ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশে বেঁধে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) ক্রমেই বেড়েছে।

এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ২০২৩-এ ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেয়া ও এর পরের বছর সুদহার বাজারভিত্তিক করা। এ দুই পদক্ষেপের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। যদিও মূল্যস্ফীতিতে এগুলোর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি, বরং ব্যাংকের স্প্রেড বেড়ে গেছে। ঋণের সুদহার বাড়লেও আমানতের সুদ নিম্ন রয়ে গেছে। এতে ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশ নির্ধারণ করাটা ইতিবাচক। তবে এর বাস্তবায়ন না হলে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে না। অবিলম্বে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটিই প্রত্যাশা।

এর আগে সুদাহরের সীমা প্রত্যাহার করা বা এটিকে বাজারভিত্তিক করলেও ব্যাংক স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেসময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নিয়মিত তদারকির কথা জানানো হয়েছিল। কোনো ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে সে ব্যাংকে নোটিস পাঠানো হয় বলে দাবি করা হয়েছিল। গত বছর বণিক বার্তায় ব্যাংকের স্প্রেড বৃদ্ধি-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের বরাতে এসব তথ্য জানা যায়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা বা নোটিসের কোনো প্রতিফলন দেশের ব্যাংক খাতে পাওয়া যায়নি, বরং কিছু ব্যাংকের ভাবমূর্তি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় কম সুদেও গ্রাহকরা টাকা জমা রাখেন। ফলে কিছু ব্যাংকের স্প্রেড অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এর পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃঢ়তা ও তদারকির অভাবের যে দায় রয়েছে তা বলাবাহুল্য। সুতরাং সংস্থাটি ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার সাম্প্রতিক যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেই সঙ্গে কোনো ব্যাংক যদি স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা অমান্য করে তবে বিধিমোতাবেক সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে।

ব্যাংক স্প্রেড কেবল একটি আর্থিক সূচক নয়; এটি ব্যাংক খাতের দক্ষতা, প্রতিযোগিতা ও সুশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদহারের মধ্যে এমন ব্যবধান থাকার কথা, যা ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়, ঝুঁকি ও যুক্তিসংগত মুনাফা নিশ্চিত করবে। কিন্তু যখন এ ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সেটি ব্যাংকের দক্ষতার চেয়ে বাজারের অসমতা, ঝুঁকির ভুল মূল্যায়ন কিংবা আস্থার সংকটকেই বেশি প্রতিফলিত করে।

অন্যদিকে স্প্রেড বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও বিনিয়োগে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে গিয়ে পড়ে। অর্থাৎ উচ্চ সুদহার কেবল ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বাধা নয়, এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জনকেও ব্যাহত করে। একই সঙ্গে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে ব্যর্থ হন অথবা উচ্চ সুদের চাপে ঋণ পরিশোধে হিমশিম খান। এতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ে।

আবার স্প্রেড বেশি হওয়ায় আমানতকারীরাও প্রত্যাশিত সুবিধা পাননি। অনেক শক্তিশালী ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদ দিয়েও বিপুল আমানত সংগ্রহ করেছে, কারণ গ্রাহকদের কাছে তাদের প্রতি আস্থা রয়েছে। বিপরীতে দুর্বল ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদ প্রস্তাব করলেও পর্যাপ্ত আমানত আকর্ষণ করতে পারেনি। অর্থাৎ আস্থার সংকটও ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা, যার জন্য দায়ী সুশাসনের ঘাটতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা। সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের জন্যও তদারকি অপরিহার্য। তবে এর বাইরেও স্প্রেড ৪ শতাংশে রাখার নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

যেসব ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বেশি, খেলাপি ঋণের চাপ রয়েছে কিংবা তহবিল সংগ্রহের খরচ বেশি, তারা নির্দেশনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল নির্দেশনা জারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; নিয়মিত তদারকি, প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ব্যাংকভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে এ নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্প্রেড নিয়ন্ত্রণকে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া ব্যাংক খাতে স্থায়ী ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হলে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে।

আরও