আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূরণ করব আগামী মার্চে। কেমন আছি আমরা? কতটুকু এগিয়েছি। জাতি হিসেবে? দেশ হিসেবে? রাষ্ট্র হিসেবে? সমাজ হিসেবে? মানুষ হিসেবে? ব্যক্তি হিসেবে?
অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে আমরা এগিয়েছি। জিডিপি বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বাজেট বেড়েছে। রিজার্ভ বেড়েছে। ভৌত অবকাঠামোর অনেক উন্নতি হয়েছে। দালানকোঠা বেড়েছে। গাড়ি বেড়েছে। অনেক লোক—কমপক্ষে এক কোটি—প্রবাসে থাকে। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। হাসপাতাল বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে। মেডিকেল কলেজ বেড়েছে। ব্যাংক বেড়েছে। ব্যাংকের আমানত আর ঋণ বেড়েছে। বীমা কোম্পানি বেড়েছে। শেয়ার মার্কেট বড় হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমেছে। গড় বয়সসীমা বেড়েছে।
কিন্তু মানুষ কি ভালো আছে, সুখে আছে? অন্যভাবে বললে, ওপরের এ মাপকাঠিগুলো কি পরিপূর্ণ? এর অনেকগুলোর ক্ষেত্রে দেশের মানুষকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। একটি মানুষের তো মন আছে, মর্যাদা আছে। মাস্লোর তত্ত্ব অনুসারে, মানুষের শারীরিক চাহিদা যত মিটবে তত মানসিক চাহিদা বাড়বে। সে ভালোভাবে বাঁচতে চাইবে। চারপাশের পরিবেশ ভালো চাইবে। অন্যের কাছে সম্মান আশা করবে, স্বীকৃতি চাইবে। নিজের মত প্রকাশ করতে চাইবে। আত্মার খোরাক মেটাতে চাইবে। এর কিছুই কি এসব মাপকাঠিতে উঠে আসে? অথবা জিডিপিতে বিবেচিত পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে পরিবেশের কী ক্ষতি হয়েছে, স্বাস্থ্যের কী হানি হয়েছে, সেটা তো গণনা করা হয়নি। আয় বা সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে কিনা, তা বিবেচনা করা হয়নি। মুষ্টিমেয় কিছু লোক প্রচুর সম্পদ কুক্ষিগত করে জিডিপি বা গড় আয় বাড়িয়ে দিতে পারে। আপাত চোখে আমরা তৃপ্তি পেতে পারি, জাতীয় আয় বেড়েছে কিন্তু বৈষম্য তো ক্ষতিকর। ১৯৬৮ সালে রবার্ট কেনেডি তার নির্বাচনী বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘এটি (জিডিপি) সংক্ষেপে সবকিছুই ধারণ করে, শুধু সেগুলো ব্যতীত, যেগুলো আমাদের জীবনের জন্য অর্থবহুল।’
জাতিসংঘ হিউম্যান ইনডেক্স চালু করেছে, যাতে আর্থিক ছাড়াও স্বাস্থ্য ও জ্ঞানকে বিবেচনায় নেয়া হয়। আমরা প্রাচ্যের দিকে তাকালে অর্থ ছাড়াও আরো মাপকাঠি দেখতে পাব। যেমন ভুটান তাদের অগ্রগতি পরিমাপ করে জিএনএইচ দিয়ে। জিএনএইচ অর্থ গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস। একটি প্রশ্ন আসতে পারে, কীভাবে সুখ মাপব? সুখের সংজ্ঞা কী? সুখ তো আপেক্ষিক ব্যাপার ইত্যাদি। কিন্তু আমরা যে জিডিপি মাপি, তা কতটুকু সঠিক? সব আয় কি ধরা হয়, না ধরা যায়? কোনো কোনো আয় যে দুবার ধরা হয় না, তার নিশ্চয়তা কী? ভুটান জিএনএইচের চারটি স্তম্ভ ধরেছে—সুশাসন, টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও প্রসার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। বস্তুজগতের সঙ্গে অবস্তুগত উন্নয়ন ও অবস্তুগত বিষয়ের বিভিন্ন আঙ্গিক ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জিএনএইচে প্রতিফলিত হয়, যা জিডিপিতে ফুটে ওঠে না। চারটি স্তম্ভ আবার নয়টি ক্ষেত্রে বিভাজন করা হয়েছে। যেমন জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অঞ্চলে সামাজিক প্রাণচাঞ্চল্য, সময়ের ব্যবহার, মানসিক সুস্বাস্থ্য, সুশাসন, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও প্রসার। এই নয়টি ক্ষেত্রের জন্য ৩৮টি উপধারা, ৭২টি সূচক ও ১৫১টি নিয়ামক নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোনো প্রকল্প অনুমতি দেয়ার আগে যাচাই-বাছাই করার জন্য যে মাপকাঠি ব্যবহার করা হয়, সেটাও জিএনএইচের ভিত্তিতে। ভুটানে জিএনএইচ কমিশন আছে, যাদের কাজ মোট জাতীয় সুখের সব নীতি প্রণয়ন ও তদারকি করা। ভুটানে সব নীতি ও প্রকল্প অনুমোদনের আগে জিএনএইচের দৃষ্টিতে দেখা হয়। প্রতিটা ইনডেক্স চারের স্কেলে গণনা করা হয়। সর্বনিম্ন ১ ও সর্বোচ্চ ৪। প্রতিটি ইনডেক্স জনগণের চোখ দিয়ে যাচাই করা হয়। যেমন সাম্যর ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর চেয়ে উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীদের অনুকূলে গেলে ১ পয়েন্ট ও উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর চেয়ে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীকে আনুকূল্য দেখালে ৪ পয়েন্ট দিতে হবে। কোনো গোষ্ঠীর ওপর প্রভাব পড়বে কিনা, জানি না বললে ২ পয়েন্ট ও তাত্পর্যপুর্ণ কোনো প্রভাব নেই বললে ৩ পয়েন্ট দিতে হবে।
ভুটানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সদস্য হবে কিনা, তার জন্য ২৩টি নিয়ামক ধরা হয়েছে। যেমন আর্থিক নিরাপত্তা, সাম্য, উৎপাদনশীলতা, জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিক, সামাজিক সহযোগিতা, পরিবার, সহযোগিতা, শিক্ষাগ্রহণ, বিনোদন, বস্তুগত সম্পদ, স্বাস্থ্য, মানসিক চাপ, তথ্যে প্রবেশাধিকার, সংস্কৃতি, দুর্নীতি, ব্যক্তির অধিকার, বৈষম্য, কার্যকর বিচার, বিচার পাওয়ার সমান সুযোগ, মূল্যবোধ, অংশগ্রহণ, দূষণ ইত্যাদি।
শিক্ষার একটি প্রকল্পের মাপকাঠিগুলো জাতীয় কর্মসংস্থান, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, পারিবারিক বন্ধন, ছাত্রের পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক বোঝা, শিক্ষার মান, সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা, পাঠদানের মান, পাঠ্যসূচির মান, ছাত্র ভর্তির হার, অপ্রথাগত বিদ্যালয়ে ভর্তির হার, অনিয়মিত পাঠগ্রহণ, আয়বৈষম্য, লিঙ্গসমতা, পিতা-মাতার সম্পৃক্ততা, প্রণোদনা, ছাত্রদের দক্ষতা, বিজ্ঞানে দক্ষতা, অংকে দক্ষতা, পাঠদান পদ্ধতি, জাতীয় পাঠ্যসূচি, জীবন ঘনিষ্ঠতা, স্থানীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার, স্থানীয় জ্ঞান, আত্মানুসন্ধান, সুখের মূল্যায়ন, ধ্যান, যূথবদ্ধ জীবন, ধৈর্য, সহনশীলতা, উদারতা, দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা লোকগাথা, উৎসব সম্পর্কে জ্ঞান, পরিবেশ জ্ঞান, প্রজনন জ্ঞান, পুষ্টি জ্ঞান, গৃহ নির্মাণ, তাঁত, বাঁশের কাজ, কৃষি জ্ঞান, আইটি জ্ঞান, মিডিয়া সম্পর্কে জ্ঞান ইত্যাদি।
মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ‘উদারতা, ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব কমিয়ে দিলে’ ১ পয়েন্ট ও জোরদার করলে ৪ পয়েন্ট। প্রকল্পটি সরকারের মধ্যে দুর্নীতি করার সুযোগ বাড়িয়ে দিলে ১ পয়েন্ট ও কমিয়ে দিলে ৪ পয়েন্ট। বৈষম্যের জন্য ‘ধর্ম, গোত্র ও জাতের ভিত্তিতে বৈষম্য বাড়িয়ে দিলে ১ পয়েন্ট ও কমিয়ে দিলে ৪ পয়েন্ট। অধিকারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করলে ১ পয়েন্ট ও সমুন্নত করলে ৪ পয়েন্ট। মানসিক চাপের ক্ষেত্রে ‘অধিকাংশ মানুষের মানসিক চাপ বাড়ালে ১ পয়েন্ট ও কমালে ৪ পয়েন্ট। সরকারের বিভিন্ন তথ্যপ্রাপ্ত লোকের সংখ্যা কমলে ১ পয়েন্ট ও বাড়লে ৪ পয়েন্ট। লোকজন বিনোদনে ব্যয় করার মতো সময় কমলে ১ পয়েন্ট ও বাড়লে ৪ পয়েন্ট। আধ্যাত্মিক কাজে সময় ব্যয় করার সুযোগ কমলে ১ পয়েন্ট ও বাড়লে ৪ পয়েন্ট বরাদ্দ হবে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য ও বৈচিত্র্য কমলে ১ পয়েন্ট ও বাড়লে ৪ পয়েন্ট।
অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্তে জনগণের সমানভাবে অংশগ্রহণ কমে গেলে ১ পয়েন্ট ও সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়ে গেলে ৪ পয়েন্ট দিতে হবে। ৩ ধরা হয় নিরপেক্ষ। কোনো নীতি বা প্রকল্প যাচাইয়ের জন্য যতগুলো সূচক ব্যবহূত হবে, ততগুলোর সমপরিমাণ নিরপেক্ষ মানকে ধরা হয় একটি নীতি বা প্রকল্পের জন্য সর্বনিম্ন উত্তীর্ণ মান। অর্থাৎ একটা প্রকল্প বা নীতি যাচাই করার জন্য যদি ২৩টি সূচক ব্যবহার করা হয়, তবে প্রকল্পটি কমপক্ষে ২৩–৩=৬৯ নম্বর না পেলে উত্তীর্ণ হবে না।
ভুটান একটি পরিবেশবান্ধব সবুজ দেশ। দুর্নীতিতে ভুটানের র্যাংক ২৪ এবং স্কোর ৬৮ (১০০-তে), যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম। মালদ্বীপের ৪৩, ভারতের ৪০ আর বাংলাদেশের স্কোর ২৬।
শওকত হোসেন: অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ; ম্যানেজিং পার্টনার, ভেলোসিটি এশিয়া; পরিচালক, লাইট ক্যাসল পাটনার্স