স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। খাদ্য উৎপাদন, টিকাদান কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে দেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কিছু মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে, যা স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও জাতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে। কেন রাজনৈতিক দলগুলো বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়েও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়? কেন সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় না? কীভাবে ও কেন দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে? কেন বৈষম্য বাড়ছে? কেন দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়? কেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না? কেন আমরা এখনো আমদানিনির্ভর অর্থনীতি? কেন স্বাস্থ্য খাত অবহেলিত? কেন রাজস্ব আহরণ দুর্বল? কেন রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হলো রাজনীতির উদ্দেশ্যের পরিবর্তন। স্বাধীনতার পর রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র গঠন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনীতিকদের বড় একটি অংশ রাজনীতিকে জনসেবার পরিবর্তে ক্ষমতা অর্জন ও তা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় পরিণত করেন। ফলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পায়। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের শিকার হয়। দুর্নীতি বাংলাদেশের অন্যতম বড় জাতীয় সংকট। দুর্নীতি কেবল ঘুস দেয়া-নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, কর ফাঁকি, অবৈধ নিয়োগ, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না, তখন সৎ ব্যক্তি নিরুৎসাহিত হন এবং অসৎ ব্যক্তি পুরস্কৃত হন। ফলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যায়।
দুর্নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বৈষম্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে পৌঁছায় না। শহর-গ্রামে, ধনী-দরিদ্রে, উচ্চশিক্ষিত-অশিক্ষিতের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একটি রাষ্ট্র তখনই সুস্থ থাকে যখন উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু যখন সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সামাজিক অসন্তোষ ও বঞ্চনা বাড়ে।
এদিকে দেশের অর্থনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো অত্যন্ত জরুরি পণ্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। আমরা জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, ডাল, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির কাঁচামাল এবং বহু ভোগ্যপণ্যের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ, বৈশ্বিক সংকট বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলেই দেশের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি হলো উৎপাদনক্ষমতা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিল্পায়ন, গবেষণা, কৃষির আধুনিকীকরণ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আমরা এখনো বহুলাংশে আমদানিনির্ভর অবস্থায় রয়েছি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনেও একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে সিন্ডিকেট, পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতার অভাব এবং নীতিগত সমন্বয়হীনতা মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। যখন খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে তখন তার প্রভাব সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মানেও অবনতি ঘটে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। স্বাধীনতার পর এ খাতে গুরুত্বপূর্ণ সফলতা এসেছে। তার পরও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় এখনো অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার পরিসর সীমিত, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার অভাব সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলেছে। এজন্যই প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায় এবং দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্য খাতকে ব্যয় নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্বল রাজস্ব আহরণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে কর আদায়ের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে কর ফাঁকি, অদক্ষ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাব রাজস্ব সংগ্রহকে দুর্বল করে। ফলে সরকার উন্নয়ন ব্যয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে না। এক্ষেত্রে মুদ্রা সরবরাহ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখন অর্থনীতি উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আহরণ করতে পারে না এবং একই সময়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম বৃদ্ধি পায়, খেলাপি ঋণ বাড়ে এবং আর্থিক নীতিতে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়, তখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়। স্থানীয় মুদ্রার প্রতি আস্থা কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে। এর ফল হিসেবে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হয়।
বাংলাদেশে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যে অর্থ দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, গবেষণা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা, তার একটি অংশ দেশের বাইরে চলে যায়। অর্থ পাচার শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট এবং জবাবদিহিতার দুর্বলতারও প্রতিফলন। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার অভাবও জাতীয় সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছে। যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হয়ে ব্যক্তি বা দলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন নীতি বা পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো নৈতিকতার সংকট। যখন সমাজে সততার চেয়ে ক্ষমতা, যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় এবং সেবার চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ বেশি গুরুত্ব পায়, তখন রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের সামনে এখনো অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি, জনশক্তি, প্রযুক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের বড় শক্তি। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, কার্যকর রাজস্ব কাঠামো, মানসম্মত শিক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে; ক্ষমতা নয়, সেবাকে রাজনীতির মূল ভিত্তি করতে হবে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে হবে। তবেই বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়; নৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও একটি শক্তিশালী, মর্যাদাবান ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
ইকবাল জিল্লুল মজিদ: পরিচালক, কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার