আলোকপাত

গম ও ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধিতে নীতি কৌশল

বাংলাদেশে ভুট্টা ও গম যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রধান দানাদার ফসল। ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশে ভুট্টার ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন এবং গমের ৭০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল যথাক্রমে প্রায় ৫৪ লাখ টন এবং ১২ লাখ টন। গত এক দশকে বাংলাদেশে ভুট্টার উৎপাদন ছয় গুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে গত দশকের শুরুতে গম উৎপাদন নিম্নমুখী থাকলেও ২০১৯-২০

বাংলাদেশে ভুট্টা গম যথাক্রমে দ্বিতীয় তৃতীয় প্রধান দানাদার ফসল। ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশে ভুট্টার ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন এবং গমের ৭০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল যথাক্রমে প্রায় ৫৪ লাখ টন এবং ১২ লাখ টন। গত এক দশকে বাংলাদেশে ভুট্টার উৎপাদন ছয় গুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে গত দশকের শুরুতে গম উৎপাদন নিম্নমুখী থাকলেও ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ মৌসুম থেকে দেশে গমের ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর ১১ থেকে ১৫ শতাংশ হারে গম এবং থেকে ১০ লাখ টন ভুট্টার চাহিদা বাড়ছে। অথচ দেশে বর্তমানে গমের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ এবং ভুট্টার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন হচ্ছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন হলে দেশে গম ভুট্টাভিত্তিক মানব পশুখাদ্যসামগ্রীসহ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি সংকুচিত করা যেত। বর্তমানে জলবায়ুগত বৈশ্বিক সমস্যা, বিভিন্ন ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, উপযুক্ত জাতের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশে গম ভুট্টা ফসলের আশানুরূপ উৎপাদন বৃদ্ধির অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানকল্পে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত, বুদ্ধিভিত্তিক প্রায়োগিক সমন্বিত প্রচেষ্টায় গম ভুট্টা ফসলের জাতগুলোর অতিদ্রুত উদ্ভাবন সম্প্রসারণের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশে খাদ্য পুষ্টিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

গম ভুট্টা ফসলের উপযোগিতা এবং বর্তমান অবস্থা: গমের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিবেচনায় এর মোট আয় বোরোর চেয়ে দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি এবং অন্যান্য শীতকালীন ফসলের তুলনায় এর চাষে কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন কম পানির প্রয়োজন, পরিবেশবান্ধব, উচ্চ পুষ্টিমান, বৈচিত্র্যময় ব্যবহার ইত্যাদি। সরকারি আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গম উৎপাদনকারী অঞ্চল উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছে না। নিম্নোক্ত কারণগুলো গম চাষের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত করছে:

) সংক্ষিপ্ত শীতকাল, ) উচ্চ তাপমাত্রা, ) মৌসুমের শুরুতে অথবা দেরিতে বৃষ্টিপাত, ) ব্লাস্টসহ অন্যান্য ছত্রাকজনিত রোগের ব্যাপকতা, ) আমন ধানের বিলম্বিত ফসল কাটার কারণে গম দেরিতে রোপণ।

কিন্তু বাস্তবসম্মত কারিগরি ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সফল কার্যকরভাবে উল্লিখিত বাধাগুলো দূর করে দেশে গম চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। সঠিক অঞ্চলভিত্তিক জলবায়ুসহিষ্ণু গমের জাত উদ্ভাবন, , , -তে উল্লিখিত বাধাগুলো এবং উফশী সংক্ষিপ্ত জীবনকালের আমন ধানের জাতের ব্যবহার উপযুক্ত ফসল ব্যবস্থাপনায় -তে উল্লিখিত বাধাগুলো দূর করে দেশে গম চাষের পর্যাপ্ত সম্প্রসারণ করা যাবে। উল্লেখ্য, দেশে উৎপাদিত গমের ১০০ শতাংশই রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত জাত ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন হচ্ছে এবং উল্লিখিত বাধাগুলোর সমাধানে রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট সক্ষমতার পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছে।

ভুট্টার ক্ষেত্রে মোট আয় বোরোর চেয়ে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি এবং গমের মতোই অন্যান্য শীতকালীন ফসলের তুলনায় এর চাষে কিছু সুবিধা রয়েছে, যেমন কম পানির প্রয়োজন, পরিবেশবান্ধব, উচ্চ পুষ্টিমান, বৈচিত্র্যময় ব্যবহার ইত্যাদি। রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত জাত ব্যবহার সীমিত হলেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে অঞ্চলভিত্তিক ভুট্টার জাত উদ্ভাবনের কারিগরি জ্ঞান সক্ষমতা বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের রয়েছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত গবেষণার জমি উপযুক্ত জনবলের দ্রুত সংকুলান ভুট্টার জাত উদ্ভাবন সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

গম ভুট্টা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা এবং উত্তরণে করণীয়: প্রথমত নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের আবহাওয়া উপযোগী কার্যক্ষম গম ভুট্টার জাত উদ্ভাবন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, জাত উদ্ভাবনসহ ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণাগুলোর ধারাবাহিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা, গম ভুট্টার জাত উদ্ভাবন সম্প্রসারণের কারিগরি বিষয়গুলোর ওপর অধিকতর গুরুত্বদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাসহ আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক (বিডব্লিউএমআরআই, বিএডিসি, ডিএই) সমন্বয় অধিকতর জোরালো করা; সরকারি ভর্তুকি প্রণোদনা, ফসল ব্যবস্থাপনার সঠিক সময়ে কৃষকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো নিশ্চিত করা। এছাড়া গম ভুট্টা উৎপাদনের উলম্ব সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার (ভার্টিক্যাল এক্সপানশন) বাধাগুলো দূর করা। বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল গম ভুট্টার অঞ্চলভিত্তিক জাত চিহ্নিতকরণ এবং অপ্রচলিত নতুন জায়গায় এগুলোর অঞ্চলভিত্তিক সঠিক জাত বিস্তৃতকরণ, যা অঞ্চলভিত্তিক টেকসই ফসল ক্রম/ফসল বিন্যাসে খাপ খাইয়ে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করবে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে মোট বার্ষিক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। জেনোটাইপিক ফেনোটাইপিক পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে এর আগে চিহ্নিত জাত, অগ্রবর্তী লাইনগুলো, প্রাথমিক বংশধারা নির্বাচন করা অব্যাহত রাখা আবশ্যক। এরই মধ্যে উদ্ভাবিত জাত/অগ্রবর্তী লাইনগুলোর অঞ্চলভিত্তিক উপযোগিতা যাচাইপূর্বক নিবিড় উৎপাদন, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত সর্বোচ্চ উপযোগী অগ্রবর্তী লাইনগুলোর এলাকাওয়ারী প্রদর্শন এবং সম্প্রসারণ নিশ্চিতকরণ অতিজরুরি। এজন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বিষয়গুলোকে বেগবান করবে। তাপ, খরা লবণাক্ত প্রতিরোধী অগ্রবর্তী লাইন চিহ্নিত করা এবং দ্রুত জাত উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত জাত উন্নয়ন পদ্ধতি অনুসরণের জন্য ব্রিডিং ল্যাবরেটরিগুলোর আধুনিকীকরণ জাত উন্নয়ন প্রক্রিয়াগুলো ত্বরান্বিত করবে।

গম ভুট্টা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নীতি কৌশল: বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুটি ফসলের গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট কিছু প্রয়াস, যেমন জাত প্রদর্শনী, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ফসল ব্যবস্থাপনা, অঞ্চলভিত্তিক জাত চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ এসব ফসলের শিল্প ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য গম ভুট্টাভিত্তিক নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় সরকারি সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে গম ভুট্টা ফসলের স্থায়িত্ব উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নিচের বিষয়গুলো ভাবা যেতে পারে:

l গম ভুট্টাভিত্তিক শিল্প, যেমন Corn Flex, Wheat Dry Gluten, Corn Strach, corn Oil প্রভৃতি ধরনের শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা।

l তাপ, খরা লবণাক্ত প্রতিরোধী অগ্রবর্তী লাইন চিহ্নিত করা এবং দ্রুত জাত উন্নয়নের লক্ষ্যে সমন্বিত জাত উন্নয়ন পদ্ধতি অনুসরণের জন্য অ্যাডভান্স ব্রিডিং ল্যাবরেটরিগুলোর আধুনিকীকরণ (প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যাদি, যন্ত্রপাতি, গ্রিনহাউজ) করা আবশ্যক। এরই মধ্যে উদ্ভাবিত জাত/অগ্রবর্তী লাইনগুলোর অঞ্চলভিত্তিক উপযোগিতা যাচাইপূর্বক নিবিড় উৎপাদন, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত সর্বোচ্চ উপযোগী অগ্রবর্তী লাইনগুলোর এলাকাওয়ারী প্রদর্শন এবং সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা অতিজরুরি।

l বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপ্রচলিত এলাকায় কৃষক পর্যায়ে গম ভুট্টা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক, যেমন তাপ খরা অঞ্চল (উত্তরাঞ্চলের অংশবিশেষ, চরাঞ্চল, হাওর অঞ্চল পার্বত্য অঞ্চল) এবং লবণাক্ত অঞ্চলের (বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল) জন্য এলাকাভিত্তিক উপযোগী গম ভুট্টার জাতের প্রচলন করা। এসব জাতের বীজ উৎপাদন টেকসই মডেলের দ্বারা অর্জিত সম্প্রসারণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।

l এছাড়া রবি মৌসুমে সিলেট চট্টগ্রাম অঞ্চলে অব্যবহূত ব্যাপক এলাকা গম ভুট্টা চাষে আনা সম্ভব। নতুন গম ভুট্টাচাষীদের এসব ফসলের উৎপাদন কলাকৌশলসহ যাবতীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি নির্বাচিত গম ভুট্টার মানসম্পন্ন বীজ চাষীদের কাছে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গম ভুট্টা ফসলভিত্তিক টেকসই লাভজনক ফসলবিন্যাস চিহ্নিত করা।

l বাংলাদেশে দক্ষিণাঞ্চল (আট লাখ হেক্টর) চরাঞ্চল, সিলেট ময়মনসিংহের হাওর অঞ্চলসহ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি বান্দরবনের পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় লাখ হেক্টর অপ্রচলিত জমিতে গম ভুট্টা চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে এসব এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে গম ভুট্টা চাষের কিছু প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল, যেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তেমন সফলতার মুখ দেখেনি। এসবের মূলে উপযুক্ত জাত চিহ্নিত করতে না পারা তথা উপযুক্ত জাতের ঘাটতি, সঠিক প্রায়োগিক ফসল বিন্যাস/ফসল ক্রম বাস্তবায়ন না করা, টেকসই প্রযুক্তির অভাব, সমন্বিত জোরালো সাংগঠনিক প্রচেষ্টা ইত্যাদি।

l গত কয়েক বছরের গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা  যায়, অপ্রচলিত এলাকায় সাফল্যজনকভাবে গম ভুট্টা চাষ হলেও এর স্থায়িত্ব বেশি দিন থাকে না। ফলে -সংক্রান্ত সমুদয় পরিশ্রম, মেধা, সময় এবং অর্থব্যয় ধুলায় পর্যবসিত হয়। সুতরাং অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটি টেকসই কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করতে পারলে এসব জায়গায় গম ভুট্টা উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত স্থায়ী হবে।

l সরকার প্রতি বছর নগদ মূল্যে বিদেশ থেকে প্রায় ছয় লাখ টন গম প্রতি কেজি ২৯ থেকে ৩০ টাকা দরে আমদানি করে, যা দেশের উৎপাদিত গমের প্রায় ৫০ শতাংশ। অপ্রচলিত এলাকায় আগেই মূল্য নিশ্চিত করলে চুক্তিভিত্তিক চাষীর মাধ্যমে দেশে গম চাষের এলাকা উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এর উপযুক্ততা নিরূপণ সম্ভব।

l দেশে জনগণের খাদ্যতালিকায় গম আবশ্যকীয় অংশ হিসেবে যুক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং কৃষকরা নিজেদের প্রয়োজনের গমটুকু যেন নিজেরাই উৎপাদন করেন এবং তারা সাশ্রয়ী মূল্যে আটা পান, সে লক্ষ্যে তাদের অন্তত পাঁচ শতক জমিতে গম চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে; যা দেশে গম উৎপাদনকে টেকসই রূপ দেবে।

