বিদেশগামীদের ৯.৯% প্রশিক্ষণ নেন টিটিসিতে, দুই-তৃতীয়াংশই যাচ্ছেন দক্ষতা ছাড়া

বিদ্যমান টিটিসির পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ছাড়া নতুন টিটিসি অর্থের অপচয়

টিটিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ধরনেও এ অসামঞ্জস্য স্পষ্ট। প্রশিক্ষণার্থীদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশই শিক্ষার্থী।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। লাখ লাখ কর্মী প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন অল্প কিংবা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই। এতে অন্যান্য দেশের শ্রমিকরা যেখানে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারছেন সেখানে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে আমাদের পরিচিতি সস্তা ও সহজলভ্য শ্রমের। আমরা যদি মধ্যম আয়ের কিংবা উন্নত দেশ হতে চাই তাহলে আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ জরুরি।

সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, বিদেশ যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশনে আসা কর্মীদের ৭১ দশমিক ৩ শতাংশই কোনো দক্ষতা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে কারিগরি প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় সরকারি অবকাঠামো জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা টিটিসি। অথচ বিদেশগামীদের মাত্র ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এসব কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য কর্মী তৈরি করার যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার সঙ্গে বিদেশগামী কর্মীদের বাস্তব প্রস্তুতির বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।

সমস্যা কেবল প্রশিক্ষণ না নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশিক্ষণ নিলেও তা কতটা কর্মসংস্থানমুখী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সিপিডির জরিপে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ তাদের চাকরি পেতে একেবারেই সহায়তা করেনি। মাত্র ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করেন, প্রশিক্ষণ কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর অর্থ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমবাজারের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সমন্বয় এখনো তৈরি হয়নি।

টিটিসির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ধরনেও এ অসামঞ্জস্য স্পষ্ট। প্রশিক্ষণার্থীদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশই শিক্ষার্থী। আবার কম্পিউটার অপারেশন, ড্রাইভিং, হাউজকিপিংসহ কয়েকটি ট্রেডে ভর্তির হার বেশি হলেও বিদেশের বিভিন্ন শ্রমবাজারে চাহিদাসম্পন্ন টেইলারিং, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, মোবাইল সার্ভিসিং কিংবা সোলার সিস্টেমের মতো ট্রেড অনেক কেন্দ্রে নেই। অর্থাৎ কোন দেশে কোন ধরনের কর্মীর চাহিদা বাড়ছে, কোন দক্ষতার জন্য কত মজুরি পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন সনদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত—এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করার ঘাটতি রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিটিসির সক্ষমতা। বর্তমানে ১০৪টি টিটিসি থাকলেও সিপিডির জরিপে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ কেন্দ্রের সরঞ্জাম শিল্পের মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্ধেকের বেশি অধ্যক্ষ ল্যাবে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকার কথা জানিয়েছেন। এনএসডিএ লেভেল-৪ কোর্স রয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ কেন্দ্রে। আবার ফেঞ্চুগঞ্জ টিটিসিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থাপিত আধুনিক ল্যাব ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ব্যবহারহীন পড়ে থাকার তথ্য এসেছে। অবকাঠামো তৈরি করে সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারা শুধু সম্পদের অপচয় নয়, দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেও নির্দেশ করে। এমন বাস্তবতায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। অথচ বিদ্যমান ১০৪টি টিটিসি জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নানা সংকটে থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে আরো ৫০টি টিটিসি স্থাপনে ৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকার প্রকল্প এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের সময়ই আইএমইডি বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়ন ছাড়া নতুন কেন্দ্র স্থাপন না করার সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশের আলোকে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর দুর্বলতা দূর করা হয়েছে কিনা তা আগে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

অবশ্যই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো দরকার। কিন্তু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এক বিষয় নয়। একটি নতুন ভবন, কয়েকটি ল্যাব ও কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই দক্ষতা তৈরি হয় না। প্রয়োজন দক্ষ প্রশিক্ষক, আধুনিক কারিকুলাম, পর্যাপ্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা যাচাই এবং সনদের গ্রহণযোগ্যতা। পুরনো টিটিসির পারফরম্যান্স মূল্যায়ন না করে নামকাওয়াস্তে ফের টিটিসি চালু সরকারি অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

বিশ্ববাজার বিবেচনা করে কোন দেশের কোন কোন পেশা সুবিধাজনক, কোন ধরনের প্রশিক্ষণ জরুরি তা বিচার-বিশ্লেষণ করে টিটিসিগুলোর কার্যক্রম ঢেলে সাজাতে হবে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চাহিদা এক নয়। প্রতিটি বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রেড, ভাষা, নিরাপত্তা জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সনদের ধরনও আলাদা। তাই ‘একটি প্রশিক্ষণ সবার জন্য’ ধরনের ব্যবস্থা দিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। এখানে বোয়েসেলসহ বিদেশে কর্মী নিয়োগ ও প্রেরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিটিসির কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে কতজন বিদেশে চাকরি পেলেন, কত মজুরি পেলেন এবং কতজন প্রশিক্ষণ অনুযায়ী কাজ করছেন—এসব সূচকের ভিত্তিতে টিটিসির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় দক্ষতা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ৪৭টি সংস্থা থাকলেও তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের সমন্বয় সীমিত। ফলে একই ধরনের প্রশিক্ষণ একাধিক জায়গায় চলতে পারে, আবার আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় কোনো দক্ষতা পর্যাপ্ত গুরুত্ব নাও পেতে পারে। এক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত দক্ষতা-তথ্যভাণ্ডার ও শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, টিটিসির সাফল্যের মাপকাঠি বদলানো। কতজন ভর্তি হলো, কতজন প্রশিক্ষণ নিল বা কতটি সনদ দেয়া হলো—এসব সংখ্যাগত সূচক দিয়ে দক্ষতা উন্নয়নের সাফল্য বিচার করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না, বরং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন কর্মসংস্থান পেলেন, কতজন বিদেশে গেলেন, কতজন দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পেলেন, তাদের গড় মজুরি কত এবং নিয়োগকর্তারা তাদের দক্ষতা সম্পর্কে কী বলছেন—এসব ফলাফলভিত্তিক সূচককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ আরো টিটিসি তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান টিটিসিগুলোকে কার্যকর করা। নতুন কেন্দ্র প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই স্থাপন করা যেতে পারে; কিন্তু তার আগে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর প্রশিক্ষক, যন্ত্রপাতি, কারিকুলাম, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য গন্তব্য দেশের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদের ব্যবস্থা করতে হবে।

আরও