অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার

শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন। শ্রমবাজারে নারীর ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য তাকে মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। তিনি গবেষণা করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। শ্রম অর্থনীতি তার গবেষণার বিষয় ছিল। ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে সমাজে কাজের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে; এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের অবস্থান,

চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন। শ্রমবাজারে নারীর ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য তাকে মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। তিনি গবেষণা করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। শ্রম অর্থনীতি তার গবেষণার বিষয় ছিল। ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে সমাজে কাজের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে; এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের অবস্থান, নারীর অংশগ্রহণ ও মজুরির ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ধরন ও নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। তার গবেষণার পরিধি ছিল দীর্ঘ দুই শতাব্দী। এটি অবশ্যই মূল্যায়নের দাবি রাখে।

শ্রম অর্থনীতিতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ ও মজুরি প্রসঙ্গে সরকারের কিছু নীতি পরিবর্তন কিংবা মজুরি বৃদ্ধির পর অংশগ্রহণের হার পরিবর্তন—এ ধরনের বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলি। কিন্তু তিনি সামাজিক গতিশীলতার যে বিষয়গুলো শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে সে বিষয়গুলোও এনেছেন। আর্থসামাজিক বিবর্তনের বিষয় তুলে ধরেছেন। দেখা গেছে, আমরা অনেক বিষয়ে কথা বলি, কিন্তু শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ও আয় অনেকটা মূলধারার আলোচনার কিছুটা বাইরে থাকে। এ বিষয়গুলো যতটা প্রাধান্য পাওয়া দরকার, ততটা প্রাধান্য পায়নি। এটি প্রাধান্য পাওয়া জরুরি। শুধু নারীদের কাজ ও বৈষম্যের বিষয়টি নয়, এটি গুরুত্ব পাওয়ার কারণ হচ্ছে কাজ বা শ্রমশক্তি জাতীয় আয়, উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ বিষয়গুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর যেহেতু সার্বিকভাবে সমাজের অর্ধেক মানুষই নারী। সুতরাং অর্ধেক জনগোষ্ঠী, শ্রমবাজারে তাদের অবস্থান, অংশগ্রহণ এবং এগুলোর প্রতিবন্ধকতা কিন্তু সার্বিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে ক্লডিয়া গোল্ডিনের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও গবেষণার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান নিয়ে করা হয়েছে, কিন্তু এ ইস্যুগুলো একটু ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও বিভিন্ন দেশের জন্য প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যে ইস্যুগুলো ৫০-৬০ বছর আগে ছিল। আমাদের দেশের মতো দেশগুলোয় হয়তো এখন সেগুলো ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশভিত্তিক গবেষণা হলেও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য বিশেষ কিছু বিষয় থাকে। সে হিসেবে এ গবেষণা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সাদামাটা একটা বিষয়, তবে এর আবেদন অনেক বিস্তৃত। বিভিন্ন দেশের সমাজে এর প্রভাব রয়েছে। সমাজভেদে তফাৎ থাকতে পারে, কিন্তু এটির প্রাসঙ্গিকতা থাকায় নোবেল কমিটির কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। ক্লডিয়া ১৮ ও ১৯ শতক—এ দুটো সময়ের একটি বড় রূপান্তর দেখিয়েছেন। ১৮ শতকে দেখা যেত যে বিশেষ করে বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমে যায়। এ সময় অর্থনীতির যে পরিবর্তনটা হয়েছিল কৃষি, উৎপাদন কাঠামো থেকে শিল্পের উৎপাদন কাঠামোর দিকে অর্থনীতি ধাবিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই যেটা মনে করা যেতে পারে, কৃষি থেকে শিল্পে যখন বিস্তৃত হয়েছে, তখন কিন্তু কাজের ক্ষেত্র ও পরিধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে। সেক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। আরেকটু সময় যখন অতিবাহিত হলো, ১৯ শতকে শ্রমশক্তি শিল্প থেকে সেবার দিকে বিস্তৃত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে যেটা ভাবা হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই আধুনিক হয়েছে। তাই স্বাভাবিক উপায়েই উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং অর্থনীতির বিস্তার হয়েছে। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে উপনীত হয়েছে, এর ফলে অর্থনীতিতে পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি ভিন্নধর্মী একটি বিষয় দেখিয়েছেন। ক্লডিয়া যেসব বিষয় বলেছেন, যা চলতি শতাব্দীর ৭০-এর দশকে লক্ষণীয় হয়। যেটিকে তিনি ‘বিপ্লবী’ ধারণা বলে সাব্যস্ত করেছেন। সে সময়ে শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ির ভূমিকার ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যে পরিবর্তনের কারণে মেয়েদের পক্ষে বাড়ির বাইরে কাজ করার স্বাধীনতার বিষয়টি তিনি সামনে তুলে ধরেন। তার গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জেন্ডার ওয়েজ গ্যাপ। তিনি যেটি দেখিয়েছেন—নারী-পুরুষের মজুরির পার্থক্য খুব বেশি থাকে না, কিন্তু নারীর প্রথম সন্তান হওয়ার পর মজুরির পার্থক্য বাড়তে থাকে। এটিকে সাদামাটা চোখে ব্যাখ্যা করলে হবে না। বিশেষ করে সন্তান জন্ম দেয়ার এক-দুই বছর পর নারীর উৎপাদনশীলতায় খুব নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ১৮ ও ১৯ শতকের সময়গুলোয় যে পরিবর্তনগুলো হয়েছিল, সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ক্লডিয়া বলেছেন—মেয়েরা তাদের মায়েদের ক্ষেত্রে দেখেছে বিয়ের পর একটা সময় তারা কাজ করছেন, একটা সময় কাজ করছেন না। সার্বিকভাবে একটি মেয়ে যখন মা হয়। সময়ের সঙ্গে যে পরিবর্তন হচ্ছে, কী ধরনের কাজ করছেন। এ প্রেক্ষিতে এক দশক বা লম্বা সময়ের যে পরিসংখ্যান দেখা যায়, তখন কিন্তু পরিবর্তনগুলো বোঝা সম্ভব হয়, যা সাধারণভাবে অন্য গবেষণাগুলোয় দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে মাতৃত্ব বা অভিভাবকত্ব। এটি মেয়েদের ক্যারিয়ার, উপার্জনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেটা পুরুষদের ক্ষেত্রে কম দেখা যায়। এ রকম অনেক বিষয় মনে হতে পারে জানা কথা, কিন্তু তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যে সময়কাল কেন্দ্র করে এ জিনিসগুলো দেখানো হয়েছে। বৃহৎ পরিসরে গ্রহণযোগ্যতাকে দেখা, এটি ক্লডিয়ার গবেষণার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি দেখা হয়, আমাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সে রকম পরিসংখ্যান নেই, কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে তুলনায় কম সময় পার করেছে। পাশাপাশি আমাদের শ্রমশক্তি জরিপে বহু বছরই নারী-পুরুষের উপাত্তভিত্তিক পরিসংখ্যান ছিল না। তবে তাতেও কিছু অভিন্নতা খুঁজে পাওয়া যায়। বিভিন্ন শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ যাচাই করলে দেখা যায়, নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণের তুলনায় পুরুষের অংশগ্রহণ ভিন্ন হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে কয়েকটি ফ্যাক্টর চলে আসে, জেন্ডার ফ্যাক্টরের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী সন্তান যখন থাকে, তখন শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গৃহস্থালি কাজে যারা বেশি সময় ব্যয় করে, তাদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে এটিও নেতিবাচক প্রভাব রাখে। এ ধরনের চিত্র আমরা উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রেও দেখেছি। এটি দেখা গেছে যে আমরা যখন শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করি, নারী ও পুরুষের কোন কোন ফ্যাক্টর ভূমিকা রাখছে? তখন দেখা যায় যে কিছু কিছু বিষয় আমরা শিক্ষা, পারিবারিক কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। কিন্তু কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি না। অব্যাখ্যাত বিষয়গুলোকে আমরা বলি ব্যাড বক্স। যেটাকে জেন্ডার নর্মও বলা হয়। জেন্ডারভিত্তিক কিছু আর্থসামাজিক নর্মস যেগুলো জেন্ডার রেসট্রিক্টিভ নর্ম। সবগুলো ফ্যাক্টর যদি দেখা হয়, শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগে পার্থক্য থাকে। বড় একটা কারণ হচ্ছে গৃহস্থালি বিষয়গুলোকে যদি গণ্য করি, মাতৃত্বের ক্ষেত্রেও দেখা যায় আমাদের দেশে এটি বেশি প্রযোজ্য। দেখা যায় জেন্ডার নর্ম অনুযায়ী মেয়েরা বাইরে যেতে পারবে না, ঘরের কাজ মেয়েদের করতে হবে, ছোট শিশু রেখে মেয়েরা বাইরে যেতে পারবে না বা রাত পর্যন্ত কাজ করতে পারবে না, বিদেশে যেতে মানা এ বিষয়গুলো। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় ক্লডিয়ার এ গবেষণা খুব বেশি গুরুত্ব বহন করছে। আমার নিজেরও আগ্রহের জায়গা শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ। এ বিষয়গুলো সবসময়ই প্রতিভাত হয়েছে। সুতরাং তার কাজের একটি অভিনবত্ব হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমাজে যে ফ্যাক্টর বা ইস্যুগুলো দেখছেন তা ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেও ফ্যাক্টরগুলো একই ধরনের ভূমিকা রাখছে। এখন তার এ নোবেল প্রাপ্তি কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে যে বিষয়ে আলোকপাত করা যায়। যেমন দৃষ্টিভঙ্গিগত জায়গায় শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে যখন কোনো কাজ হয়, এক ধরনের একটি স্টিগমা কাজ করে। যেমন এ কাজগুলো শুধু মেয়েরা করবে বা এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তাই আমাদের সামগ্রিক শ্রমবাজার নিয়ে কাজ করা উচিত। একটি দেশের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মোটামুটিভাবে বাংলাদেশ বা যে দেশই বলেন অর্ধেক যেখানে নারী, সেখানে তাদের যে শ্রমশক্তি যেকোনো দেশের পরিধি, আর্থসামাজিক পরিবর্তন, উন্নয়ন, ভবিষ্যতের অনেক ইস্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে জায়গাগুলোর গুরুত্বের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়, শ্রমবাজারে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ মূলধারার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শ্রম অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে এ বিষয়কে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এ মূল্যায়নটি গুরুত্বপূর্ণ, তার কারণ হচ্ছে এক্ষেত্রে নতুন নতুন গবেষণা করতে মানুষকে আগ্রহী করবে। মেয়েদের ইস্যু যেগুলো, মেয়েরা কাজ করতে অনেক বেশি আগ্রহী, কিন্তু এটার যে বৃহত্তর গ্রহণযোগ্যতা তাতে অনেক পুরুষও কাজ করতে আগ্রহী হবে। গবেষণার ক্ষেত্রে আরো অধিক গবেষণা হবে, আরো ভিন্ন আঙ্গিকে গবেষণা হবে। এছাড়া এটি অনেক মেয়েকে নতুনভাবে শ্রমবাজারে আসার ব্যাপারে উৎসাহিত করবে। যেহেতু নোবেল পুরস্কারের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে শিক্ষা, মাতৃত্ব, প্রজনন স্বাস্থ্য, জেন্ডারভিত্তিক মজুরি পার্থক্য এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সে হিসেবে আশা করা যায় পলিসি ফোকাস হিসেবে এটি গুরুত্ব পাবে। এটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে কাজ করবে। এসব পরিবর্তন আনার জন্য পলিসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ফলে নীতিনির্ধারকরাও এ জায়গায় আরো আগ্রহী হবেন। এটিই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এমনকি পুরুষ গবেষক বা নারী গবেষক যাদের এক্ষেত্রে আগ্রহ ছিল না, তারাও এ বিষয়ে আরো মনোযোগী হবেন। নতুন নতুন মেয়েরা শ্রমবাজারে আসার ব্যাপারে উৎসাহিত হবে। এ জায়গাটিতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলে শতাব্দীর পর শতাব্দী যে ইস্যুগুলো রয়ে গেছে, তা আরো বেশি পলিসি ফোকাসে গুরুত্ব পাবে। সামগ্রিকভাবে ক্লডিয়ার গবেষণা বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে মেয়েদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে আরো উৎসাহমূলক প্রভাব রাখতে পারে বলে আশা করা যায়। 

ড. সায়মা হক বিদিশা: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও