স্মরণ

সুলতান—বাংলার বিশ্ব-চিত্রশিল্পী

চিত্রশিল্পী শেখ মুহাম্মদ সুলতানকে নিয়ে যত লেখা, সমীক্ষা, আলোচনা দেশে-বিদেশে হয়েছে এবং যে ধরনের সপ্রশংস মূল্যায়ন তিনি পেয়েছেন, মনে হয় না এ উপমহাদেশে অন্য কোনো চিত্রশিল্পীর বেলায় তা হয়েছে। তাঁর জীবদ্দশায়ই তাঁকে নিয়ে উপন্যাস রচিত হয়েছে, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মিত হয়েছে, বই বেরিয়েছে, তিনি হয়ে উঠেছেন এক কিংবদন্তি। সুলতানের সৃষ্টির বলিষ্ঠ আহ্বান দেশ ও কালের ব্যবধান অনায়াসেই ছড়িয়ে গিয়ে একটি সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করে।

চিত্রশিল্পী শেখ মুহাম্মদ সুলতানকে নিয়ে যত লেখা, সমীক্ষা, আলোচনা দেশে-বিদেশে হয়েছে এবং যে ধরনের সপ্রশংস মূল্যায়ন তিনি পেয়েছেন, মনে হয় না এ উপমহাদেশে অন্য কোনো চিত্রশিল্পীর বেলায় তা হয়েছে। তাঁর জীবদ্দশায়ই তাঁকে নিয়ে উপন্যাস রচিত হয়েছে, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মিত হয়েছে, বই বেরিয়েছে, তিনি হয়ে উঠেছেন এক কিংবদন্তি। সুলতানের সৃষ্টির বলিষ্ঠ আহ্বান দেশ ও কালের ব্যবধান অনায়াসেই ছড়িয়ে গিয়ে একটি সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করে।

জাতীয় অধ্যাপক জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক সুলতান সম্পর্কে বলেছেন, ‘সাধারণ মানুষকে অসাধারণ করে দেখার ক্ষমতাই সুলতানের ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য...সুলতান বাংলা এবং বাঙালি বিষয়বস্তু নিয়ে যে সকল ছবি এঁকেছেন, সেগুলো দেশকালের গণ্ডি অতিক্রম করে সব মানুষের উজ্জ্বল উত্তরাধিকারে পরিণত হয়েছে।’ জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী একটি নিবন্ধে সুলতানের আঁকা ছবির অভাবনীয় বৈচিত্র্যের উল্লেখ করে ঢাকায় গ্যেটে ইনস্টিটিউটের এককালীন পরিচালক পিটার জেভিট্স্-এর সুলতান সম্পর্কে বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেন, ‘এই উপমহাদেশের গুটি কয়েক অসামান্য শিল্পীর মধ্যে সবচেয়ে জমকালো সুলতান। তিনি এশিয়ার কণ্ঠস্বর।’ বস্তুত তাঁর সৃষ্টিতে আমরা দেখি ঔপনিবেশিকতা-উত্তর এশিয়ার, না, সারা পৃথিবীর প্রত্যয়ী ও সংগ্রামী মানুষ। এমনকি আমরা দেখি বৈচিত্র্যময় নিসর্গের অনুভূতির বিস্ফোরণ।

বহু বছর আগে করাচির ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিভিউয়ে আমি লিখেছিলাম, In Sultan’s paintings feelings speak up loud and clear. They explode. প্রখ্যাত কথাশিল্পী হাসনাত আবদুল হাই সুলতান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে Albert Aurrier এর ভিনসেন্ট ভ্যান গখ্-এর বর্ণনার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন, ‘This robust and true artist, with the brutal hands of a giant,with the nerves of a hysterical woman, with the soul of a mystic, so orignal and so alone.’

অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর ‘দেশজ আধুনিকতা, সুলতানের কাজ’ (শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত) বইতে লিখেছেন, ‘সুলতান তাহলে কী? একজন লুকানো পিকাসো? একজন গোপন ভিনসেন্ট ভান গখ্? সুলতান দুই-ই। খুব সম্ভব, আরো।’ আমার কাছে মনে হয় এই ‘আরো’ হচ্ছে চিত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে সুলতানের গভীর ও নিবিড় মমত্ববোধ, একাত্মতা, যা তাঁর সৃষ্টিকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছে। তদুপরি, তাঁর ছবিগুলোয় প্রায়ই একটি বাণী রয়েছে, যার জন্যে পিটার জেভিট্স্ তাঁকে ‘এশিয়ার কণ্ঠ’ বলে অভিহিত করেছেন। ছবিতে সংগ্রামী, বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষের মর্মবেদনা নিয়েছে এক বলিষ্ঠ প্রত্যয়ী আশাবাদী রূপ। প্রাজ্ঞ আহমদ ছফা, যিনি সুলতানের গভীরে গিয়ে তার অনুভূত উপলব্ধির অতুলনীয় অভিব্যক্তি দিয়েছেন, বলেন, ‘সুলতানের কৃষকরা জীবনের সাধনায় নিমগ্ন। তার মাটিকে চাষ করে ফসল ফলায় না। পেশির শক্তি দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে প্রকৃতিকে ফুলে-ফসলে সুন্দরী সন্তান-বতী হতে বাধ্য করে।’ কাশ্মীরের অপরূপ নৈসর্গিক বৈচিত্র্যের পটভূমের মুষ্টিবদ্ধ বলিষ্ঠ হাত যেন রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে উন্মুখ।

আহমদ ছফা বলেন, ‘এইখানেই সুলতানের অনন্যতা। এইখানেই বাংলার কোনো শিল্পীর সঙ্গে, ভারতবর্ষের কোনো শিল্পীর সঙ্গে, সুলতানের তুলনা চলে না। অবনীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, নন্দলাল, জয়নুল আবেদিন, আবদুর রহমান চুঘতাই, নাগী, ওই সকল দিকপাল শিল্পীর মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক, তবু সকলের মধ্যে অন্তর্নিহিত যোগসূত্র অবশ্যই রয়ে গেছে। হ্যাভেল ভারতীয় শিল্পাদর্শের যে ব্যাপক সংজ্ঞাটি দিয়েছেন, কেউ তার আওতা ছাড়িয়ে যেতে পারেননি—একজন সুলতান ছাড়া।’ আহমদ ছফা আরো বলেন, ‘ম্যাক্সিম গোর্কির সেই বাক্যটা—কী দর্পিত, কী ব্যঞ্জনাময় এ “মানুষ” শব্দটি—উচ্চারণ মাত্রই নিসর্গের অন্তরে কী ব্যাকুল সাড়া ও কানাকানি পড়ে যায়। সুলতানের আঁকা ছবির মানুষ দেখলে দর্শকের মনে হবে “ম্যাক্সিম গোর্কির মানুষ সম্পর্কিত মন্তব্য কত সার্থক ও যথার্থ হয়েছে”।’ ঢাকায় ইতালির সদ্য-বিদায়ী রাষ্টদূত মারিয়া পালমা, যিনি নিজেও একজন আর্ট-ক্রিটিক, একাধিকবার আমাদের বাড়িতে এসে সুলতানের কয়েকটি আঁকা ছবি দেখে সুলতানের এ সর্বজনীন আবেদনময় অপরূপ প্রকাশের বিশেষ উল্লেখ করেছেন। আহমদ ছফার মতো তিনিও ‘শেখ সুলতানের মধ্যে দ্য ভিঞ্চি, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল প্রমুখ শিল্পীর প্রকাণ্ড কল্পনা ও কল্পনার বলিষ্ঠতার ছাপ’ লক্ষ করেন। রাষ্টদূত ও আর্ট-ক্রিটিক মারিও পালমা তাঁর ইতালিয়ান ভাষায় রচিত L’arte che non dorme এবং ইংরেজি Tales of an Art-lover বই দুটিতে সুলতানের বিস্তৃত প্রশস্তি করেছেন। আর্টের জগতে তাঁর বিশ্বপরিক্রমার ফল ইংরেজি ১৭৮ পৃষ্ঠার বইটির ১৭ পৃষ্ঠাজুড়েই সুলতানের বর্ণনা ও প্রশংসা। তিনি ইতালিয়ান রেনেসাঁ পিরিয়ডের মহান আর্টিস্টদের সঙ্গে, বিশেষ করে, মিকেলেঞ্জেলোর সঙ্গে সুলতানের প্রচুর সাদৃশ্য খুঁজে পান, কিন্তু তাই বলে তাঁকে অনুকরণকারী কেউ বলতে পারে না।

