নীতি আলোচনা

দীর্ঘায়ুর লভ্যাংশ পেতে বাংলাদেশের করণীয়

জাতিসংঘের ধারণাপত্র বলছে, সংস্কার ছাড়া চললে বিশ্বজুড়ে গড় সরকারি রাজস্ব ঘাটতি ২০২৫ সালের জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৬০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

গত সাত দশকে মানুষের গড় আয়ু বিশ্বজুড়ে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, আর এ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত তা বাড়তেই থাকবে বলে জাতিসংঘের পূর্বাভাস। কিন্তু একটি সংখ্যা এ অর্জনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নটিকে স্পষ্ট করে দেয়—২০১৯ সালে বিশ্বে গড় আয়ু ও সুস্থ জীবনযাপনের বছরের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৯ দশমিক ৬ বছর। অর্থাৎ মানুষ বেশি দিন বাঁচছে ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়তি বছরগুলোর একটি বড় অংশ কাটছে অসুস্থতা আর দুর্বলতার মধ্যে। ঠিক এ প্রশ্নকে সামনে রেখেই এবার পালিত হয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস।

এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘‌দ্য এজ অব লংজেভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’ বা ‘‌দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা’, একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—দীর্ঘ জীবন তখনই একটি প্রকৃত অর্জন, যখন তার সঙ্গে যুক্ত থাকে সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা। জাতিসংঘের মতে এ ধারণাটিকে বলা হয়েছে ‘‌দীর্ঘায়ুর লভ্যাংশ’—যখন দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে টেকসই স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও অংশগ্রহণ যুক্ত থাকে, তখনই সমাজ প্রকৃত অর্থে লাভবান হয়। উল্টোটা ঘটলে, অর্থাৎ আয়ু বাড়লেও যদি স্বাস্থ্য না বাড়ে প্রবীণদের জীবনের শেষ বছরগুলো কাটে সীমিত সামর্থ্য ও নির্ভরশীলতার মধ্যে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে, কারণ এ দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির গতি বেশ দ্রুত। ২০০১ সালের আদমশুমারিতে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল ৬০ লাখের কিছু বেশি, ২০১১ সালে তা এক কোটি ছাড়ায়, আর ২০২২ সালের আদমশুমারিতে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় কোটিতে—দুই দশকে আড়াই গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব, আর জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ হার ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে—কোনো কোনো হিসাবে তা আরো বেশি হতে পারে। যে পরিবর্তনটি ইউরোপ বা জাপানের মতো দেশে ঘটতে লেগেছিল কয়েক দশক থেকে এক শতাব্দী, বাংলাদেশ সেই একই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে অনেক কম সময়ে—আর সেই তুলনায় প্রস্তুতির সময়ও বেশ কম।

আয়ু বেড়েছে, কিন্তু সুস্থতা?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশের গড় আয়ু এখন প্রায় ৭২ বছর, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ বৃদ্ধির গতি থমকে গেছে—২০২২ সালের ৭২ দশমিক ৪ বছর থেকে ২০২৩ সালে তা সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৩ বছরে। কিন্তু ৭২ বছর কতটা সুস্থভাবে কাটছে, তার কোনো নিয়মিত জাতীয় হিসাব বাংলাদেশে এখনো নেই। প্রবীণদের স্বাস্থ্য নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে, তাতে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্মৃতিভ্রংশ এবং পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার মতো সমস্যাগুলোকে প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বারবার চিহ্নিত করা হয়েছে। বৈশ্বিক ৯ দশমিক ৬ বছরের যে ব্যবধানের কথা জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশে তা কত, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই—থাকলে হয়তো দেখা যেত, দীর্ঘ জীবনের এ অর্জনের একটি বড় অংশই আসলে দীর্ঘ অসুস্থতার গল্প।

ভাতা আছে, নিরাপত্তা কতটুকু?

সামাজিক সুরক্ষার দিক থেকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা পাশাপাশি দৃশ্যমান। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে চালু হওয়া বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি—চলতি অর্থবছরে প্রায় ৬১ লাখ প্রবীণকে ভাতা দিচ্ছে, যার বরাদ্দ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সংখ্যার দিক থেকে এটি একটি বড় কর্মসূচি, কিন্তু মাসিক ভাতার পরিমাণ মাত্র ৬৫০ টাকা— আজকের বাজারদরে যা জীবনযাপনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নয়, বরং প্রতীকী একটি সহায়তা। বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত জনশক্তির হার প্রায় ৮৫ শতাংশ, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায়ও যা অনেক বেশি। দেশের ৮৫ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক এখনো কোনো আইনি সুরক্ষা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে। আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র—দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৬৭ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অর্থাৎ সুরক্ষা যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারাই থেকে যাচ্ছেন বেষ্টনীর বাইরে। দেশের বিপুলসংখ্যক প্রবীণ সারা জীবন অনানুষ্ঠানিক খাতে, বিশেষত কৃষিতে কাজ করেছেন, যেখানে কোনো পেনশন তহবিলে তাদের অবদান রাখার সুযোগই ছিল না। সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করলেও তার প্রকৃত সম্প্রসারণ ও গ্রহণযোগ্যতা এখনো সীমিত।

পারিবারিক কাঠামোর ওপর নতুন চাপ

বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে প্রবীণদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল পরিবারের কাঁধে। কিন্তু নগরায়ণ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এ কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। যে পরিবারে তরুণ সন্তানরা কাজের সন্ধানে শহরে বা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, সেই পরিবারে বয়স্ক বাবা-মা প্রায়ই একা থেকে যাচ্ছেন, নিজের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যত্নের ব্যবস্থা নিজেই করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে লাখ লাখ প্রবীণ মানুষের জন্য এখন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক, টেকসই ও লিঙ্গ সংবেদনশীল দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থা, যা এতদিন পরিবারই বিনা খরচে জুগিয়ে এসেছে। এ পরিবর্তনকে আমলে না নিয়ে কেবল পুরনো পারিবারিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে নীতি তৈরি করলে তা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে না।

প্রবীণদের নিছক যত্নের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে না দেখে সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখা উচিত। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য প্রবীণ মানুষ আজও কৃষিকাজ বা ছোট ব্যবসায় সক্রিয় জীবিকার প্রয়োজনে। এ বাস্তবতা একদিকে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের প্রমাণ, অন্যদিকে তাদের অর্থনৈতিক অবদানেরও সাক্ষ্য দেয়। নীতিনির্ধারণে এ দ্বৈত সত্যকে একসঙ্গে ধারণ হবে।

সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই

জাতিসংঘের ধারণাপত্র বলছে, সংস্কার ছাড়া চললে বিশ্বজুড়ে গড় সরকারি রাজস্ব ঘাটতি ২০২৫ সালের জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৬০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব হিসাবও এ একই সতর্কবার্তার প্রতিধ্বনি করে। একটি ন্যূনতম সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে হলে যেখানে মাসিক ভাতা হতো প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা—বার্ষিক রাজস্ব আদায়ে জিডিপির ২-৩ শতাংশ অতিরিক্ত সংগ্রহ করতে হবে। ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে জিডিপির দশমিক ১ থেকে দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন হবে। অথচ ৬৫ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো ধরনের পেনশন বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার আওতার বাইরে। বাংলাদেশ এখনো জনমিতিক লভ্যাংশের সেই সুবর্ণ সময়ের মধ্যে আছে, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। কিন্তু এ জানালা চিরকাল খোলা থাকবে না। প্রবীণদের স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও যত্ন ব্যবস্থাকে যদি এখনই স্বাস্থ্য, শ্রমবাজার ও রাজস্ব নীতির সঙ্গে সমন্বিতভাবে ভাবা না হয়, তাহলে আজকের বিনিয়োগ ঘাটতিই কয়েক দশক পর রূপ নেবে আরো বড় আর্থিক ও মানবিক সংকটে।

দীর্ঘায়ুর এ যুগে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট—আমরা কি শুধু মানুষের আয়ু বাড়ানোর গল্প বলব, নাকি সেই বাড়তি বছরগুলোকে সুস্থতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বছরে রূপান্তর করার প্রস্তুতিও নেব? জাতিসংঘের এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক এ প্রশ্নটিই ছুড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে, আর উত্তর খোঁজার দায়িত্বটাও এখন আমাদেরই।

আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও