(গতকালের পর)
এখন প্রশ্ন হলো এ ইকুয়েশন তো ঐতিহাসিকভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই আমি যে ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড বললাম, তার থেকে এটাই হওয়ার কথা এবং সেটাই হয়েছে। সেখানে আমাদের পক্ষে এসে সমাজতান্ত্রিক শিবির দাঁড়াবে এবং কীভাবে তারা দাঁড়াল সেটা আমি এখানে আরেকটু বর্ণনা করতে চাই।
প্রথমত আমাদের এখানে যখন ২৫ মার্চের পর গণহত্যা শুরু হলো, তখন সেটার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এটা কি একটা গণহত্যা, এটা কি একটা মুক্তিযুদ্ধ, নাকি এটা একটা অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ—পাকিস্তান ও তার মিত্ররা এ প্রশ্ন তুলে পানি ঘোলা করতে চেয়েছিল। সেজন্য ‘গৃহযুদ্ধ’ না ‘মুক্তিযুদ্ধ’—এ প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। শেখ মুজিবুর রহমান এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলে আগেই তিনি কখনো সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। যদিও বহু আগে থেকে স্বাধীনতাই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি শর্ত দিয়ে ৭ মার্চের বক্তৃতা দিয়েছিলেন। যদি এটি হয়, যদি তোমরা এটা করো ইত্যাদি তখন আমরা বাধ্য হব স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে, বাধ্য হব মুক্তিযুদ্ধ করতে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। ভালো করে দেখলে দেখা যাবে এমনকি বক্তৃতায়ও এভাবেই কথাটা আছে। তোমরা যদি আমাদের গুলি করো, তাহলে তোমরা শান্তিতে থাকতে পারবে না। সুতরাং এটা একটি খুবই চমত্কার ডিপ্লোমেটিক বক্তৃতা। যেটার কারণে আমরা বলতে সক্ষম হয়েছি যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে—শান্তিপূর্ণ মীমাংসার রাস্তা তারা রাখেনি। গণতন্ত্র লঙ্ঘন এবং অন্যায়টা যে তাদেরই হয়েছিল, সেই প্রচারের সুবিধাটা আমরা প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেয়েছিলাম।
মার্চে যে হামলা হলো, গণহত্যা শুরু হলো তখন কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল দলগুলো সব ভারতে চলে গেল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যরা যশোর হয়ে দিল্লি চলে গেলেন। অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই ধীরে ধীরে চলে এলেন কলকাতা হয়ে দিল্লি। সুতরাং দিল্লিতে প্রথম সিদ্ধান্ত হলো যে তদানীন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় ও সমর্থন দেবেন।
সুতরাং তখন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম চেষ্টা করল আন্তর্জাতিকভাবে কমিউনিস্ট দেশগুলো যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকে। সেজন্য ১৯৭১ সালের মে মাসে সিপিবি সব কমিউনিস্ট দেশে একটা চিঠি পাঠায়। আবার ওই সময় ভারতের সিপিআই (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া), তারা খুব ঘনিষ্ঠভাবে সিপিবিকে সাহায্য করে। ভারতীয় কমিউনিস্টদের মধ্যে কিছু নেতা ছিলেন যাদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আবার কেন্দ্রীয় দিল্লি প্রশাসনেও সোভিয়েতের ও ইন্দিরা উভয়ের বন্ধুস্থানীয়রা ছিলেন। যেমন ডিপি ধর এবং এদের মাধ্যমেই সব মিলিয়ে কমিউনিস্ট দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের যোগাযোগ হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যতম প্রথম দিকের দেশ, যারা গণহত্যা বন্ধ করার বিবৃতি দিয়েছিল। তারপর যখন জাতিসংঘে চীন ও আমেরিকা এটা একটা অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে প্রস্তাব দিল, তখন একাধিকবার সেটার বিপক্ষে ভেটো দিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সুতরাং আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেল, এরা এক পক্ষ, ওরা আরেক পক্ষ।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের জন্য ‘ম্যাটেরিয়াল’ সাহায্যের প্রয়োজন আসে। যুদ্ধ করতে হলে তো অস্ত্র লাগবে, রসদ লাগবে, সেটা কোথা থেকে পাওয়া যাবে? তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্ত্র ভারতকে দেয়া হতো এবং ভারত তখন সেগুলো আমাদের গেরিলা ও গণবাহিনীকে দিত। অন্যদিকে আমেরিকা ও চীন অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করত পাকিস্তানকে। বিশেষ করে সিপিবি-ন্যাপ- ছাত্র ইউনিয়নের যে বিশেষ গেরিলা বাহিনী ছিল, তাদের কতগুলো বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হয়। সেই বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে তারা স্পেশালি ট্রেইনড হয়। তাদের সঙ্গেও সোভিয়েত অস্ত্রপাতি কিছু জোগান ছিল। এটা তখন গোপন ব্যাপার। তবে আমার যতটা জানা আছে কিছু কিছু অস্ত্র সেখানেও এসেছে। যদিও সেটা হয়তো ভারতীয় বাহিনী হয়েই আসত।
যখন বিশ্বব্যাপী এ রকম একটা ব্যাপার স্বীকৃত হয়ে গেল যে, আচ্ছা এটা একটা ন্যায্য মুক্তিযুদ্ধ তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে সমর্থন করে, যেভাবে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন ঔপনিবেশিক দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধকে তারা সাহায্য-সহযোগিতা করে সেই একই ধারায় বাংলাদেশকেও তারা সহায়তা দেয়া শুরু করল। কিন্তু চীন প্রথম থেকেই পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। চীনের তো ভারতের সঙ্গে আগে থেকেই যুদ্ধংদেহী সম্পর্ক ছিল। ষাটের দশক থেকেই ভারতের সঙ্গে চীনের যুদ্ধ হয়। এদিক থেকে চীন আরো বেশি ভয় পেয়ে যায়। চীন ভাবে, যদি বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে বাংলাদেশ আর ভারত একত্র হয়ে যাবে এবং পাকিস্তান তখন আরো ছোট ও দুর্বল হয়ে যাবে। সুতরাং চীন তখন ভারতের কাছে মিত্রবিহীন হয়ে আরেকটু দুর্বল হয়ে যাবে। এ ক্যালকুলেশন থেকে চীন আরো সতর্ক হয়ে চাচ্ছিল না যে বাংলাদেশ স্বাধীন হোক।
এছাড়া এখানকার যারা চীনপন্থী কমিউনিস্ট বা অনুসারী ছিলেন, তারা তখন অদ্ভুত থিসিস দিয়েছিলেন। সেটা হলো বাংলাদেশে একটা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে না—এখানে দুই ‘কুকুরের’ লড়াই হচ্ছে। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধারা একটা ‘কুকুর’ এবং পাকিস্তানিরা আরেকটা ‘কুকুর’। দুই ‘কুকুরে’ লড়াই হচ্ছে এবং আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের ‘কুকুরকে’ জিততে দিই, তাহলে তারা এটাকে সিকিম, ভুটান বা তিব্বতের মতো ভারতের একটি করদ রাজ্যে পরিণত করবে। তার চেয়ে আমরা দুই কুকুরের বিরুদ্ধে লড়ব। তবে তাদের মধ্যে খুব ছোট একটি অংশ, মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শিবপুরের একটি অংশ ছিল—তারা বলেছিল, ঠিক আছে এটা দুই কুকুরের লড়াই নয়। এটা একটি স্বাধীনতা যুদ্ধ। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করব না। আমরা একটি স্বতন্ত্র কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনী করে আমরা একই সঙ্গে স্বাধীনতাও আনব, আবার জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবও করব। অর্থাৎ চীনে যেমন জাপানি সাম্রাজ্যবাদকে তাড়িয়ে একবারে বিপ্লব করে সমাজতন্ত্র করেছে, আমরাও তাই করব। এবং এটা করার জন্য আমাদের দরকার হবে স্বাধীনতা যুদ্ধটা যাতে প্রলম্বিত বা দীর্ঘায়িত হয়। আমরা যেন ভারতে আশ্রয় না নিয়ে দেশের ভেতরে থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে পারি। তবে তাদের একটি বড় অংশ ‘দুই কুকুরের লাইনই’ অনুসরণ করেছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি, অন্ধ মুজিব-বিরোধিতার লাইন অনুসরণ করেছে। অবশ্য কেউ কেউ পরে নিজের ভুল স্বীকার করে লিখিতভাবে আত্মসমালোচনাও করেছেন।
অন্যদিকে মূলধারার বামপন্থী যেমন ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন এভাবে চিন্তা করেনি। তারা বলেছিল, বামপন্থীদের পাল্টা বাহিনী করাটা বিভেদাত্মক হবে। এটা হলো জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং এখানে বামপন্থী আর দক্ষিণপন্থী ভাগ করে আওয়ামী লীগ আর বামপন্থীদের পরস্পরবিরোধী করার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে এখনকার জাতীয় নেতৃত্ব তাজউদ্দীন আহমদ বামপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। যদিও তার দলের মধ্যে মোশতাকপন্থী, সাম্রাজ্যবাদপন্থী লোকজন আছে, কিন্তু থাকলেও সেটা প্রধান বিষয় না। সুতরাং আমরা যদি তাজউদ্দীন আহমদসহ একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করতে পারি তাহলে জাতীয়ভাবেই মুক্তিযুদ্ধ চালানো সম্ভব। সেটা কিন্তু গঠিত হয়েছিলও। সেখানে মওলানা ভাসানীও যোগ দিয়েছিলেন। মণি সিংহ ছিলেন, মোজাফফর আহমেদ ছিলেন, কংগ্রেসের একজন প্রতিনিধি ছিলেন, অবশ্য আওয়ামী লীগই সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এ উপদেষ্টা পরিষদের নেতৃত্বে জাতীয়ভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। তবে যেহেতু বামপন্থীরা আলাদা পরিচয়ের অধিকারী, সুতরাং তাদের প্রশিক্ষণটা আলাদা হবে এবং মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণটাও আলাদা হবে। কোনো কোনো জায়গায় মুজিব বাহিনীর সঙ্গে বামপন্থীদের খণ্ড যুদ্ধও হয়েছে। তবে যেভাবেই হোক না কেন, ঐক্য রক্ষা করে তারা উভয় পক্ষই অগ্রসর হতে চেষ্টা করেছিল। এবং চেষ্টা করেছে যাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত উভয়ই সমর্থন দেয়।
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে কোচিনে সিপিআইয়ের একটি কংগ্রেস হয়। সেই কংগ্রেসে পুরো দুনিয়ার কমিউনিস্টরা আসে। সেখানে বাংলাদেশ ও সোভিয়েতের প্রতিনিধিও ছিল। সেখানেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রস্তাব নেয়া হয়। এভাবে কমিউনিস্ট বিশ্বকে আমরা আমাদের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করি।
আবার উল্টো দিকে আওয়ামী লীগের ভেতরে খন্দকার মোশতাক চেষ্টা করেছিল আমেরিকাকে বুঝিয়ে পাকিস্তানকে ঢিলেঢালা কনফেডারেশনের পক্ষে রাজি করাতে। এমনিতেই তো দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে, অন্তত পাকিস্তান আর বাংলাদেশ মিলে একটি কনফেডারেশন হোক এটাই ছিল চীন ও আমেরিকার শেষ চেষ্টা। সেজন্য জাতিসংঘে চীন ও আমেরিকা শেষ মুহূর্তে ১৩ ডিসেম্বর যুদ্ধের ‘সিজফায়ার’ প্রস্তাব ওঠায়। আবারো সোভিয়েত রাশিয়া ভেটো দেয়।
সুতরাং অভ্যন্তরের মেরুকরণ হচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবেও মেরুকরণ হচ্ছিল। এভাবে দেশটি স্বাধীনতার দিকে যত এগোতে থাকে, তখন শক্তিগুলোও ভাবতে থাকে যে সামনে কী হবে? স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে? বাংলাদেশ কি সমাজতন্ত্রের দিকে যাবে নাকি ধনতন্ত্রের দিকে যাবে? এখানে একটা অন্যতম ‘ফ্যাক্টর’ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কি বেঁচে থাকবেন, তিনি কি আসবেন, তিনি এসে কোন দিকে যাবেন? তিনি কি ভারতের সঙ্গে মিত্রতা করবেন, তিনি কি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, তিনি কি চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, তিনি কি ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, কিংবা তিনি আসলে কী করবেন?
অবশ্য ইতিহাস কখনো কারো জন্য বসে থাকে না। এসব যাবতীয় প্রশ্ন মীমাংসা হয়ে যাচ্ছিল বাস্তব ঘাত-প্রতিঘাত ও ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাস্তব ঘাত-প্রতিঘাত বা ঘটনা তো কে কোন পক্ষের সেটা বিবেচনা করে হচ্ছিল না। সেটা যুদ্ধের লজিকে হচ্ছিল। যুদ্ধের লজিক যেটা ছিল তা হচ্ছে তখন দেশ প্রায় স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। মানে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারছিল যে জনগণ যদি সঙ্গে না থাকে, ভাত ও পানি যদি সরবরাহ না হয় এবং কোনো সৈনিককে একা পেলেই লোক যদি তাকে মেরে ফেলে, তাহলে ওই দেশে তো আর থাকা সম্ভব নয়। ওরা যেমন দুঃখ করে বলত, ‘যাব আওয়াম আপকো সাত নেহি রাহেগা তাব...’। আওয়াম মানে জনগণ। যখন আপনার সঙ্গে জনগণ থাকবে না, তখন দখলদার বাহিনী আর বেশিদিন সেখানে থাকতে পারবে না। তবে একটি মুষ্টিমেয় অংশ সক্রিয় রাজাকার বা আলবদর বাহিনীর সদস্য হয়ে বিরোধিতা চালিয়ে গিয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে নাম লিখিয়েছিল পেটের দায়ে এবং তারা কেউ কেউ নিজ বাহিনীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও করেছে।
সব মিলিয়ে হানাদার বাহিনীর কমান্ডাররা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা তখন যুদ্ধবিরতি সম্ভব না হলে বৃহৎ শক্তির বহিঃহস্তক্ষেপ প্রার্থনা শুরু করে। তারা চায় আমেরিকা এখানে হস্তক্ষেপ করুক। আমেরিকা এখানে সপ্তম নৌবহর পাঠাক। তারা চায় চীন ভারতকে আক্রমণ করুক। চীন যদি ভারতকে আক্রমণ করে তাহলে ভারতের যোদ্ধারা দুই ভাগ হয়ে দুদিকে ব্যস্ত হয়ে যাবে। তখন পূর্বভাগে গেরিলা যোদ্ধাদের ভারত খুব বেশি সহায়তা করতে পারবে না। ভারতের ওপর দুটি যুদ্ধের চাপ একসঙ্গে পড়লে, অর্থনীতির ওপর চাপ বৃদ্ধি পেলে ওখানকার জনগণও চাপে পড়বে। তখন তারা বাংলাদেশকে আর আশ্রয় দিতে পারবে না এবং কোটি লোককে খাওয়াতেও পারবে না। সুতরাং তাদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে ওঠে। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রতিবারই ভেটো দিতে থাকে। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে তখন একটা ‘ইন্টারেস্টিং হিস্টোরিক’ শান্তি-মৈত্রী-বন্ধুত্ব চুক্তি হয় ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের।
এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক অনুকূল উপাদান বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওই চুক্তিতে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোষণা করে, ‘আমরা দুটো দেশ বন্ধু এবং আমরা যদি তৃতীয় বা বাইরের দেশ দ্বারা আক্রান্ত হই, তাহলে ধরে নিতে হবে অন্যজনও আক্রান্ত হয়েছে। সুতরাং তখন যুদ্ধ অবস্থায় যা করণীয় সেটা করা হবে।’ এটার তাত্পর্য হলো চীন যদি ভারত আক্রমণ করে, তাহলে চীনের যে সীমান্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আছে সেই সীমান্ত ধরে তারা তখন একটি ফ্রন্ট খুলবে। ফ্রন্ট খুললে চীন তখন ভারতের সঙ্গে ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দুটো যুদ্ধ একসঙ্গে চালাতে পারবে না। এভাবে চীনকে সংযত করার ব্যবস্থা হয়েছিল। চীন সর্বোচ্চ যেটা করতে পেরেছে সেটা হলো অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু চীনের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। আর ভারত ও বাংলাদেশের ভেতরে মাওবাদী নকশালপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। সেটা ভারতেও করেছে আবার বাংলাদেশের মধ্যেও করেছে। এটা গেল একটা দিক।
অন্যদিকে আমেরিকাও বসে থাকল না। প্রথমে তারা খন্দকার মোশতাকসহ অন্তর্ঘাতের চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে শেষ মুহূর্তে নিক্সন বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গোপসাগর দিয়ে সেটি যদি চট্টগ্রামে আসতে পারে, তবে ভারত আর নিজস্ব বাহিনী নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একত্র হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে সাহস করবে না। আর ঢুকলেও তখন আমেরিকা বলবে, ভারত একটি তৃতীয় দেশ হয়ে যখন বাংলাদেশে ঢুকেছে, সুতরাং এটা এখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধ। এভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বযুদ্ধের মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন খুব সিম্পল একটি হুমকি দেয়। তারা বলে, বঙ্গোপসাগরে যদি সপ্তম নৌবহর ঢোকে তাহলে বঙ্গোপসাগর পাহারা দেয়ার জন্য সেখানে আমরা অ্যাটমিক নিউক্লিয়ার সাবমেরিন পাঠাব। এতদূর কিন্তু ভারতের ক্ষমতায় ছিল না। আমাদের বাংলাদেশের তো কেবল রাইফেল, মেশিনগান, স্টেন আর মর্টার। সুতরাং তখন অত ক্ষমতা আমাদের ছিল না, বিগ প্লেয়ারদের খেলা চলছিল তখন। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর হাতে একটার পর একটা শহরের পতন হতে থাকল। হানাদাররা সব পিছু হটতে হটতে ঢাকায় এসে জমা হতে থাকল। এরপর একটা প্রশ্ন এল, কার কাছে আত্মসমর্পণ করবে পাকিস্তানি বাহিনী। তখন ঠিক হলো, আচ্ছা ভারতীয় বাহিনীও থাকবে আবার ওসমানীও থাকবে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটা ঠিকমতো হয়নি। তবে যেটাই হোক শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ও আমরা বিজয় অর্জন করি। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো।
[বাকি অংশসহ পুরো নিবন্ধটি পড়ুন বণিক বার্তার অনলাইনে]
এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান