ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে

সিংহভাগ জনগণ মনে করে দলীয় শাসন মানে মুষ্টিমেয় দলীয় নেতা-কর্মীদের অবারিত শাসন এবং শোষণ, বাকি জনগোষ্ঠীর যেন জেলবাস। তাই তারা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকার পেলে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু জনগণের দমবন্ধ করা দলীয় শাসনের জন্য তো আমরা দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করিনি। তাই তো দরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ছোট ছোট দলগুলোকে অভয় দিয়ে পরম মমতায় জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। এ দলগুলোর রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনই লিড দেয়ার ও নেয়ার সময়।

চব্বিশের গণজাগরণের মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে যেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা আস্তে আস্তে ফিকে হতে বসেছে। আমরা খুব হতাশ হয়ে লক্ষ করছি বড় রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় সংবিধানের কিছু মৌলিক সংস্কার যেমন জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, আনুপাতিক হারে উচ্চ কক্ষে আসন বণ্টন, সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি, বহুত্ববাদ বা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ বিয়োজন-সংযোজন, একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা না হওয়া, এক ব্যক্তির দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হচ্ছে না। যদি এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় দলগুলোর সঙ্গে সংবিধান সংস্কার কমিশনের ঐকমত্য না হয় তবে আমাদের ২৪-এর গণজাগরণও বৃথা যাবে এবং নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে রাজনীতিকরা সংস্কার বিনা অতীতের মতো ক্ষমতা যে ভোগ করবে তাতে তেমন কোনো সন্দেহের অবকাশ দেখি না। যার ইংগিত এখনই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কারণ বড় দলগুলোর নেতারা ওই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোয় ঐকমত্য না হয়ে বরং ছোট ছোট দলগুলোকে তাদের মতের সঙ্গে সায় দিতে দৌড়ঝাঁপ করছেন যা চব্বিশের শহীদদের অমর্যাদা করার শামিল বলে মনে করি। বড় দলগুলো হয়তো কোন কোন ছোট দলকে দুয়েকটি এমপি বা বড়জোর বিশেষ কোনো নেতাকে অতীতের মতো মন্ত্রী পদ দেয়ার প্রলোভন দেখাতে পারে। কিন্তু সংস্কার বিনা আগামীর ক্ষমতা আরোহণ দেশের যে সমূহ ক্ষতি হবে তা তো সব দল এবং জনগণকে আঘাত করবে।

আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় পার্টির সহযোগিতায় কীভাবে দেশে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছিল। কয়টি এমপি-মন্ত্রীর পদ পদবির বিনিময়ে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ জারি রেখেছিল। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিছু তথাকথিত বাম বিপ্লবী দল। একইভাবে যদি আমাদের ছোট ছোট দলগুলোকে আগামী দিনের ক্ষমতাপ্রত্যাশী দল নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে তবে কেন এত শহীদের জীবন দান! ওই সব ছোট ছোট দলের নেতারা তো ওই স্বৈরাচারী আমলে অনেক জেল-জুলম সহ্য করেছেন। সামনের দিনে দল ও দেশকে গড়ে তোলার সুযোগ তো তাদেরও হাতছানি দিচ্ছে। ছোট দলগুলো মিলে যদি একতা বদ্ধ হয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার বিনা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে তবে বড় দলগুলো সংস্কার মানতে বাধ্য হবে। জনগণের কাছে ছোট দলগুলোর মর্যাদাও বাড়বে এবং ভোটের মাঠে এ দলগুলো ভালো ফল করবে বলে আশা। কারণ যারা বিনা সংস্কারে নির্বাচনের কথা বলছেন তারা এরই মধ্যে জনগণের বিরাগভাজন হতে শুরু করেছেন।

সিংহভাগ জনগণ মনে করে দলীয় শাসন মানে মুষ্টিমেয় দলীয় নেতা-কর্মীদের অবারিত শাসন এবং শোষণ, বাকি জনগোষ্ঠীর যেন জেলবাস। তাই তারা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকার পেলে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু জনগণের দমবন্ধ করা দলীয় শাসনের জন্য তো আমরা দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করিনি। তাই তো দরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ছোট ছোট দলগুলোকে অভয় দিয়ে পরম মমতায় জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। এ দলগুলোর রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনই লিড দেয়ার ও নেয়ার সময়। নব্বইয়ের গণজাগরণ ব্যর্থ হওয়ার তিন দশক পরে আর একটি অনন্য সুযোগ জাতির সামনে এসেছে। এ সুযোগ যদি রাজনীতিকদের পক্ষপাতিত্বের কারণে নষ্ট হয় তবে আমরা জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে আর দাঁড়ানোর সুযোগ হয়তো আর পাব না। সমাজের ভেতরে-বাইরে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক নানাকারণে তরুণদের মননে বিরাট পরিবর্তন লক্ষণীয় এবং তা আমদের বষীয়ান রাজনীতিকরা বুঝতে অক্ষম হলেও ছোট দলগুলোর তরুণ রাজনীতিকরা বুঝতে সক্ষম বলে মনে করি। তাই ১৮ কোটি মানুষের দেশকে আগের মতো যেনতেনভাবে শাসন করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সবাইকে ভাবতে হবে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিনা নির্বাচনে জিতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদের অবস্থা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মতো হতে পারে।

তাই ছোট ছোট দলের নেতাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ তারা যেন কোনো কিছুর বিনিময়ে দেশের ভবিষ্যৎ বিসর্জন না দেন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে দাঁড়ান। আগামী কয়েক মাস দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বড় দলগুলো মেনে নিলে নির্বাচনের রোডম্যাপের জন্য সরকারকে চাপ দিতে হবে। কারণ সুনির্দিষ্ট নির্বাচনের রোডম্যাপ ছাড়া দেশে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান থমকে আছে।

নুরুল আমিন: শিল্পোদ্যোক্তা ও কলামলেখক

আরও