পর্যালোচনা

নগরায়ণ, নগর দারিদ্র্য ও বস্তি সমস্যার সমাধান

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়ণের ইতিবাচক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বা কাল ও ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে সুপ্রতিষ্ঠিত। এর অর্থ ভৌগোলিক অবস্থান ও কালনির্বিশেষে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বৃদ্ধির সঙ্গে নগরায়ণও বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কের গুরুত্ব এখানে যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে বিশেষ করে জীবনধারণের মানোন্নয়নে ও ব্যক্তিস্বাধীনতা

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়ণের ইতিবাচক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বা কাল ও ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে সুপ্রতিষ্ঠিত। এর অর্থ ভৌগোলিক অবস্থান ও কালনির্বিশেষে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বৃদ্ধির সঙ্গে নগরায়ণও বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কের গুরুত্ব এখানে যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে বিশেষ করে জীবনধারণের মানোন্নয়নে ও ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রসারে নগর ও নগরায়ণের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এ সত্ত্বেও নগরায়ণ কোনো অমিশ্র আশীর্বাদ নয়। বড় দাগে সমস্যাসমূহ তিন ধরনের—অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি, মানব বসতির ধরনে অ-টেকসই পরিবর্তন ও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার মতো পরিবেশগত অবনতি। নগরায়ণ যেকোনো অমিশ্র আশীর্বাদ নয় তা বাংলাদেশে বিশেষভাবে দৃশ্যমান।

প্রত্যাশিতভাবেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে নগরায়ণ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশে। উন্নত দেশগুলোয় নগরায়ণের মাত্রা ৮০-৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে নগরায়ণের মাত্রা এরই মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ এখন শহুরে বাসিন্দা। নগরায়ণের এ মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়ণের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিভিন্ন দেশের মধ্যে দেখা গিয়েছে তা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রা বা মাথাপিছু আয়, যা বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ডলার, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে নগরায়ণ যেভাবে এগিয়ে চলেছে তা অনেক জটিলতা সৃষ্টি করে চলেছে। উন্নত দেশগুলো উল্লিখিত সমস্যা সমাধানে অনেক এগিয়ে কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়ণ থেকে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে এগুতে না পারায় নগরায়ণের সমস্যা মানবিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা দেখা যায় বস্তিবাসীর জীবনে, কর্মহীন মানুষের বেঁচে থাকার প্রচেষ্টায়, অস্বাভাবিক যানজটে কর্মঘণ্টা হারানো, রাস্তাঘাটে নিরাপদে চলার অনিশ্চয়তায়, পানি-বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতিতে, পানি নিষ্কাশন এবং পয়ঃনিষ্কাশনের অপ্রতুলতায়, পরিবেশ অবনতির সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ-মহামারীর প্রাদুর্ভাবে।

যেসব কারণে এসব সমস্যা সমাধান বাংলাদেশের জন্য জটিল তার একটি কারণ মৌলিক ধরনের, যা হলো জনবহুল দেশ হওয়ায় বর্তমান ৪০ শতাংশ নগরায়ণের মাত্রাতেই নগরের মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ছয় কোটিতে, যা আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের সময়ের দেশের সমগ্র জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটিকে ছাড়িয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকবে আরো অনেক বছর। জনসংখ্যার তুলনায় দেশের ভৌগোলিক আকার ক্ষুদ্র ও কৃষিজমি অপর্যাপ্ত। যার কারণে লাখ লাখ ভূমিহীন দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে শহর-নগরে এসে জীবিকার সন্ধান করা। এ সন্ধানে বড় গন্তব্য ঢাকা কেননা সম্পদ, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আয় ও নানা ধরনের সরকারি সুবিধার কেন্দ্রস্থল এ মহানগর ঢাকা। ক্ষমতা, সম্পদ, বিনিয়োগ ও আয়ের কেন্দ্রীভূতকরণের ফলে ‘ঢাকা শহরে টাকা ওড়ে, যে যেখান দিয়ে পারে ধরে’ মানুষের মুখে মুখে এ ধরনের কথা ছড়িয়ে পড়ে যা গ্রামীণ অভিবাসনকে শহরমুখী করে তুলেছে বিশেষভাবে ঢাকামুখী, বিশেষ করে ছিন্নমূল গ্রামীণ মানুষের জন্য। যা অনিবার্য করে তুলেছে নগর বস্তির বিস্তার, অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতের প্রসার ও স্বল্প আয়ের মানুষের সমাহার।

মহানগরী বা রাজধানীতে বসবাসের জন্য যে আয়ের প্রয়োজন তা সংখ্যাগরিষ্ঠ নগরবাসীর নেই। যার অবশ্যম্ভাবী ফল জীবনযাত্রার খরচ ও সামর্থ্যের মধ্যে ব্যবধান। এ বাস্তবতা সত্ত্বেও দরিদ্র বা স্বল্প আয়ের নগরবাসীর গ্রামমুখী প্রত্যাবর্তনের সন্ধান তেমন একটা পাওয়া যায় না, মৌসুমি অভিবাসী ছাড়া। এখানে উল্লেখ্য, মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তারা মনে করেন নগরমুখী অভিবাসনকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজন ‘প্রাইস আউট’ নীতি অবলম্বন অর্থাৎ নগর জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি করা বা বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা। আশা করা হয় এ রকম নীতি গ্রহণ ও অনুসরণ করা হলে নগর দরিদ্র, স্বল্প আয়ের নগরবাসী, বস্তিতে বসবাসরত নগরবাসী ও নগরীতে আসতে ইচ্ছুক অভিবাসীরা গ্রামজীবনকেই শ্রেয় মনে করবে; এসে থাকলেও ফিরে যাবে। বাড়ি ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বা জীবনধারণের খরচ বৃদ্ধির কারণে অভিবাসী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যারা আয়ক্ষম নয় তাদের গ্রামে ফেরত পাঠানোর (উদাহরণ দেয়া যায় বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির কারণে গাড়ি চালকের স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রামের বাড়িতে ফেরত পাঠানোর) দৃষ্টান্ত দেখা যায় কিন্তু এ প্রবণতা সীমিত। বিশেষ করে ঢাকা শহরে টাকা ওড়ে তা ধরার চেষ্টায় সব প্রতিকূলতা মেনে নেয়াই যারা যুক্তিসংগত মনে করেন তা অনিবার্যভাবে সৃষ্টি করে আয়ের সন্ধানে অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজে যুক্ত হওয়া আর খরচ কমানোর উপায় হিসেবে বস্তি জীবনকে বেছে নেয়া। তার সঙ্গে আরো বাদ যায় সন্তানের শিক্ষা ও নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা। এ বাস্তবতা নিয়েই চলছে অর্থনৈতিক উন্নয়নতাড়িত নগরায়ণ আর তার সঙ্গে সৃষ্ট সমস্যা। এসব বিষয় নিয়ে ৫০ বছর কাজ করে যাচ্ছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ও তারই প্রতিষ্ঠিত নগর গবেষণা কেন্দ্র (সিউসি)। তার নিজস্ব ও সহযোগীদের অগণিত গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনা, লেখালেখি ও বক্তৃতার প্রধান বিষয় বাংলাদেশের নগরায়ণ, নগর দারিদ্র্য, বস্তি ও ঢাকা মহানগরীর রূপান্তর।

নগর ও নগরায়ণের ইতিহাসলব্ধ জ্ঞানের ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি সন্ধান করে চলেছেন সমস্যা নির্ধারণ, কারণ বিশ্লেষণ ও সমাধানের দিকনির্দেশনা। এ কাজে তাকে তাড়িত করেছে তার শিল্পী-মন ও সৌন্দর্যবোধ যা আমরা দেখি কেমন ঢাকা চাই তা সম্পর্কে তার আকাঙ্ক্ষায়: ‘একটি সুন্দর সমৃদ্ধ রাজধানী শহর চাই, এমন একটি শহর যেখানে সর্বক্ষেত্রে দক্ষতা থাকবে, সৌন্দর্য থাকবে, প্রবৃদ্ধি থাকবে, সমতা থাকবে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে, স্বাস্থ্যসম্মত হবে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অটুট থাকবে, গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।’ তার লেখালেখিতে একজন পাকা শিক্ষাবিদ ও গবেষকের অন্তর্দৃষ্টির ছাপ দেখা যায়। যেমন পাওয়া যায় জ্ঞান অন্বেষা, গবেষণা ও সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ও পরিসংখ্যানের সমাহার, তেমনি দেখা যায় কোনো সমস্যা সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রশ্ন উত্থাপনে যা গবেষণাকর্ম পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এগুলো হলো—এক. সমস্যা নির্ধারণ ও তা তথ্যাদির মাধ্যমে চিহ্নিত ও বর্ণনা করণ; দুই. কারণ জানার জন্য যথাযথ পদ্ধতি গ্রহণ; তিন. এক আর দুইয়ের কাজের ফলে বা মাধ্যমে পাওয়া যায় সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন।

আমাদের জাতীয় স্বাধীনতার পরপরই ও শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকে তার অন্বেষা শুরু হয় ‘বস্তি সমস্যা ও উন্নয়ন’ নিয়ে। তার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর ‘ঢাকার বস্তি সমস্যা’ নিয়ে করা মাস্টার্স থিসিসের একটি প্রশংসনীয় কাজ ধীরে ধীরে প্রসারিত হয় অধ্যাপক নজরুলের মননে, যাকে আমরা এখন চিহ্নিত করি তার বাংলাদেশের নগরায়ণ, ঢাকার রূপান্তর, নগর দারিদ্র্য ও বস্তিসংক্রান্ত কাজ হিসেবে। ‘ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির উন্নতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নতি ও শাসন ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বিশ্বায়নকে তিনি চিহ্নিত করেন বাংলাদেশ বা ঢাকার পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে। যে চারটি প্রধান ও পরস্পর সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে অধ্যাপক নজরুলের কাজ নগরায়ণ, ঢাকার রূপান্তর, নগর দারিদ্র্য, বস্তিতে বসতি তার ধরন, কারণ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে করণীয় পদক্ষেপ যেভাবে তার লেখালেখিতে এসেছে তার সঙ্গে পত্রিকা পাঠকদের পরিচিতির উদ্দেশ্য নিয়ে এ লেখা। পরবর্তী অংশগুলো এ কাজটি সম্পন্নের প্রচেষ্টায় নিবেদিত। 

২. সুষম নগরায়ণ সম্ভাবনার বাংলাদেশ: বাংলাদেশের নগরায়ণে ভৌগোলিক বিস্তৃতির অপর্যাপ্ততা নগরায়ণকে করে তুলেছে কেন্দ্রীভূত, যা প্রধানত ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলকেন্দ্রিক। ঢাকা এককেন্দ্রিক দেশের রাজধানী এবং চট্টগ্রাম বন্দর নগরী হওয়া এর অন্যতম কারণ। এ বাস্তবতা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে নগরায়ণ কেন্দ্রীভূত হওয়া ঐতিহাসিকভাবে পর্যবেক্ষণ করার প্রবণতার সঙ্গে ভিন্ন নয়। কিন্তু এর ফলে একদিকে নগরায়ণের সুফল বা ইতিবাচক দিক বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জন্য সহজলভ্য হচ্ছে না। অন্যদিকে কেন্দ্রীভূত নগরায়ণের ফলে নগরায়ণের নেতিবাচক দিকগুলো থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের নাগরিকরাও।

কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ এড়াতে বাংলাদেশের বড় একটি সুবিধা বা অনুকূল দিক শহর-নগরীর শ্রেণীবিন্যাসে (আরবান হায়ারারকি) বিভিন্ন আকারের শহর-নগরীর উপস্থিতি। এ শ্রেণীবিন্যাসে রয়েছে উপজেলা সদর, জেলা সদর, বিভাগীয় সদর ও দেশের রাজধানী। প্রতিটি বিভাগীয় নগরীর রয়েছে বড় নগরে রূপান্তরের সম্ভাবনা আর একই সঙ্গে বিভাগীয় সদর ও বন্দরনগরী হওয়ায় চট্টগ্রামের রয়েছে রাজধানী ঢাকা বা মহানগরীর কাউন্টারম্যাগনেট হওয়ার। শহর-নগর শ্রেণীবিন্যাসের এ বাস্তবতাকে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ ও রাজনৈতিক মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায় নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের স্তম্ভ হিসেবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে প্রায় সব গ্রামে রয়েছে একটি করে বাজার যেখানে সপ্তাহে একদিন বসে বাজার। এ বাজারগুলো হতে পারে গ্রামভিত্তিক নগর সেবা প্রদানের কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর পরই এ ধরনের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগালে বাজার অর্থনীতিনির্ভর ও ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণ থেকে উদ্ভূত অসাম্য, মানবসতির ভারসাম্যহীনতা ও পরিবেশগত অবনতির বর্তমান অবস্থা এড়ানো যেত।

নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের জন্য যে ধরনের অঙ্গীকার, নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম (ক) শহর-নগর শ্রেণীবিন্যাসের প্রতিটি স্তরকে শক্তিশালী করা; (খ) চট্টগ্রামকে ঢাকার ‘কাউন্টারম্যাগনেট’ (যেমন হো চি মিন হ্যানয়ের) হওয়ার সুযোগ করে দেয়া; (গ) প্রতিটি বিভাগীয় নগরকে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাকে প্রাদেশিক রাজধানী নগরের মতো গড়ে উঠতে সহায়তা করা; (ঘ) বিভাগীয় বা আঞ্চলিক নগরগুলোর সঙ্গে নিজ নিজ অঞ্চলের জেলা ও উপজেলার শহরগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন যাতে করে বিভাগীয় নগরগুলো শুধু ঢাকামুখী না হয়ে নিজ নিজ অঞ্চলের বা বিভাগের শহরগুলোর সঙ্গে সম্পদ বিনিময়ে গতিশীলতা বৃদ্ধি করে। এখানে উল্লেখ্য যে থাইল্যান্ডে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের জন্য আঞ্চলিক নগর প্রোগ্রাম করে উদ্দেশ্য সাধন করতে পারেনি কেননা আঞ্চলিক নগরগুলো নিজ নিজ অঞ্চলের ছোট শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিনিময় বৃদ্ধির পরিবর্তে মহানগর ব্যাংককমুখী হয়ে থাকে। এ অভিজ্ঞতার ফলে পরবর্তী পরিকল্পনায় থাইল্যান্ড আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের জন্য আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরিবর্তিত পরিকল্পনায় আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের কৌশল হয় আঞ্চলিক নগরগুলো ব্যাংককের পরিবর্তে নিজ নিজ অঞ্চলের শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও বিনিময় বৃদ্ধির। এ অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে নগরায়ণের সঙ্গে যে আঞ্চলিক অসমতা সৃষ্টি হয়ে চলেছে তা কমিয়ে আনার জন্য প্রতিটি অঞ্চল/বিভাগের উপ-অঞ্চলের (জেলা-উপজেলার) সঙ্গে বিভাগীয় সদরের যোগাযোগ ও বাণিজ্য বিনিময় বাড়ানোর কৌশলে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তা না হলে প্রতিটি বিভাগীয় সদর বা নগর নিজেদের উপ-অঞ্চলের দিকে না তাকিয়ে ঢাকামুখী যোগাযোগে গুরুত্ব দিয়ে চলবে। এটা হলে নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। আরো যেসব নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম বিভাগীয় বা আঞ্চলিক নগরগুলোর প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা। প্রাদেশিক রাজধানী,  বিধানসভা ও মুখ্যমন্ত্রীর আদালতে বিভাগগুলোকে গড়ে তুললে দেশের রাজনৈতিক জনশক্তিকেও কাজে লাগানো যাবে। এ বিরাট শক্তিকে পুরোপুরি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে ব্যবহারের সুযোগ কম যার ফলে দ্বিতীয় সারির রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে তাদের প্রাদেশিক/আঞ্চলিক/বিভাগীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের সুযোগ হলে কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থেকে সময় ও শক্তির অপচয় হবে না। এ ধরনের পরিবর্তনের বড় অবদান হবে নগরায়ণের বিকেন্দ্রীয়তা। রাজনৈতিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণে যুক্ত হতে হবে অর্থনৈতিক নীতি যার মধ্যে অন্যতম স্থানীয় সম্পদভিত্তিক শিল্পায়নে ও কর্মসংস্থানে সহায়তা প্রদান। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক/বিভাগীয়/আঞ্চলিক প্রশাসনকে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়সহ অর্থায়ন ক্ষমতা প্রদান। এ সক্ষমতা ব্যতীত কোনো স্থানীয় পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করা অসম্ভব।

[নিবন্ধের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ হবে আগামী ২২ ডিসেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার]

 

ড. এটিএম নুরুল আমিন: ইমেরিটাস প্রফেসর; এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ব্যাংকক

আরও