তাত্ত্বিকভাবে সম্পর্কটি সোভিয়েত-ভারত সম্পর্ক হলেও কার্যত তা সোভিয়েত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির মালিকানাধীন পত্রিকা প্রাভদা ১৯১২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রাভদা সরকারেরই মুখপত্র। প্রাভদায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, পর্যালোচনা মন্তব্য মূলত সরকারের অভিমতকে প্রতিফলিত করত। ২ এপ্রিল প্রাভদা এবং ইউএসএসআর প্রেসে প্রকাশিত সংবাদটিই একাত্তরের বাংলাদেশ সম্পর্কে সোভিয়েত ধারণা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নির্মম পদক্ষেপ
পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরে এবং অন্যান্য জনবসতিতে নির্মম বোমাবর্ষণ করছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেছে। স্থানীয় জনগণের বিরুদ্ধে ট্যাংক ও ভারী মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। কিয়োদো সুশিনশার (জাপানের একটি নিউজ এজেন্সি) খবরে জানা গেছে, ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দরে জাপানি জাহাজের ক্রুরা বন্দরের পানিতে বহুসংখ্যক মরদেহ ভাসতে দেখেছে। স্বাধীন বাংলা রেডিও স্টেশনের বরাত দিয়ে পিটিআই জানিয়েছে, ২৫ মার্চ থেকে দুদিনের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে রক্তাক্ত সংঘর্ষ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা যে খবর পাঠাচ্ছে, তাতে পৃথিবীর প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক জনমত দুর্ভাবনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নেয়া এ নির্মম পদক্ষেপের কারণে সোভিয়েত জনগণ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সোভিয়েত জনগণ এই প্রতিবেশীর কাছে তাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে যে সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কঠিন সমস্যার মোকাবেলা করবে।
প্রাভদা লিখেছে: সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে জনগণের বিরুদ্ধে নির্মম স্বৈরাচারী সহিংস আক্রমণ বিবেচনা করা যায় আর তা সোভিয়েত জনগণের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সংকটের উদ্ভব হয়েছে, রাজনীতি ছাড়া তার সমাধানের ভিন্ন কোনো উপায় নেই।
ঠিক দুদিন পর ৪ এপ্রিল ১৯৭১ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে লেখা চিঠিতে প্রায় একই ভাষা ব্যবহার করে রক্তপাত ও নির্যাতনের অবসান ঘটাতে বলেছেন।
প্রাভদার প্রতিবেদন ও নিউইয়র্ক টাইমসের দুটি প্রতিবেদন একাত্তরের বাংলাদেশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে বিবেচনা করেছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে ভারতের সঙ্গে চুক্তি
ওয়াশিংটন ১২ আগস্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আজ জানিয়েছেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন তিনদিন আগে দ্রুততার সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চুক্তি সম্পাদন করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া থেকে ভারতকে নিরস্ত করতে পেরেছে। তারা বলেছেন, ২০ বছরের শান্তি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার চুক্তি, যা গত সোমবার তাড়াহুড়ো করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদ্রেই গ্রোমিকো স্বাক্ষর করেছেন, তার মূল্য দিতে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল। দুদিনের নোটিসে সপ্তাহান্তে চুক্তি সই করতে গ্রোমিকো ভারতীয় রাজধানীতে ছুটে গেছেন।
সোমবার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে দাখিল করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারত সরকারকে সতর্ক করে বলেছে যে বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ ডেকে আনবে।
নিপীড়নের শুরু ২৫ ডিসেম্বর
বিচ্ছিন্নতাবাদী বাঙালিরা পূর্ব পাকিস্তানের নাম দিয়েছে বাংলাদেশ। তাদের পেছনে রয়েছে ভারতের প্রকাশ্য সমর্থন। সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তান তাদের দমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর পরিণতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মেনে নেয়া হিসাব অনুযায়ী দুই লাখ মৃত্যু আর ৭০ লাখ শরণার্থী। পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে বিরোধ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। অংশত এর কারণ লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ভারতের ওপর ভয়ংকর বোঝা হয়ে রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের হুমকি দেয়া-নেয়া চলছে।
ওয়াশিংটনে পাওয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৯ আগস্ট ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা করেছে বলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে জানিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এবং ভারতে বাংলাদেশ আন্দোলনে নেতৃত্ব রয়েছে। বিদ্রোহী গেরিলারা ভারত থেকে সাহায্য পেয়ে আসছে এটা জানা আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত দুর্গা প্রসাদ ধর স্বীকৃতি দেয়ার এ বার্তা মস্কোকে জানিয়েছেন। তিনি দৃশ্যত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মিস্টার ধর ২ আগস্ট মস্কো পৌঁছেন। মার্কিন গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোমিকো মিস্টার ধরকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে বলেছেন এবং স্বীকৃতি যুদ্ধের প্ররোচনা দেবে বলেও তিনি সাবধান করে দিয়েছেন। আমেরিকান উৎস থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী এর পর পরই গ্রোমিকো যত শিগগির সম্ভব মিসেস গান্ধী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তাব দিয়েছেন। শুক্রবার গ্রোমিকোর সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয় এবং রোববার তিনি এসে হাজির হন।
কর্মকর্তারা স্মরণ করলেন, প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সম্প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছেন, যুদ্ধ ‘একেবারে কাছে’ এসে গেছে। তিনি বলেছেন, ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পূর্ব পাকিস্তান দখলে সাহায্য করছে আর এটাই ভারতের পাকিস্তান আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিগত সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন উভয় পক্ষের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুদ্ধ এড়াতে পৃথকভাবে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ওয়াশিংটন উভয় রাষ্ট্রের প্রতি প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছে। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিবিড়। সেখানকার কুটনীতিবিদরা গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।
আমেরিকান কর্মকর্তারা অনুমান করছেন, গ্রোমিকো ভারতকে রাজি করাতে সম্মত হয়েছেন বলেই দ্রুত বন্ধুত্ব চুক্তি সম্পাদন করতে গেছেন। কয়েক মাস ধরেই এ চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি চলছিল। কিন্তু মস্কো তা তড়িঘড়ি করে সই করতে রাজি হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ যখন তুঙ্গে উঠতে যাচ্ছে, ভারত চুক্তি সম্পাদনের অধীর আগ্রহী হয়ে ওঠে বলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান। ১৯৬৫-তে দুই দেশের মধ্যে একটি স্বল্পকালীন যুদ্ধ হয়। ভারতীয়রা তখন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সম্পাদিত চুক্তিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি রক্ষাকবচ বিবেচনা করে আসছে। সোভিয়েত মধ্যস্থতায় ১৯৬৫-এর যুদ্ধ শেষ হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে নতুন কোনো অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য দিতে সম্মত হয়েছে কিনা জানা যায়নি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, ভারত যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে, এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে আগাম কোনো নোটিস দেয়নি, কিংবা এ তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানোর কোনো উদ্যোগ ছিল কিনা তাও কর্মকর্তাদের জানা নেই।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র রবার্ট জে ম্যাকক্লোস্কি আজ জানিয়েছেন, ভারত-পাকিস্তান বিরোধ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো আলোচনায় সম্পৃক্ত নয়। এ বিতর্কে সোভিয়েত ভূমিকা সম্পর্কে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ না করে মুখপাত্রকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ জবাব দেন। ভারত সরকার গতকাল প্রথাগত কূটনীতির বাইরে গিয়ে সেক্রেটারি অব স্টেট উইলিয়াম পি রজার্সকে আশ্বস্ত করেছে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র বা তার কোনো মিত্রের দিকে নির্দেশিত নয়। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লক্ষ্মীকান্ত ঝা এ আশ্বাসের কথা জানিয়েছেন এবং সেক্রেটারি অব স্টেট রজার্স তা গ্রহণ করেছেন।
এদিকে আমেরিকান কর্মকর্তারা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান পিছিয়ে গেলেও অদূরভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার প্রশমন ঘটবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্রোহী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য এবং গেরিলাদের সহায়তা বৃদ্ধি করে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজ দেশেই চাপের মধ্যে আছেন। গেরিলা কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা এবং শরণার্থী সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ চাপও বেড়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে একমত যে সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানের মধ্যেই সমাধান নিহিত রয়েছে। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধ যেভাবে তুঙ্গে উঠছে, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ এখন কার্যত অসম্ভব।
শেখ মুজিব মস্কোতে, কোসিগিনের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত
এ শিরোনামে মস্কো থেকে পাঠানো থিওডোর শাবাদের বিশেষ প্রতিবেদন ২ মার্চ ১৯৭২ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়।
মস্কো ১ মার্চ।
একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আজ মস্কো এসে পৌঁছেই দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি এন কোসিগিনের সঙ্গে বেঠকে বসে গেছেন।
জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে প্রথম সরকারি সফরে মস্কো পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন ও তার কয়েকজন অর্থবিষয়ক মন্ত্রী তাকে এয়ারপোর্টে স্বাগত জানান।
ক্রেমলিনের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে শেখ মুজিবের সফর দুই দেশের মধ্যে উত্তম বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করবে।
বাংলাদেশের নেতা মহান বিপ্লবী ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, সোভিয়েত সরকার ও সোভিয়েত জনগণ ন্যায় ও স্বাধীনতার জান্য আমাদের সংগ্রামের শুরু থেকেই পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারত পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে বাংলাদেশকে যে সহায়তা করেছে গত ডিসেম্বরে এ উদ্যোগকে নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন জুগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে, এ কথা শেখ মুজিব ও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জনসমক্ষে বলেছেন। মস্কোতে চারদিনের সফর ধন্যবাদ জানানোর উদ্দেশ্যেই। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশকে পুনরুদ্ধার করতে সোভিয়েত কর্মকর্তাদের জরুরি সহায়তা কামনা করবেন বলে জানা গেছে—যুদ্ধে অর্থনীতি ধসে পড়েছে এবং ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে বলে বলা হয়েছে। শেখ মুজিব তার বক্তৃতায় খাদ্য, ওষুধ, পরিবহন, যন্ত্রপাতি ও গৃহ নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন—লাখ লাখ ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে উন্নত মানের প্রিফ্যাব্রিকেটেড হাউজিং ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। তবে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে কতটা সম্পদ তারা বাংলাদেশে পাঠাতে ইচ্ছুক এটা দেখার বিষয়। সেতু পুনর্নির্মাণে তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা চাওয়া হতে পারে। বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার বদ্বীপে অবস্থিত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষভাবে সেতুনির্ভর।
শেখ মুজিবকে যারা স্বাগত জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে সেমিয়ন সাচকভও ছিলেন। তিনি বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক সাব-কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে বৈদেশিক সহায়তার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। প্রতিনিধি দলে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডক্টর নুরুল ইসলাম এবং উচ্চপর্যায়ের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করে আর্থিক বিষয় নিয়ে আলোচনার আগ্রহ স্পষ্ট করা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হবে। সীমিত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের দুটি প্রধান রফতানি পণ্য পাট ও চা একটি সীমিত চুক্তির আওতায় রাশিয়া আমদানি করতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক পর্যায়ে শেখ মুজিব তার জোটনিরপেক্ষতার নীতি সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছে নিশ্চিত করবেন এবং কমনওয়েলথে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিবেচনাধীন বাংলাদেশের আবেদন যে সোভিয়েতবিরোধী কোনো ব্লকের প্রতি অনুরক্ত হওয়া নয়, তা প্রকাশ ও আশ্বস্ত করবেন। স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করছে, সোভিয়েত তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু—বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এভাবেই প্রচারে ব্যবহার করছে। তথাকথিত জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে সোভিয়েত সমর্থনের প্রচারণা স্পষ্টতই চীনকে বিব্রত করার জন্য। কারণ চীন পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন পূর্ব ও পশ্চিম উইং সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে।
বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং দ্রুত আকাশপথে ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যেমে সম্পর্ক সেতু নির্মাণ করে সদ্য স্বাধীন দেশকে প্রভাবিত করতে চাইছে।
ড. এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা