শামীম আজাদ: ১৯৬৯ সালে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি সেই সময়টায় ছাত্র সমাজের ভূমিকাও অনন্য ছিল। তাছাড়া সময়টি ছিল এমন যা দেশের জীবনও পাল্টে দিয়েছিল।
সেলিম জাহান: তখন উত্তাল উত্তুঙ্গ একটা সময় গেছে।
শামীম আজাদ: সবাই জানতে চাইতো বাংলা বিভাগের শিক্ষকগন এত
পরিচিত কেন? সবাই তাদের চেনেন কি ভাবে? তার কারণ হল
আমাদের স্যাররা ভাষা-সাহিত্য নিয়ে পঠন-পাঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাহিত্যিক অঙ্গনে সবসময় খুব সোচ্চার ছিলেন। আন্দোলনে, সংগ্রামে, লেখাতে, চলচ্চিত্রে, সংগঠন নির্মাণে তারা এগিয়ে ছিলেন। আবদুল্লাহ আবু সাঈদ ঢাকায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন করেছিলেন তা একসময় সমস্ত দেশব্যাপী ছড়িয়ে যায়। প্রয়াত জহির রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সদ্যপ্রয়াত আলোকচিত্রী সাইদা খানম— তিনি প্রথম নারী আলোকচিত্রী এবং তিনি আমাদের অনেকের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার জায়গা নির্মাণ করে দিয়েছেন। সাইদা আপা একসময় আবদুল হাই স্মৃতি পাঠকক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। আপা খুব নিয়ম মানতেন। ভেতরে ঢুকলে আর কোনো কথা বলা যেতো না।
সেলিম জাহান: আমরা সবাই জানি ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পরে লর্ড ক্যানিংয়ের একটা নির্দেশনামায় বলা হলো যে ভারতবর্ষে তিনটা বিশ্ববিদ্যালয় হবে। একটা উড়িষা, একটা কলকাতা ও একটা বঙ্গে। বঙ্গ তখন পশ্চিম বঙ্গ পূর্ব বঙ্গ এবং আসাম নিয়ে। সেটাকে ভাগ করে বর্তমান বাংলাদেশ ও আসাম মিলে পূর্ববঙ্গে হবে। এর বিরুদ্ধে খুব আন্দোলন হল, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের যারা গণ্যমান্য ব্যক্তি তারাই আন্দোলনের সূত্রপাত করলেন। এবং এই আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেল। এখন প্রশ্নটা উঠলো যে, এই যে আশা-আকাঙ্খা, একটা আলাদা প্রদেশ, যেখান থেকে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা আলাদা একটা ক্ষমতা এবং শক্তির জায়গা পেয়েছিল, সেটা যখন বন্ধ হয়ে গেল তখন ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসকেরা মনে করলেন এটার বদলে পূর্ববঙ্গকে কিছু একটা দেওয়া যায় কিনা।
শামীম আজাদ: এবং আমাদের যাঁরা নেতৃস্থানীয় ছিলেন তারা দেখলেন যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলে ঢাকা যে কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, উৎস হয়ে উঠেছিল সেটা আর নেই। আমাদের অঞ্চলটা তো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, এখানের মধ্যবৃত্তের জাগরণের জন্য একটা কিছু করা দরকার।
সেলিম জাহান: এবং এটা থেকেই ইংরেজ সরকার বললেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হোক। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা আসলো তখন তিন দিক থেকে বিরোধিতা এসেছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের কাছ থেকে একটি বিরোধিতা এসেছে কারণ তারা ভেবেছেন যে, ঢাকাতে বিশ্ববিদ্যালয় হলে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের তো কোনো লাভ হবে না।
শামীম আজাদ: বিত্ত বৈভব সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাাশি সংসদীয় পর্যায়ে তাদের কিন্তু ভালো অবস্থান ছিল।
সেলিম জাহান: দ্বিতীয় যে গোষ্ঠীটি বিরোধিতা করেছিলেন তারা ছিলেন পূর্ববঙ্গের কিছু মুসলিম গোষ্ঠী। তাদের মূল কথাটা ছিল ১০ হাজার মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে একজন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে সুতরাং তারা বললেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার চাইতে পূর্ববঙ্গে বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন। তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি যেটা অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ পশ্চিমবঙ্গ এবং আসাম মিলিয়ে ১৯টি কলেজ ছিল। এই ১৯টি কলেজের নয়টি ছিল পূর্ববঙ্গে। যেমন, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ, ময়মানসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ। তৃতীয় যে গোষ্ঠীটি বিরোধিতা করলেন তার অগ্রগণ্য ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি, স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এবং ড নীলরতন সরকার।
