গুরুত্বারোপ

সন্দ্বীপের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে কিছু সুপারিশ

যোগাযোগমন্ত্রী জানিয়েছেন, জুনের শেষে পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। এজন্য পদ্মা সেতুর টোল চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ঘোষিত টোলের পরিমাণ বর্তমানে ফেরিতে পদ্মা নদী পার হতে যে টাকা লাগে, তার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি। আগে এখানে নদী পারাপারে ফেরি ব্যবহার করা হতো। জুনে পদ্মা সেতু চালু হলে এ রুটে চলাচলকারী ফেরিগুলোর

যোগাযোগমন্ত্রী জানিয়েছেন, জুনের শেষে পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। এজন্য পদ্মা সেতুর টোল চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ঘোষিত টোলের পরিমাণ বর্তমানে ফেরিতে পদ্মা নদী পার হতে যে টাকা লাগে, তার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি। আগে এখানে নদী পারাপারে ফেরি ব্যবহার করা হতো। জুনে পদ্মা সেতু চালু হলে রুটে চলাচলকারী ফেরিগুলোর ব্যবহার কমে যাবে। সেতুর অবস্থানের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে চলাচল পদ্মা সেতুর উচ্চ টোল পরিহারের জন্য কিছু ফেরির চাহিদা থেকে যাবে। তবুও দুই-তৃতীয়াংশ এমনকি অর্ধেক যানবাহন পদ্মা সেতু ব্যবহার করলেও ফেরির চাহিদা অর্ধেকে নেমে আসবে। এই বাড়তি ফেরিগুলো কোথায় ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়েই আজকের নিবন্ধ।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় সড়ক সেতুর প্রাধান্য

আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সড়ক সেতুর সুস্পষ্ট প্রাধান্য রয়েছে। ফেরি পারাপারে বিলম্ব ভোটের রাজনীতিতে রাস্তা সেতুর জনপ্রিয়তা এর কারণ। ফলে যেখানে সড়ক বা সেতু নির্মাণ দুরূহ এবং ব্যয়বহুল সেসব অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা অবহেলিত থাকে। এসব অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে সমুদ্র উপকূলবর্তী দ্বীপগুলো। এসব দ্বীপের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের কারণে ভোলার যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ ভালো। সেখানে লঞ্চ ফেরি সার্ভিস রয়েছে। ঢাকা, লক্ষ্মীপুর বরিশাল থেকে ভোলায় যাওয়া যায়। একই কারণে হাতিয়ার অবস্থাও তুলনামূলকভাবে ভালো। ঢাকা থেকে লঞ্চে, নোয়াখালী থেকে সি-ট্রাক, ট্রলার স্পিডবোটে সেখানে যাওয়া যায়। দুর্বল দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে বড় উপকূলীয় দ্বীপগুলোর মধ্যে সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থা সবচেয়ে নিম্নমানের বিপত্সংকুল। ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহর থেকে সরাসরি সন্দ্বীপ যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। চট্টগ্রামের কুমিরা/সীতাকুণ্ড থেকে সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত ব্যবস্থা আছে। নিচে বিস্তারিত লিখছি।

সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থার অতীত

খরস্রোতা উত্তাল সমুদ্র মোহনায় অবস্থিত সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থা কখনো সুগম না থাকলেও মোটামুটি ছিল। চট্টগ্রাম শহরের সদরঘাট থেকে বড় স্টিমারে নিরাপদে সন্দ্বীপ যাওয়া যেত। ষাটের দশকে চট্টগ্রামের নিয়াজ স্টেডিয়াম থেকে সন্দ্বীপ যাওয়ার হেলিকপ্টার সার্ভিস ছিল। এর দুটোর কোনোটাই আজ আর অবশিষ্ট নেই।  

সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থার বর্তমান সংকট

বর্তমানে কুমিরা থেকে জাহাজ আইভি রহমান যাতায়াত করে। কুমিরা অংশে জেটি সম্প্রতি ভেঙে পড়েছে। সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া অংশে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি জেটি নির্মাণ করা হলেও চর পড়ে যাওয়ার কারণে কোনোটিই আর কাজ করছে না। বর্তমানে জাহাজে উঠতে এবং নামতে বোটে চড়তে হয় এবং সন্দ্বীপ অংশে যাত্রীদের প্রায়ই হাঁটু এমনকি কোমরসমান পানিতে নামিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া রয়েছে বিপজ্জনক স্পিডবোটে যাতায়াত ব্যবস্থা। কাদা, পানি ঠেলে স্পিডবোটে ওঠানামা করতে হয়। এসব স্পিডবোটে নেই কোনো রাডার, যাত্রীদের জন্য লাইফ জ্যাকেট। জানা গেছে, রুটে স্পিডবোট চালনার কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। তবুও গুপ্তছড়া ঘাট দিয়ে স্পিডবোটে প্রতিদিন দু-তিন হাজার যাত্রী সন্দ্বীপ-কুমিরা মাত্র ১৬ কিলোমিটার পথ ৩০০ টাকায় যাতায়াত করে। সম্প্রতি ভাড়া ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে। অথচ জাতীয় সংগঠন নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের কোনো নৌরুটে স্পিডবোটের ভাড়া বাড়েনি। ভোলা-বরিশাল রুটের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার, ভাড়া ৩০০ টাকা। কক্সবাজার-মহেশখালীর দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার, ভাড়া ৮০-১০০ টাকা। মাওয়া-জাজিরা দূরত্ব ২০ কিলোমিটার, ভাড়া ১৫০ টাকা। বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ আইভি রহমান- ভাড়া কম হলেও ওঠানামার বিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডবোট ব্যবহার করে।

একচেটিয়া ব্যবসা করছে ইজারাদার। সন্দ্বীপ ঘাটকে একচেটিয়া ব্যবসার জিম্মি দশা থেকে মুক্ত করতে হবে। পৃথিবীর সর্বত্রই মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা অনিবার্য হলে সরকারি কর্তৃপক্ষ মূল্য সেবার মান নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণ করে। সন্দ্বীপে তাও করা হয়নি কেন? কার স্বার্থে করা হয়নি কে জানে? বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে আছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ।

এক যুগের বেশি সময় আগে সদরঘাট, চট্টগ্রাম থেকে স্টিমারে সন্দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা প্রত্যাহারের পর থেকে সন্দ্বীপবাসীর কষ্টের শেষ নেই। যাতায়াতের সীমাহীন কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়িত্ববোধের, যাত্রীসেবার মানসিকতার অভাব। যথাযথ সেবা নিরাপত্তা প্রদান ছাড়াই ভাড়া বাড়ানোর মহোৎসব চলছে। সারা দেশে যাতায়াত ব্যবস্থায় সরকারের উপস্থিতি লক্ষ করা গেলেও সরকার এখানে অনুপস্থিত। সন্দ্বীপের তরুণরা সমস্যা সমাধানে সোচ্চার হলেও জনপ্রতিনিধিরা নির্বিকার। অথচ ধরনের সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের সর্বাগ্রে থাকার কথা।

ঘাটের রাজনৈতিক অর্থনীতি

দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের যোগাযোগের একমাত্র পথ সন্দ্বীপ চ্যানেল। চট্টগ্রাম সন্দ্বীপের নৌরুটে থাকা কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটটির মালিক কাগজে-কলমে বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু ২০১৩ সালের নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ একজনের অনুকূলে ঘাট ইজারা দেয়। ওই ইজারাদার কাজ শুরুর একদিন আগে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ একজন রাজনৈতিক নেতাকে নৌঘাটটি ইজারা দিয়ে দেয়। কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুট থেকে বছরে আয় সাড়ে কোটি টাকা। সে রাজস্বে কে ভাগ বসাবে নিয়ে দ্বন্দ্ব সরকারি দুই সংস্থার। তাদের সমন্বয়হীন পদক্ষেপের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

ঘাট নিয়ে সরকারি সংস্থা দুটির দ্বন্দ্বের জেরে গত নয় বছরে রুটে গড়ে ওঠেনি যুগোপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা অবকাঠামো। জেলা পরিষদ ২০১৪ সাল থেকে ঘাটটি পরিচালনা করলেও রুটে নেই কোনো নিরাপদ নৌযান। জোয়ারের সময় নদীর পানিতে নেমে কিংবা ভাটার সময় কাদায় হেঁটে নৌযানে উঠতে বাধ্য হচ্ছে যাত্রীরা। জেলা পরিষদ উচ্চহারে ইজারা দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় লাখ টাকা রাজস্ব নিচ্ছে। অন্যদিকে রাজস্ব হারিয়ে যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ সত্ত্বেও সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছে না বিআইডব্লিউটিএ। অথচ টার্মিনাল গ্যাংওয়ে ব্যবহার বাবদ বছরে ৪০ লাখ টাকা করে আদায় করছে জেলা পরিষদ থেকে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর ছয় বছরের সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু জেলা পরিষদ এখনো বিআইডব্লিউটিএকে ঘাট বুঝিয়ে না দিয়ে অবৈধ ইজারাদার দিয়ে ঘাট পরিচালনা করছে।

সন্দ্বীপ চ্যানেলে যাতায়াতে সাম্প্রতিক মৃত্যু

প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কুমিরা থেকে ছেড়ে আসা একটি স্পিডবোট সম্প্রতি সন্দ্বীপ উপকূলে ডুবে গেছে। গত ২০ এপ্রিল দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটে ২০-২২ জন যাত্রী ছিল। তাদের মধ্যে ১৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। চারজন শিশু মারা যায়। সন্দ্বীপের দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রথমে কালবৈশাখীর কথা বলা হলেও এখন বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বয়ান থেকে জানা যাচ্ছে কালবৈশাখীতে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় পড়েনি। চালক বোটের সঙ্গে জেলেদের জালের রশি আটকানোর পর বোট থেকে লাফ দেন। পরে স্পিডবোটে পানি ঢোকে এবং যাত্রীরা নদীতে লাফ দিতে বাধ্য হয়। কারণে প্রাণহানি ঘটে। এই একবার নয়, সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুটে প্রায়ই ঘটছে এমন দুর্ঘটনা। এর আগে ২০১৭ সালে নৌপথে বোট ডুবে ১৮ যাত্রীর সলিল সমাধি হয়। অতিসম্প্রতি পারাপারে বিলম্বের কারণে এক প্রসূতির মৃত্যু ঘটে।

পরিত্রাণের উপায়

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পথে ব্যবহূত উদ্বৃত্ত ফেরিগুলো কুমিরা/সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ রুটে ব্যবহার সন্দ্বীপের বিদ্যমান যোগাযোগ সমস্যার একটি আশু সমাধান হতে পারে। উল্লেখ্য, ফেরিগুলো চরের পাশে পন্টুনে ভিড়তে পারে। যা সন্দ্বীপের জন্য বিশেষ উপযোগী।

সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন সিঙ্গাপুরের জাহাজ কোম্পানির ক্যাপ্টেন (বর্তমানে কানাডিয়ান শিপিং কোম্পানিতে কর্মরত) রাহাত চৌধুরী বিআইডব্লিউটিসির প্রকৌশলীরা কুমিরা/সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ রুটে ফেরি পরিচালনা কারিগরিভাবে সম্ভব বলে জানিয়েছেন। বর্তমানে বরিশাল-ভোলা রুটে ধরনের ফেরি সার্ভিস চালু আছে। 

খরচ-লাভ বিশ্লেষণ

বিশ্বব্যাপী দেশে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ফেরি সার্ভিসের খরচ-লাভ বিশ্লেষণ খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। তবে সন্দ্বীপের ক্ষেত্রে আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। বর্তমানে প্রতিদিন দুই-তিন হাজার ব্যক্তি যাতায়াত করলেও ফেরি সার্ভিস চালু করলে তা দ্বিগুণ হবে। কারণ তখন ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সরাসরি বাসে সন্দ্বীপ যেতে পারবে। দ্রুত কম ব্যয়ে সন্দ্বীপে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। সন্দ্বীপে প্রস্তাবিত ইপিজেডে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী দ্বীপের বাসিন্দা ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে।    

মানবিক আর্থিক যে বিবেচনাই করা হোক না কেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পথে ব্যবহূত উদ্বৃত্ত ফেরিগুলো কুমিরা/সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ রুটে ব্যবহারের দাবিদার। আমরা আশা করব পন্টুন স্থাপন করে ফেরিগুলো পথে চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে সরকার অবহেলিত সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যা লাঘব করতে এগিয়ে আসবে।  

 

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান: সাবেক সচিব  অধ্যাপক

আরও