বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির মঞ্চে করোনা ভ্যাকসিন

একটা গুমোটবদ্ধ পরিবেশ থেকে সারাবিশ্ব মুক্তি চাইছে। এ বছরের শুরু থেকে করোনানামক যে আপদ ও বিপদের মুখে আমরা পড়ে গিয়েছি তা থেকে বের হওয়াটা খুবই জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন মূলত ৩টি জিনিস। ১) হার্ড ইমিউনিটি: মানে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ (৭০-৮০%) এ ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হয়ে গেলে অটোমেটিক এর বিস্তার বন্ধ হয়ে যাবে। সে হিসেবে সাড়ে ৫ শ কোটি থেকে ৬ শো কোটি মানুষ আক্রান্ত হতে হবে। ২) ওষুধ আবিষ্কার: এ রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার করা- যা প্রয়োগ করলে রোগী ভালো হয়ে যাবে।

একটা গুমোটবদ্ধ পরিবেশ থেকে সারাবিশ্ব মুক্তি চাইছে। এ বছরের শুরু থেকে করোনানামক যে আপদ ও বিপদের মুখে আমরা পড়ে গিয়েছি তা থেকে বের হওয়াটা খুবই জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন মূলত ৩টি জিনিস।

১) হার্ড ইমিউনিটি: মানে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ (৭০-৮০%) এ ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হয়ে গেলে অটোমেটিক এর বিস্তার বন্ধ হয়ে যাবে। সে হিসেবে সাড়ে ৫ শ কোটি থেকে ৬ শো কোটি মানুষ আক্রান্ত হতে হবে। ২) ওষুধ আবিষ্কার: এ রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার করা- যা প্রয়োগ করলে রোগী ভালো  হয়ে যাবে।
৩) ভ্যাকসিন আবিষ্কার: সর্বশেষ হচ্ছে ভ্যাকসিন আবিষ্কার। কারণ, ভ্যাকসিন হচ্ছে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। কিন্তু এটা তৈরি করাটা সহজ ব্যাপার না। তার উপরে ভাইরাসজনিত অসুখ হলে কাজটা দারুণ রকম কঠিন হয়ে যায়। কারণ ভাইরাস দ্রুত তার অবস্থা পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। এজন্য ভ্যাকসিন তৈরি করাটা দুরূহ হয়ে ওঠে। যদিও ভাইরাসজনিগ রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন যে বাজারে নেই তা কিন্ত না। হাম, পোলিও, হেপাটাইটিস এ, বি এসব ভাইরাসঘটিত রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তো আছে। আবার চেষ্টা করেও এইডস এর ভ্যাকসিন তৈরি করা যাচ্ছে না।

করোনার ভ্যাকসিন
করোনা বা কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরি ও ওষুধ আবিষ্কার প্রচেষ্টার মধ্যে ‘হার্ড (herd) ইমিউনিটি’ তত্ত্ব বেশ মার্কেট পেয়েছিল। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ করোনা সংক্রমিত হয়ে গেলেই তো হয়। তাহলেই তো এর আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে। 

কিন্তু এর প্রথম খারাপ দিক হলো এ তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রচুর প্রাণহানির সম্ভাবনা দেখা দেয়। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইতালি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এখনও ব্রাজিল এ তত্ত্বে বিশ্বাস করে। দেশটির প্রেসিডেন্ট বলসেনোরো নিজে আক্রান্ত হওয়ার পরে বলেছেন যে এটা বৃষ্টির মতো বিষয়। সবাইকেই এতে ভিজতে হবে।

দ্বিতীয় যে কারণে এটা যুক্তিযুক্ত নয় সেটা হচ্ছে দেখা গেছে করোনাক্রান্ত হওয়ার পরে ২য় বার তো বটেই তারও বেশিবার একইব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আর সুইডেনের কথা আমরা জানি। সেখানে কোন ধরণের লকডাউন দেয়া হয়নি। উদ্দেশ্য ছিলো এই হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা; যদিও সেদেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি কখনো। যাই হোক,পরে মে মাসের দিকে দেখা গেলো  সুইডেনে মাত্র ৮-৯ % মানুষের দেহে করোনা প্রতিরোধের এন্টিবডি পাওয়া গেছে। স্পেনেও এমন ফলাফল মিলেছে।