শামীম আজাদ: তারা কিন্তু মনে করেছিলেন যে ঢাকাতে যদি বিশ্ববিদ্যালয় হয় তখন তাদের জোরটা কমে যায়। তাছাড়া পূর্ববঙ্গ থেকে ছাত্ররাও তো তখন যে করেই হোক কলকাতায় যেত, তা বন্ধ হয়ে যাবে।
সেলিম জাহান: কথিত আছে যে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লড হার্ডিঞ্জ তখন আশুতোষ মুখার্জিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কী করলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরুদ্ধে বিরোধিতা বন্ধ করবেন। তখন তিনি বললেন যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ চারটি অধ্যাপকের পদ যদি দেওয়া হয় তাহলে তিনি বিরোধিতা করবেন না।
শামীম আজাদ: ততদিনে কিন্তু বিশ্ববিবদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। স্যার সলিমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, এ কে ফজলুল হক ও অন্যান্য নেতাদের সমন্বয়ে ১৯জনের প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে গিয়ে তাদের দাবীর কথা বলেন। স্যার আশুতোষ মুখার্জির বিরোধিতায় কিন্তু তারা দমে গেলেন না। ১৯ জন থেকে পরবর্তীতে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথান কমিশনের প্রতিনিধি দলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জোর দাবী উত্থাপন করে। তখন কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে, অর্থনৈতিক অবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
সেলিম জাহান: তাছাড়া ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহ মারা যান।
শামীম আজাদ: কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার আগে যখন যে কাজটি করে গিয়েছিলেন তা হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যখন ভারতীয় আইনসভায় অনুমতি লাভ করিয়ে নিয়েছেন, তিনি ৬শত একর জমি দিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বাকি অর্থ সহায়তা দিলেন। দারুন ব্যাপার হলো, স্যার সলিমুল্লাহ দিলেন জমি আর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী দিলেন অর্থ। নোয়াব
আলী প্রথমে ছাত্রবৃত্তি নিশ্চিত করার জন্য ১৬ হাজার টাকা দিলেন, পরবর্তীতে তিনি তার জমিদারি বন্ধক দিয়ে দিলেন ৩৫ হাজার টাকা।
সেলিম জাহান: আমি যতটুকু জানি, তখন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হলে সরকারকে নিবন্ধনের জন্য অর্থ দিতে হতো। সেটা ওখান থেকে এসেছে।
শামীম আজাদ: প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক জ্ঞানী-গুণী শিক্ষকেরা যোগ দিলেন। তারাই বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিলেন।
সেলিম জাহান: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। অনেকে বলেন তিনি বিরোধিতা করেছিলেন, অনেক বলেন না। তবে যারা বলছেন যে, রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছেন তারা কিন্তু কোনোরকম তথ্য দিতে পারছেন না এবং যে সমস্ত ঘটনার ভিত্তিতে তারা বলছেন সেগুলো কিন্তু কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না।
শামীম আজাদ: রবীন্দ্রনাথ স্যার আশুতোষ মুখার্জির সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু তারা যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আলাপ-আলোচনায় বসেছিলেন এর কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই।
সেলিম জাহান: যারা বিরোধিতা করেছেন তারা রবীন্দ্রনাথের খুব কাছের লোক। স্যার আশুতোষ মুখার্জি, স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এবং ড নীলরতন সরকার। ড নীলরতন সরকার রবীন্দ্রনাথের শৈল চিকিৎসক ছিলেন। তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চলাফেরা ছিল বলেই যে তিনিও বিরোধিতা করেছেন তেমন নয়। অনেকে বলেন যে, গড়ের মাঠে ১৯১২ সালে ১২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে একটি সভা হয়েছিল, সেখানে রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এটা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন কারণ তিনি তখন মাদ্রাজে ছিলেন। সেই সময় তার বিদেশযাত্রার কথা ছিল। ওই সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুতরাং ১২ মার্চ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে দুই-জায়গায় থাকা সম্ভব নয়। অসুস্থ হয়ে শিলাইদহে ফিরে যাওয়ার পথে আশুতোষ মুখার্জি, নীলরতন সরকারের সঙ্গে তিনি দেখা করেছিলেন— যেটা শামীম উল্লেখ করেছে। কিন্তু এটার ভিত্তিতে মোটেই বলা উচিত্ হবে না যে, রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছিলেন। লর্ড কার্জনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিরোধ ঘটেছিল উচ্চশিক্ষার নীতি নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ এটি নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পাঁচ বছর পর ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি ৭ ফেব্রুয়ারি নর্থ ব্রুক হলে তিনি বক্তৃতা করেন। তারপরে ১২ ফেব্রুয়ারিতে জগন্নাথ হলের বার্ষিকী অনুষ্ঠান উপলক্ষে তিনি একটি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন। এবং তখন জগন্নাথ হলের প্রাধাক্ষ ছিলেন ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার। তিনি যে কবিতাটি লিখে দিয়েছিলেন সেটি হচ্ছে ‘এই কথাটি মনে রেখো।’
শামীম আজাদ: শুধুমাত্র একটি বার্ষিকী নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার একটা নিবিড় সংযোগ স্থাপিত হলো। বিভিন্ন বার্ষিকীতে যখন তার লেখা চাওয়া হলো তিনি লেখা দিলেন।
সেলিম জাহান: রবীন্দ্রনাথ কার্জনহলে দুটো গণবক্তৃতা করেন। সেখানে সভাপতিত্ব করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জর্জ ল্যাংলি। রবীন্দ্রনাথ দুটো বিষয় নিয়ে বলেন, একটা হচ্ছে দ্যা মিনিং অব আর্ট এবং অন্যটা দ্য বিগ এন্ড দ্য কমপ্লেক্স। এরপর সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, জগন্নাথ হল ও ঢাকা হলে তার বক্তৃতা প্রদানের কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাড়া বাকী দুটিতে তিনি বক্তৃতা দিতে পারেন নি। সেদিনই তাকে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের আজীবন সদস্য করে নেওয়া হয়। বলে রাখি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সঙ্গেই কিন্তু তার সবচেয়ে নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক ছিল। ১৯৩৩ সালে যখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথকে কবিতা পাঠাতে অনুরোধ করা হলে তখন তিনি ‘উদ্বোধন’ নামে কবিতা একটি পাঠিয়েছিলেন। শামীম তুমি কবিতাটা কি পড়বে?
শামীম আজাদ: আহ্বান কবিতাটা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ইউনিয়নের ১৯৩৩ সালের বার্ষিকীতে ছাপা হয়—
“ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত-অম্বর-মাঝে,
দিকে দিগন্তরে ভুবনমন্দিরে শান্তিসঙ্গীত বাজে॥
হেরো গো অন্তরে অরূপসুন্দরে, নিখিল সংসারে পরমবন্ধুরে,
এসো আনন্দিত মিলন-অঙ্গনে শোভন মঙ্গল সাজে॥
কলুষ কল্মষ বিরোধ বিদ্বেষ হউক নির্মল, হউক নিঃশেষ-
চিত্তে হোক যত বিঘ্ন অপগত নিত্য কল্যাণকাজে॥
স্বর তরঙ্গিয়া গাও বিহঙ্গম, পূর্বপশ্চিমবন্ধুসঙ্গম-
মৈত্রীবন্ধনপুণ্যমন্ত্র-পবিত্র বিশ্বসমাজে”
আমি মনে করি যে কবিগনকে বা প্রথিতযশা কবিদের যখন আমরা একটি সীমানার মধ্যে চিন্তা করি, মনে করি যে তিনি শুধুই একটি দেশের কিংবা তিনি শুধু সে
দেশেরই মঙ্গল চান বা আমরা তাদেরকে আমাদের রাজনীতির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করি— সেটা কিন্তু ঘোর অন্যায়। কারণ কবিগন কখনই কোনো সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকেন না। আহ্বান কবিতাটাতেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববন্ধুত্বের কথা বলেছেন।
সেলিম জাহান: ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দুইবছর আগের কথা। সেবছরও তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের জন্য একটি কবিতা লিখেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে কবিতাটির শিরোনাম ছিল বাংলাতে। ‘উদ্বোধন’ নামে কিন্তু কবিতাটি লেখা ইংরেজিতে। পরবর্তীতে মোহিতলাল মজুমদার এটা বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। ইংরেজি ওই কবিতাটির কিছু অংশ আমি উল্লেখ করছি।
thy doors will open, thy bonds break.
Often thou losest thyself in sleep,
and yet must find back thy world
again and again.
.....
এই যেমন বলা হয় যে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন— এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। ভিত্তিহীন একটা কথা। দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। যে সম্পর্ক একজন নোবেল বিজয়ী কবি তরুণসমাজের সঙ্গে মেলে দিয়েছিলেন। যার জন্য একটি ছাত্র সাহিত্য সম্পাদক তাকে লিখলে তিনি তার জন্য কবিতা পাঠিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা হলের বার্ষিকী ছিল ‘শতদল’, সেখানেও তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সুতারং আমরা বলবো রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, বিশেষত হলগুলোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
শামীম আজাদ: একটা কথা আমি এখানে যুক্ত করতে চাই। বালিয়াতির জমিদার কিশোরী রায় চোধুরীরর পিতার নাম জগন্নাথ রায়চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা নিয়ে যখন আন্দোলনটা হয় তখন কিন্তু তিনি স্যার সলিমুল্লাহ, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সঙ্গে যোগদান করেছিলেন। তার ঐ উদ্যোগের কারণে তার নামে হলের নামকরণ করা হয়।
সেলিম জাহান: ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই ছাত্রদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১২টি বিভাগ, তিনটি অনুষদ— কলা, বিজ্ঞান ও আইন। কতগুলো বিভাগ সংযুক্ত ছিল যেমন বাংলা এবং সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি। প্রথম বছর ৮৭৮জন ছাত্র ভর্তি হয়।
শামীম আজাদ: অনেক অধ্যাপক কিন্তু বাইরে থেকে এসেছিলেন।
সেলিম জাহান: ড শহীদুল্লাহ, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, মোহিতলাল মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু এরা সবাই বাইরে থেকে আসলেন।
শামীম আজাদ: সত্যেন্দ্রনাথ বসু পদার্থ বিদ্যার প্রধান হলেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি নেপালের রাজদরবারে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা। হাজার বছরের বাংলাভাষার প্রমাণপত্র তিনিই আবিস্কার করেন বৌদ্ধ গান ও দোহার হিসেবে। আমরা জানতে পারি আমাদের বাংলাভাষা এতো পুরানো।
সেলিম জাহান: ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ভর্তি হওয়া মোট ৮৭৮জনের মধ্যে দুইজন নারী শিক্ষার্থী ছিলেন। একজন হচ্ছেন লীলা নাগ, অন্যজন সুষমা সেনগুপ্ত। সুষমা সেনগুপ্ত ছিলেন আইন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নরেশ সেনগুপ্তের কন্যা। আর তিনি ছিলেন অর্থনীতির ছাত্রী।
শামীম আজাদ: প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন ফজিলাতুনন্নেসা— তিনি গণিত বিভাগের ছাত্রী।
সেলিম জাহান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ।
শামীম আজাদ: লর্ড হার্টগকে নিয়ে গল্প আছে। তিনি ছিলেন ইহুদি। তাদের কোন উপাশনা গৃহ ছিল না। তার মতো যারা প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আগলে রেখেছেন তারা নানা প্রতিকুলতার সম্মুখীন হয়েছেন যেমন— নারী শিক্ষার্থী জোগাড় করা, তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা। মেয়েদের থাকার
জন্য প্রথম আবাসিক হল চামেরি হাউজ করা হল। বর্তমানে যেটা সিরডপ এর অফিস, তোপখানা রোডে। জোসেফ হার্টগের স্ত্রীর নাম ছিল মেবেল। তিনি জানতেন আমাদের এখানে নারীদের চলাফেরার বিষয়টি কতটা অনিশ্চিত। তখন তিনি নিজে ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়ে মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এনেছেন, তাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের খাবার ব্যবস্থা করেছেন।
সেলিম জাহান: পরবর্তীকালে কিন্তু তিনি ইংল্যান্ডে ফেরত এসে সোয়াসের প্রতিষ্ঠা করেছেন। বহু মনিষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। প্রথম মুসলিম উপাচার্য হচ্ছেন স্যার এ এফ রহমান। তার নামে একটা হল রয়েছে। শুধুমাত্র উপাচার্য নয়, প্রথম থেকেই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে বিদেশী অধ্যাপক ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ছিলেন পিটার নিউম্যান। ইংরেজি বিভাগে জে এস টার্নার। আমাদের অর্থনীতি বিভাগে ছিলেন জে এস আয়ার— তিনি ছিলেন ভারতীয়। শামীম তুমি মিস এ জি স্টক সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছিলে।
শামীম আজাদ: আমি মূলত তার অনুবাদের কথা বলতে চাইছিলাম। একটা ঘটনার কথা বলি। সম্ভাবত আশির দশকের শেষের দিকে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসলেন ড ক্যারোলাইন ব্রাইট। তিনি ফুলব্রাইট স্কলারশীপ এ ঢাকায় আসলেন, বললেন, নারী কবিদের কবিতা অনুবাদ করবেন। তখন ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন আমাদের বন্ধু সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। তাকে ক্যারোলাইন বললেন একটি কবিতার আক্ষরিক অনুবাদ করতে। তিনি করে দিলেন। তারপর তিনি সেই অনুবাদটি ইংরেজ ভাষাভাষিদের উপযোগী করে করলেন। এরপর আবার তিনি আমাকে এবং মঞ্জুরুলকে নিয়ে বসলেন, তিনি নিশ্চিত হতে চাইলেন যে, কবি তাতে সম্মতি দিচ্ছেন কিনা এবং অনুবাদ করার সময় ক্যারোলাইন মূল থেকে সরে গেছেন কিনা। তিনটি ধাপের যে অনুবাদ প্রক্রিয়া, যাতে সত্যিকার অর্থে যাদের
জন্য ভাবান্তর করা হয় এবং সে ভাষাভাষির জন্য অনুবাদ করা হচ্ছে তার সঙ্গে একটা সংযুক্ততা তৈরি করতে তা সোজা হয়— এই পদ্ধতিটি মিস স্টক প্রথম শুরু করেছিলেন।বলে শুনেছি।
সেলিম জাহান: জে এস টার্নারের ইংলিশ ব্যাকরণ— অনেকেই হয়তো পড়েছেন— আমি বইটি পড়েছি। বইটি পড়লে ব্যাকরণ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে জানা যায়।
শামীম আজাদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগের প্রধানকে এমন এমন জায়গা থেকে আনা হয়েছে যে তারা তাদের ব্যক্তিগত প্রভাব ও অধীত বিদ্যাতে সমৃদ্ধ ছিলেন এবং তারা তাদের বিভাগে সেই প্রভাবটি রাখতেন। পরবর্তী সময়ে আমরা এখন দেখছি এটা এখন অনেকটা রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। ইসলামিক ইতিহাস বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন একজন শামসুল ওলামা। তাকে মাদ্রাসা থেকে আনা হয়েছিল। অর্থাৎ বিশেষজ্ঞদের বেছে বেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান বিভাগের অধ্যক্ষ করা হয়েছিল তখন।
সেলিম জাহান: অর্থনীতি বিভাগ নিয়ে আমরা কিন্তু অনেকে গর্ব করেছি এবং এখনও করি। এ বিভাহে অনেক ছাত্রী পড়েছে এবং পড়ছে। আমাদের সময় দেড়শ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ৫০জন ছাত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রথম নারী শিক্ষক ছিলেন অমিতা চৌধুরী। ১৯৪৫ সালে তিনি যোগদান করেন। পরে আসেন অমিতা রায়। আর একজন ছিলেন ভারতলক্ষী মূখোপাধ্যায়, ১৯৪৮ সালে তিনি যোগদান করেন, পরে দাঙ্গার কারণে তাকে চলে যেতে হয়। আমি বিশেষ করে রেণুকা দাসগুপ্তর কথা বলতে চাই। ১৯৩১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। বীণা দাস এবং শান্তি ঘোষ যখন কুমিল্লার তৎকালীন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্টেট চালর্স জে বি স্টিভেনসের উপর গুলি চালায় তখন রেণুকা দাসগুপ্তকে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত করে অনেক দিন কারাগারে আটক থাকতে হয়েছে। আমি নিজে খুব ব্যক্তিগতভাবে গর্বিত যে আমারই এক শিক্ষার্থী অধ্যাপক নাজমা বেগম তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হন ২০১৪-১৫ সাল থেকে। অর্থনীতি বিভাগের প্রধান প্রথম নারী তিনি। যার জন্য প্রায় একশত বছর সময় লেগেছে।
শামীম আজাদ: লীলা নাগ কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে পাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যাপার তিনি নাছোড়বান্দা ছিলেন। তিনি সিলেটের কন্যা।
সেলিম জাহান: ঢাকার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছেন। শামীম তুমি এবার বল যে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ আলাদা হলো কখন।
শামীম আজাদ: ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু দেখা গেছে যে ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে ব্যবস্থা শুরু হলো। সবগুলো নিয়োগ সম্পন্ন হতে হতে ১৯২১ সালের জুলাই হয়ে গেল। বাংলা ভাষার উপর কিন্তু বিভিন্ন ভাষার প্রভাব রয়ে গেছে। যেহেতু সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত সবগুলো ভাষার সঙ্গে বাংলাভাষার সম্পর্ক আছে সুতরাং সংস্কৃতটা খুব দরকার। কাজেই এটার নাম হলো সংস্কৃত ও বাংলা ভাষা বিভাগ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়েই ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিয়েছেন। ১৯৩৭ অথবা ১৯৩৮ সালে দিকে বিভাগটি আলাদা হয় এবং তখন বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হন ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। আমি মুনীর চৌধুরী স্যারের মুখে শুনেছি বাংলা বিভাগ আলাদা হওয়ার পর ড মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ সংস্কৃত ও পালি বিভাগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। যার জন্য আমরা যখন ১৯৬৯ সালে ভর্তি হয়েছি তখন এ বিভাগ দুটি ছিল।
সেলিম জাহান: উর্দু বিভাগ ছিল, পার্সি বিভাগ ছিল।
শামীম আজাদ: বাংলা বিভাগ আসলে তখন থেকেই সবার দৃষ্টি কেড়েছে ভাষা আন্দোলনের জন্য। তাছাড়া ভাষা আন্দোলনে ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অবদান সর্বজন বিদিত। পাকিস্তান শুরু হওয়ার আগেই কে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করেছিলেন। ড মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ তখন এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ততদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সোচ্ছার হয়ে উঠেছিলেন নিজেদের জাতিস্বত্ত্বা, অস্তিত্ব, আত্নজিজ্ঞাসা নিয়ে। যার কারণে ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন কার্জন হলে বক্তৃতা প্রদানের সময় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করেছিলেন।
সেলিম জাহান: আমি এ পর্যায়ে ভবনগুলো নিয়ে কিছু কথা বলবো। পরবর্তীতে এ প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসবো। প্রথমত, একটি ভবন ছিল সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়ি এবং সেটা ছিল বাংলা একাডেমির পাশে মাঠের মধ্যে। আমি যখন খুব ছোট তখন আমার বাবা বলেছিলন ওখানে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়ি ছিল। আমরা যখন ছাত্র তখন যেখানে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার
মাঠের সামনে দাঁড়ালে বহুদূর থেকে ওই লাল বাড়িটি দেখা যেত। সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন তত্ত্ব প্রদান করেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে বিবেচিত। দ্বিতীয়টি, প্রক্টর বলে একটা পদ আছে। আমরা যখন ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, তখন দেখেছি উপাচার্যের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে প্রক্টর হাউজ। একজন বিখ্যাত প্রক্টর ছিল ড মাজহারুল হক। তার কালো একটা মরিস ফোর্ড গাড়ি ছিল। শামীম কার্জন হলের কথা বলেছে। এটির কিন্তু অনেক রকম ব্যাপার আছে। প্রথমত, দেখার মতো এর স্থাপত্যশৈলী। দ্বিতীয়ত, একসময় কিন্তু সমস্ত পরীক্ষা কার্জন হলে হতো। কলা ভবনের ছাত্র-ছাত্রীরাও সেখানে পরীক্ষা দিতে যেতেন। বুদ্ধদেব বসুর রচনা থেকে জেনেছি তিনি পরীক্ষা দিতেন তার জন্য চা আনিয়ে দিতেন শিক্ষকেরা। ( কারো যদি উৎসাহ থাকে তাহলে বুদ্ধদেব বসুর আমার যৌবন বইটি পড়তে পারেন। তিনি পুরানা পল্টন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন। সেখানে তিনি বলেছেন যে, আমাদের সেই সম্পূর্ণভাবে পুরুষতান্ত্রিক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একমুঠো নারীও ছিলেন। তারা ওই চামেরি হাউজ থেকে বের হতেন এবং সন্ন্যাসিনীর মতো মুখ করে, মুখে কোনো হাসি নেই, একসারিতে তারা সামনে চলতেন আমরা পেছনে চলতাম। আর কার্জন হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দুইবার বলেছিলেন উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। একবার কার্জন হলে এবং অন্যবার রেডক্রস ময়দানে।
শামীম আজাদ: কার্জন হলেই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করে উঠেছিলেন। তখন আমতলা ছিল, মেডিকেল কলেজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা স্থাপনা ছিল, সেজন্য মূল আন্দোলনটা ওখান থেকেই শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনে ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অন্যতম ভূমিকা ছিল।
সেলিম জাহান: এবং মুনীর চৌধুরী।
শামীম আজাদ: মুনীর স্যার যখন যোগ দিলেন এ আন্দোলনে তখন ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনাগুলো আরো আধুনিক হয়ে আসলো।
সেলিম জাহান: কবর নাটকটির কথাই যদি আমরা চিন্তা করি। কত আধুনিক একটা নাটক জেলখানায় বসে লেখা।
শামীম আজাদ: এখন এতোদিন পরে ওই ধরনের নাটক ইংল্যান্ডে আমরা চিন্তা করি। আমি প্রথম যে নাটক লিখেছিলাম বলা হলো নাটকটি এমনভাবে লিখতে হবে যাতে অল্প ক’জনকে দিয়ে করা যায়, তারাই যেন সব ভূমিকা পালন করতে পারে, নাটকটি যেন ভ্রমণ করতে পারে। এতবছর পর যেসব কথা চিন্তা করা হয়েছে কবর নাটকে দেখা যায় কোনো রকম প্রপস লাগে না। দৃশ্য নির্মাণের জন্য ব্যাকড্রপ লাগে না।
সেলিম জাহান: শামীম এটা কিন্তু প্রথমে করা হয়েছিল যারা জেলের মধ্যে রাজবন্দি তারা অভিনয় করবেন।
শামীম আজাদ: জেলের ওই লাইটগুলো নিয়ে করা হয়েছে এবং অন্ধকারে কবরের আবহ তৈরি করে। কত অগ্রসর চিন্তাধারা ছিল।
সেলিম জাহান: খুব কষ্ট হয় মনে। কে লিখেছেন মনে নেই শেষ পর্যন্ত কবর নাটকের রচয়িতা তার নিজের কবরই খুঁজে পেলেন না।
শামীম আজাদ: স্যার যখন জেলে ছিলেন সেখান থেকেই বাংলায় তিনি এমএ পাশ করেন।
সেলিম জাহান: মূলত তিনি ইংরেজির লোক। পরে বাংলায় এমএ করেন। তিনি যোগদানও করেছিলেন ইংরেজি বিভাগে। ইংরেজি বিভাগে যোগদান করার পরে হয় জে এস টার্নার বা এ জি স্টক তাকে বাংলায় আংশিকভাবে পড়াতে নিয়ে আসেন। পরে তিনি বাংলায় আসেন।
শামীম আজাদ: সেটা আমি জানতাম না। এখানে একজন বলেছেন ‘আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ের প্রসঙ্গটি আলোচনা করলে খুশি হব। আর আমাদের বন্ধু সাবু বলছেন সরদার ফজলুল করিমের গ্রন্থের ওপর যদি আলোকপাত করি।
সেলিম জাহান: আমার নিজস্ব মতামত হচ্ছে কোনো প্রবন্ধ বা বইয়ের ওপরে আলোচনা তো স্মৃতিচারণ হবে না, সেটা হবে তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক আলোচনা। আরেকটি কথা বলতে চাই কলকাতা থেকে অনেকে আমাদের নিমন্ত্রণ করেছেন। শামীম এবার তুমি বলো।
