায় নিই না কেন আগামী জুন পর্যন্ত দেশে চালের কোনো সংকট হবে না। শুধু প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করা। সাপ্লাই চেইন যাতে কোনো অবস্থাতেই বিঘ্নিত না হয় সে দিকে লক্ষ রাখা। সেজন্য সবাইকে সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে হবে। তাহলেই দেশের খাদ্য পরিস্থিতিতে বিশেষ করে চালে একটি স্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করবে।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর: মহাপরিচালক,

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)

 

আরও