আর করোনা চিকিৎসার জন্য ওষুধ এ অবধি কার্যকরীভাবে তেমন কিছু আসে নি। সামনে আসবে এমন খবরও খুব বেশি নেই। ফলে ভ্যাকসিনই এখন সবেধন নীলমনি- আমাদের  একমাত্র ভরসার জায়গা।

ভ্যাকসিনের বর্তমান অবস্থাবর্তমানে আমরা যে খবর পাচ্ছি তাতে ৪ টি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন খুবই সাড়া জাগিয়েছে। এরা হচ্ছে আমেরিকাভিত্তিক মডার্ণার ভ্যাকসিন, যুক্তরাজ্যভিত্তিক অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন আর চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ও সিনোফার্মের তৈরিকৃত ২টি ভ্যাকসিন। 

এর মধ্যে চীনের সিনোভ্যাক ও সিনোফার্ম তৃতীয় বা সর্বশেষ ধাপে তাদের কাজ শুরু করেছে। ব্রাজিলে সিনোভ্যাক এরই মাঝে বৃহৎ পরিসরে মানে ৩য় ধাপে ভ্যাকসিনের পরীক্ষা শুরু করেছে। আগামী মাস থেকে বাংলাদেশেও তারা ৩য় ধাপের পরীক্ষামূলক এ ভ্যাকসিনের কাজ শুরু করবে। অন্যদিকে সিনোফার্ম সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের তৈরিকৃত ভ্যাকসিনের ৩য় ধাপের কাজ শুরু করেছে।  আর অক্সফোর্ড যুক্তরাজ্যে তাদের ৩য় ধাপের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। তবে সেখানে রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এর ৩ য় ধাপের ফলাফল পেতে সময় লাগতে পারে।এদিকে মডার্ণার ভ্যাকসিনও আমেরিকাতে ৩য় ধাপের ট্রায়ালে যাচ্ছে।  সাথে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ট্রায়াল হবে। 

এদিকে আচমকা রাশিয়া ঘোষণা করেছে তারাও ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সফল হয়েছে। 

ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণ
নতুন ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণ আসলেই একটি জটিল প্রক্রিয়া। মূল্য নির্ধারণ কৌশলটি একটি ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকের সামগ্রিক কৌশল বলে বিবেচিত হয়। একে বলে marketing mix  বা বিপণন মিশ্রণ। ১৯৫০ এর দশকে বোর্ডেন কীটি এ মার্কেটিং  মিক্স বা ‘বিপণন মিশ্রণ’ ধারণাটি প্রবর্তন করেন।

পরে ম্যাকার্থি বাজারজাতকরণের বিভিন্ন উপাদানকে চারটি ভাগে ভাগ করেন- যা 4P নামে পরিচিত। এগুলো হচ্ছে- 

১) প্রোডাক্ট বা পণ্য: পণ্যটির কার্যকারিতা, গুণমান এবং উপস্থিতি এতে অন্তর্ভুক্ত 
২)  প্রাইস বা মূল্য
৩) প্লেস বা স্থান: পণ্য বিতরণের পরিধি বা জায়গা এবং সরবরাহ এবং
৪) প্রোমোশন বা প্রচার: বিজ্ঞাপন, বার্তা, সরাসরি বিক্রয়, খুচরা বিক্রয়, মিডিয়া, বাজেট ইত্যাদি।

এর সাথে ঐ ভ্যাকসিন তৈরিতে জড়িত কোম্পানির সংখ্যা, উৎপাদন ক্ষমতা, ইন্সুরেন্স, টার্গেট জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এসবও জড়িত হয়ে পড়ে ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণে।

ফলে করোনার ভ্যাকসিনের মূল্য কমেন হবে তা জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদিও শুরুতেই অক্সফোর্ড বলেছিলো ভাকসিন তৈরিতে তারা সফল হলে তা পুরো বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করে দিবে। সেটা হলে গরীব দেশগুলো স্বল্পমূল্যে ভ্যাকসিন প্রস্তুত করতে পারবে।

ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি
করোনার ভ্যাকসিন এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা এরই মাঝে মডার্ণার সব ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছে। আর যুক্তরাজ্য অক্সফোর্ডের তৈরি হতে যাওয়া ভ্যাকসিনের ৯ কোটি ডোজ আগেই কিনে নিয়েছে। বাকি থাকে তাহলে চীন আর রাশিয়া। 

এদিকে করোনা নিয়ে চীন আছে বিশ্বব্যাপী চাপের মুখে। তারা কিছুটা এজঘরে হয়ে পড়েছেও বটে। ফলে চীন হয়ত নিজের স্বার্থেই  আমেরিকা এবং যুক্তরাজ্য বিশ্বের অন্যদেশগুলোকে একপাশে রেখে একচেটিয়া ভ্যাকসিন পাওয়ার যে প্রচেষ্টা শুরি করেছে সেখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে তাদের একটা ইতুবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে সারাবিশ্বে- বিশেষ করে ২য় ও ৩য় সারির দেশগুলোতে। এদিকে নতুন করে রাশিয়া এ দৌড়ে সামিল হওয়ায় আমাদের মতো অন্য সকল দেশের জন্য আর একটা ভ্যাকসিন বিকল্প তৈরি হলো।

ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে আমাদের অবস্থান
আমাদের লোকাল একটা কোম্পানি করোনার এনিমেল ট্রায়ালে সফল হয়েছে বলে সম্প্রতি দাবি করেছে। তার মানে এরা একদম প্রাথমিক অবস্থায় আছে। সামনে তাদের ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ কতটা এগোয় বা সফল হয় এ মুহূর্তে তা বলাটা একদমই অসম্ভব। সেটা সফল হলে আমাদের জন্য তা ভালোই হবে।

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বের এই যে এগিয়ে থাকা ৫টি ভ্যাকসিন (রাশিয়াসহ) এগুলো সফল হলে উৎপাদন যখন শুরু হবে তখন আমাদের অবস্থান কি হবে? আমরা ভ্যাকসিন কবে পাব? এসব প্রশ্ন নিশ্চয় এখন মাথায় আসতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আমার মনে হয় চীন আমাদের প্রথম ও প্রধান ভরসার জায়গা। কারণ শুরু থেকেই চীন বলে এসেছে যে  তারা সফল হলে বাংলাদেশকে ভ্যাকসিনটি প্রায়োরিটি বেসিসেই দিবে। আর এখন তো চীনের কোম্পানি সিনোভ্যাক আমাদের দেশের ৭টি হাসপাতালে আইসিডিডিআর'বি এর সহযোগিতায় তাদের ৩য় ধাপের পরীক্ষা চালাতে যাচ্ছে। ফলাফল পেতে হয়ত মাস চারেক সময় লাগবে। তবে ব্রাজিলে তারা আগেই এটি শুরু করায় আগামী ৩ মাসের মধ্যে এটির ফলাফল জানা যাবে। ফলে আমাদের ভ্যাকসিন প্রাপ্তির একটা দুয়ার খোলাই থাকছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে, সিনোভ্যাক সফল না হলে তখন কী হবে? চীনের অন্য যে কোম্পানি সিনোফার্ম ভ্যাকসিন তৈরি করছে  সেটা সফল হলে সে ভ্যাকসিন কি  আমরা সহজে পাব?  এটা আসলেই এক গুরুতর প্রশ্ন। এজন্য আমার মনে হয় আমাদের সরকারের উচিত ‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’ টা শুরু করা। আলাপ আলোচনা শুরু করতে হবে সম্ভাব্য কোম্পানি ও দেশগুলোর সাথে। কত কম দামে আমরা ভ্যাকসিন দ্রতসময়ে পেতে পারি তা নিয়ে আলাপ আলোচনা এগিয়ে নেয়া। কারণ আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার জন্য সামনে ভ্যাকসিন পাওয়াটা খুবই দরকার।

লেখক: শিক্ষক ও চিকিৎসক, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ

আরও