সুলতানের সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইল এবং ভিন্নতর উপলব্ধি ছিল। মারিও পালমা বরং প্রথম জীবনে সুলতানের পেশোয়ার-উদ্ভূত ‘খাকসার’ (বিভাগ-পূর্ব ভারতের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্যে গঠিত আল্লামা মাশরেকীর একটি অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন)-এর আদর্শ এবং তার সঙ্গে সুলতানের সংশ্লিষ্টতাকে তাঁর বলিষ্ঠ মানব-প্রেমের উৎস বলে মনে করেন। কুমিল্লার গ্রামোন্নয়ন ও সমবায় আন্দোলনের উদ্যোক্তা এবং বার্ডের প্রতিষ্ঠাতা শ্রদ্ধেয় আখতার হামিদ খান, যিনি আইসিএস থেকে পদত্যাগ করে বাংলার দরিদ্র জনগণের আত্মনির্ভরশীল ভাগ্য-উন্নয়নের প্রচেষ্টায় আত্মনিবেদন করেন, তিনি ছিলেন আল্লামা মাশরেকীর জামাতা এবং সুলতানের অতীব শ্রদ্ধাভাজন। তাঁর প্রভাব সুলতানের চিন্তাধারায় ছিল। সুলতানের কোনো রাজনৈতিক দল বা আদর্শের প্রতি আনুগত্য ছিল না। তরুণ জীবনে তিনি অনেক প্রখ্যাত বামপন্থী কবি, লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীর সান্নিধ্য এবং সখ্যতা লাভ করেন। তবে তা মূলত তাদের মানববাদী উদার চিন্তাধারার জন্য। কোনো প্রকার—কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বা কোনো বিভাজকনীতির অনেক ঊর্ধ্বে ছিল তাঁর বিচরণ। মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি করেছেন মানব মূর্তির অবলোকন এবং সেটাই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর চিত্রায়ণে। আপন অভিনবত্বে।

মারিও পালমার মতে, The figures of Sultan are truely fascinating and unique in the contemporary art scene. বিশ্বের আর্ট জগতের পটভূমেই তাঁর এ উক্তি। শুধু বাংলার জেলে-কৃষক, বা কাশ্মীরের তরুণী বা সংগ্রামী সাধারণ মানুষেই সুলতানের ‘ফোকাস’ সীমিত ছিল না, যেখানে তিনি অত্যাচারিত, বঞ্চিত, জীবনপ্রত্যাশী মানুষ দেখেছেন, তাদেরই তিনি তার রংতুলিতে নিয়ে এসেছেন। মারিও পালমার ভাষায়, ‘And yet it was the unattractive features of the malnourished, hungry Mohajir (immigrants from pre-partioned India, 1947) that he would choose to portray in large canvases rather than those of the well-groomed rich people around him.’ সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কোনো রাজনৈতিক মানচিত্রে সীমিত ছিল না। সে অর্থে, তিনি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ছিলেন। মারিও পালমা আরো বলেন, ‘In my humble opinion SM Sultan is the greast interpreter of the soil and sprit of Bangladesh.’

এস এম সুলতান স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক অধ্যাপক সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও শিল্পবোদ্ধা সুবীর চৌধুরীর ভাষায়, ‘সুলতানের চিত্রকলা একটি নতুন প্রকাশভঙ্গি দিয়েছে বাংলাদেশের চিত্রকলার জগতে এবং একই সঙ্গে একটি নতুন শিল্পচিন্তা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমাজ ও রাজনীতি এবং বাস্তবের ও ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ। এ অর্জনটি সুলতানকে অমর করেছে এবং এজন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।’ তাঁদের এ মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে আমি মারিও পালমার উক্তিকে বিশদ করে বলতে চাই, যে কারণে তিনি সুলতানকে বাংলার মাটি ও আত্মার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার বা ভাষ্যকার বলেছেন, তাঁর সেই সূত্র ধরেই বলব, এই মাটি ও আত্মা শুধু বাংলার মানুষের নয়, শুধু এশিয়ারও নয় (পিটার জেভিট্স্—এশিয়ার কণ্ঠ) পৃথিবীর মাটিতে অধিকার ও জীবিকার অর্জনে সংগ্রামী সব প্রত্যয়দীপ্ত হার-না-মানা মানুষের। আর্টের জগতে আত্মবিকাশের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বকীয়ত্ব নিয়েই সুলতান এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