দেশে বর্তমানে গমের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের মাত্র প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ এবং ভুট্টার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন হচ্ছে। তাই গম ভুট্টা ফসলের জাতগুলোর অতিদ্রুত উদ্ভাবন প্রচলনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে গম ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় খাদ্য পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে গম ভুট্টা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নিচে বিষয়গুলোর অবতারণা করা হলো:

l নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের আবহাওয়া উপযোগী জাত উদ্ভাবনসহ ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণাগুলোর ধারাবাহিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা

l দেশে গম উৎপাদনকে টেকসই করতে প্রান্তিক চাষীদের নিজেদের প্রয়োজনীয় গম তাদের নিজেদের উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

l সরকারের গম আমদানি মূল্যটি কৃষকদের নিশ্চিত করে চুক্তিভিত্তিক চাষীর মাধ্যমে দেশে গম চাষের এলাকা উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

l বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপ্রচলিত নতুন এলাকায় এলাকাভিত্তিক সঠিক জাত প্রচলন।

l গম ভুট্টা ফসলভিত্তিক টেকসই লাভজনক ফসল বিন্যাস চিহ্নিত করা।

l গম ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তা, পোলট্রি, মত্স্য এবং গম ভুট্টাভিত্তিক নতুন শিল্পের উন্নয়ন।

l গম ভুট্টা উৎপাদনের কারিগরি বিষয়গুলোর নজরদারি বাড়ানোসহ আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় অধিকতর জোরালো করা। সরকারি ভর্তুকি প্রণোদনা, ফসল ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছতে হবে। উল্লেখ্য, ২০২০-২১ রবি মৌমুমে সরকার যে গমবীজ কৃষকদের প্রণোদনা দেয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বপন সময়ের অনেক পরে কৃষকের হাতে পৌঁছে, ফলে গম উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি মহৎ প্রয়াস অনেকটাই ব্যাহত হয়। 

l গম ভুট্টা উৎপাদনের উলম্ব সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার বাধাগুলো দূর করা। যেমন জাত উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমন্বিত জাত উন্নয়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা।

l রোগ প্রতিরোধী জাত উন্নয়ন কীটপতঙ্গের দমন ব্যবস্থা উদ্ভাবনের জন্য নিয়মমাফিক গবেষণা করতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত আচমকা রোগবালাই, কীটপতঙ্গের আক্রমণ দেখা দিলে আবশ্যিকভাবে তার প্রতিকার উদ্ভাবনের জন্য উপযুক্ত কার্যকর জাত এবং দমন ব্যবস্থার উদ্ভাবন করতে হবে। যেমন সাম্প্রতিককালে গমের ব্লাস্ট এবং ভুট্টা ফল আর্মি দমনে গমের একাধিক জাত এবং ফল আর্মি ওয়ার্মের দমন ব্যবস্থাপনা নির্দেশিত হয়েছে।

উল্লিখিত প্রস্তাবনাগুলো বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় অগ্রাধিকার, উন্নয়নের মূলনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র প্রবৃদ্ধি, পরিকল্পনা সম্পদ পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রস্তাবনার মাধ্যমে বাংলাদেশে কৃষক পর্যায়ে গম ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হবে, যা কৃষকের আয় বৃদ্ধিসহ জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। অন্যদিকে গম ভুট্টা উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত বিজ্ঞানী, কৃষি কর্মকর্তা, সম্প্রসারণ কর্মী এবং গম ভুট্টাচাষীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব অপরিচিত এলাকায় গম ভুট্টার উপযুক্ত ফসল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ফলে দেশে দুটি ফসলভিত্তিক খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন এবং এদের শিল্পভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে এর আগে বর্ণিত প্রয়োজনীয় গম ভুট্টা আমদানি হ্রাস পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে কৃষকের আয় এবং জীবনমান উন্নয়নে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভূমিকা রাখবে। সংক্ষেপে, বাংলাদেশের প্রান্তিক চাষীদের দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘমেয়াদি অথবা স্থায়ী সমাধানে বিশেষ অবদান রাখবে। পরিশেষে বলা যায়, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিনিরাপত্তা আর কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্ভাবনায় গম ভুট্টা ফসলের গুরুত্বের কথা চিন্তা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের আদলে ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা পায়। এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ গতিশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে অতিদ্রুত ডিপিপির বাস্তবায়ন, বাস্তবধর্মী ফলিত গবেষণা প্রকল্পের উন্নয়ন বাস্তবায়ন, দ্রুত লোকবল নিয়োগ, সংশ্লিষ্ট জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গবেষণা সম্প্রসারণ কলেবর বৃদ্ধি, বিদ্যমান কিছু প্রশাসনিক জটিলতা দূর হলে বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।

 

. গোলাম ফারুক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাংলাদেশ গম ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট

সাবেক শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি মালয়া, মালয়েশিয়া

আরও