সেই ১৯৫২ সালে (সুলতানের বয়স যখন মাত্র উনত্রিশ) উপমহাদেশের একজন খ্যাতনামা আর্ট-ক্রিটিক এস আমজাদ আলি (পাকিস্তান কোয়ার্টারলি জানুয়ারি ১৯৫২) সুলতানের চিত্রকর্মের ওপর বিস্তৃত এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ‘একজন দর্শককে যা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে তা হচ্ছে তাঁর স্টাইলের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। প্রথমত, জলরঙে করা বাংলার নিসর্গ দৃশ্যের নরম, অনুচ্চারিত বর্ণবিন্যাস, যেখানে আকাশ ও পানির অবাধ বিস্তার, অদৃশ্য হতে থাকা দিগন্ত, নারকেলের গাছ এবং নৌকা, জেলে এবং ছবির মতো কুটির—এক শান্ত-শ্রী গ্রামীণ পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলে। এরপর আছে কাশ্মীরের নিসর্গ চিত্রায়ণ, যার অধিকাংশ তেলরং করা এবং সবই খুব রঙিন, বলা যায় উচ্চকিত বর্ণিল।...এসব কাজে তিনি প্রদর্শন করেন এক অসামান্য উদ্দীপনা, কারণ এ বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার শুধু দক্ষতা ও শিল্পকুশলতা এবং একের পর এক ‘ওয়াশ’ চড়ানোর সাবলীলতা থাকলেই চলবে না, তার সঙ্গে থাকা চাই ব্যঞ্জনাধর্মী নানা কুশলী স্পর্শে ছবিকে সঞ্জীবিত করার সামর্থ্য, যা জীবন ও গতিময়তার সকল কম্পমান তীব্রতা নিয়ে বাস্তবতাকে পুনর্নির্মাণ করতে মনকে সাহায্য করবে।’ আমজাদ আলি সুলতানের আঁকা আখরোট গাছের নিচে কাশ্মীরি মেয়েদের একটি ‘চমত্কার’ ছবি বর্ণনা করে বলেছেন, ‘গাছটির পল্লব কিছুটা রীতিবদ্ধ...কিন্তু গুঁড়িটি তার ঘন বলিষ্ঠতার জন্য এক ধরনের স্থাপত্যধর্মিতা লাভ করেছে।...ভাসমান প্রভাব নিচয় থেকে দূরে পরস্পর গ্রথিত অন্তর্দৃষ্টির বলয়ে প্রবেশ করে’ বাংলার কৃষক আর কাশ্মীরের মেয়েদের এই ছবিগুলো দেখতে হবে ‘এসব ছবিতে’। আমজাদ আলি বলেন, ‘রঙের নানা মাত্রা সংবেদনশীলতার সঙ্গে পাশাপাশি বিন্যস্ত হয়েছে, যাতে একটি সজীবতার আবহ তৈরি হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন রং চড়িয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো এবং একই সঙ্গে ত্রুটিহীন একটি সাংগীতিক সুষমাও তৈরি করেছেন শিল্পী। সেজান যেমন বলেন, রং যখন তার সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, কর্মও তখন তার শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে।’

জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী তার নিবন্ধে সৈয়দ আমজাদ আলির ওই যুগের ছবিগুলোর মূল্যায়নের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘তবে সুলতান শুধু ল্যান্ডস্কেপ চিত্রকরই নন। সম্প্রতি তিনি দুটি বিরাট প্যানেলে উদ্বাস্তু ও দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত জনগোষ্ঠীর ছবি এঁকেছেন। মানব মূর্তির রেখায়নে কঠিন নির্বাচন, বিরাটত্ব ও দৃপ্ত ভাবারোপ এবং সর্বোপরি মানবিক মমত্ববোধ ও ট্র্যাজেডির আভাস তার বিকাশমান দক্ষ হাতের জাগতিক স্বাক্ষর বহন করছে।’ সুলতান শুধু চারুশিল্পীই ছিলেন না, পৃথিবীর মানুষের জীবনের সব সুন্দর বৃত্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রকাশকে তিনি আত্মস্থ করেন। তিনি মাটি ও মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন। উত্কর্ষ অর্জনের প্রবৃত্তি ছিল তাঁর এক জন্মগত গুণ। আশ্চর্য ছিল তাঁর বহুমুখী প্রতিভা। তিনি একজন চমত্কার বংশীবাদক ছিলেন, দর্শন সাহিত্য ও সংগীতে ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। ইংরেজি, বাংলা ও উর্দুতে তিনি অত্যন্ত পরিশীলিত কথোপকথন করতেন। এমনকি চমত্কার ভাষণও দিতে পারতেন। ইংরেজি ও উর্দু তিনি রপ্ত করেন অধ্যাপক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সান্নিধ্যে। সাহিত্যে ও দর্শনে তার সৃষ্টিধর্মী অনুরক্তির সূতিকাগার ছিলও তাই। কবিতা হয়ে দাঁড়াত তাঁর উদ্দীপনার উৎস।

প্রথিতযশা শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমদ, যিনি সুলতানকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর ‘আমার স্মৃতিতে সুলতান’ নিবন্ধে বর্ণনা করেছেন, কবিতা আবৃত্তি ও দর্শন আলোচনা সুলতানের সৃষ্টিধর্মী চিন্তাপ্রবাহে কী গভীর রেখাপাত করত। তিনি লিখেছেন, ‘একদিন আমার রবীন্দ্রনাথের “পৃথিবী” কবিতার আবৃত্তি শুনে তিনি (সুলতান) চটপট এক ছবি এঁকে বসলেন। পঙিক্তগুলো ছিল এই: বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎ চঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এল, কালো শ্যেন পাখীর মতো তোমার ঝড়...।’ শাহাবুদ্দিন আহমদ আরো লিখেছেন, ‘তিনি (সুলতান) যেমন মধুসূদনের ভক্ত ছিলেন, তেমনি ছিলেন নজরুল ও ইকবালের ভক্ত। ইকবালের “খুদি-দর্শন” তাঁর মনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। রাবণের “শক্তিমত্তা”, নজরুলের “বিদ্রোহী” আর ইকবালের “খুদি-দর্শন” তাঁর চিত্তে অপরিমেয় মানবশক্তির প্রেরণা জাগাতে সাহায্য করেছিল বলে আমার ধারণা। মানুষের মানসের অন্তস্তলে এই ইচ্ছাশক্তির অবদান আছে বলে মানুষ পৃথিবীর ও প্রকৃতির বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে সংগ্রাম করে আজও বেঁচে আছে।...তাঁর উত্তাল-তরঙ্গায়িত পেশির ফুঁসে ওঠার মধ্য দিয়ে মানুষের অভ্যন্তরীণ ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে দেখাতে হবে মানুষ অজেয়।’ সুলতানের আঁকা অনেক ছবির পেছনে এ দর্শন কাজ করেছে। ইকবালের ‘খুদি’ থেকে সুলতান আবৃত্তি করতেন ‘খুদিকো কর বুলন্দ এতনাকে...।’ আত্মশক্তি যেন এত বিকশিত হয় যে খুদা বান্দার ইচ্ছা অনুযায়ীই তকদির (ভাগ্য) নির্ধারণ করবেন।

সুলতানকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি তো সারা পাকিস্তান, ভারতবর্ষ ঘুরেছেন। বাংলার কথা তো বুঝলাম। কিন্তু আপনার সৃষ্টিধর্মী উদ্দীপনায় ‘কাশ্মীর’ এত প্রধান কেন? তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ শুধু পাকিস্তান-ভারত নয়, ইউরোপ-আমেরিকাও ঘুরেছি, ছবি এঁকেছি। প্রদর্শনী হয়েছে। তবে কাশ্মীরকে নিয়ে আমি প্রথম উদ্দীপিত হই কাশ্মীর ভ্রমণের আগেই। সুকান্তের ‘কাশ্মীর’ কবিতা দুটি আমাকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করে। ছাড়পত্রে প্রকাশিত সুকান্তের ছন্দমুক্ত কাশ্মীর কবিতার আবৃত্তি তিনি নিজেই করলেন:

‘....হঠাৎ জেগে উঠেছে,

সূর্যের ছোঁয়ার চমকে উঠেছে ভূ-স্বর্গ।

...কাশ্মীরের সুন্দর মুখ কঠোর হলো।

প্রচণ্ড সূর্যের উত্তাপে।

গলে গলে পড়ছে বরফ—

ঝরে ঝরে পড়ছে জীবনের স্পন্দন।

...দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছে ওর চুল;

আন্দোলিত শাল, পাইন আর দেবদারুর বনে।

ঝড়ের পক্ষে আজ সুস্পষ্ট সম্মতি।

কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয়,

সূর্য করোত্তাপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে

হাজার হাজার চঞ্চল শ্রোত।

তাই আজ কাল-বৈশাখীর পতাকা উড়ছে—

ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায়...’

(চলবে)

 

ইনাম আহমদ চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত সচিব; জাতিসংঘ কর্মকর্তা; সাবেক চেয়ারম্যান প্রাইভেটাইজেশন কমিশন; সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, উপদেষ্টা পরিষদ

আরও