শামীম আজাদ: কলকাতায় সবকিছুর উৎস যেহেতু তখন অবিভক্ত বাংলা ছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের গ্রন্থি আসলে অটুট। বেগম রোকেয়ার স্কুল, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, তার নামে তারা এত কাজ করে চলেছেন। নজরুলের নামে সড়ক আছে অবিরত কাজ করে চলেছেন। যখন বাংলা ভাষার কথা বলি এইসব মনীষীদের কখনোই মুসলমান-হিন্দু, তারা কোন ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে বসবাস করেন, কোন দেশের নাগরিক সেগুলো ভাবলে হবে না। মুজতবা আলী এত অবদান রেখে গেছেন কিন্ত বাংলাদেশে তার মূল্যায়ন কি আমরা করতে পারলাম? আমরা কিন্তু সেই কূপমন্ডুকই থেকে গেলাম। নানান জিনিস বিচার করে গুণীর গুণের কদর আমাদের দিতে হবে এবং যার যা অবস্থান তা সত্যিকার অর্থে বলতে হবে। বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতে যিনি যে অবদান রেখে গেছেন ইতিহাসে তা স্বীকৃত। আমরা তাদের আমাদের ক্ষুদ্রমনস্কতা দিয়ে আটকে ফেলি। তাদের পায়ে শিকল দিয়ে দেই। তাহলে কিন্তু আমরাই বঞ্চিত হই।
সেলিম জাহান: এটা ঠিক। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের কথা বলছি সেখানে বেশ কিছু মানুষ, বেশ কিছু জ্ঞানতাপসকে আমাদের শিক্ষক নয় কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তারা এসেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে গবেষণা হয়েছে সেই গবেষণা পরিপুষ্ট হয়েছে। এবং আমরা আরেকটি ব্যাপার দেখেছি সেটা হল ইতিহাসের একটা বিরাট অঙ্গ কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়, আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। শামীম তুমি ভাষা আন্দোলনের কথা বলেছ। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক আন্দোলন, নির্বাচন যখন হয়েছে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এই যে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৬২ সনে হামদুর রহমান কমিশনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সেটা দেখেছি। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা এবং তার পরে ১১ দফার আন্দোলন দেখেছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে জেলখানা থেকে নিয়ে আসার ব্যাপারে সেটাতে আমরা দেখেছি। উনসত্তর এর গণআন্দোলন যেখানে আমরা আবার পঞ্চাশ বছর পরে ফেরত আসছি।
শামীম আজাদ: বঙ্গবন্ধুর চার নীতির থেকেই তো আমরা সরে গেছি। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর আমরা যতদূর পিছিয়ে গেলাম তারপরে আবার তার ধারাবাহিকতায় একুশে আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি কন্যা আক্রান্ত হলেন। একুশে আগস্টের পরবর্তী সময়ে তো বিভিন্ন সময়ে জাতিকে পিছিয়ে নেয়ার নানা চেষ্টা হয়েছে। আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়, কোনো দেশ জাতি-গোষ্ঠী আসলে শুধুমাত্র নেতা-নেত্রী এগিয়ে নিতে পারেন না। জনগণ যতক্ষণ পর্যন্ত সেই সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়। তো এতদূর সরে আসার কারণগুলো নিজেদেরই দেখতে হবে। এখনও আসলে আমাদের হাত থেকে ঘুড়ির সুতো চলে যায়নি। আমরা কিন্তু ঘুড়ির সুতো আমাদের হাতেই ধরে রেখেছি। তাহলে প্রত্যেকেই ঘরে ঘরে স্বাধীনতার যে স্বপ্নবীজ, মূলমন্ত্র, দেশপ্রেম ছিল; আমি বারবার বলি দেশপ্রেমটাকে ধর্মের মত শিক্ষা দিতে হবে। কারণ জন্মগ্রহণ করলেই কিন্তু কেউ মানবিক ধর্মে দীক্ষিত হয় না। মা-বাবা যদি না শেখায়। তেমনি করে দেশকে ভালোবাসা কথাটিকেও ওভাবে শেখাতে হবে।
সেলিম জাহান: একদম। এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা যখন উনসত্তরে এসেছি তখন উপাচার্য হিসেবে বোধ হয় এম ওসমান গনি সাহেব চলে গেছেন। আমরা আবু সাঈদ চৌধুরীকে সত্তরে পেয়েছি তাই না? তিনিই আমাদের প্রথম উপাচার্য হয়ে এসেছিলেন।
শামীম আজাদ: কি চমৎকার বক্তৃতা দিতেন। এবং তাকে উপাচার্য হিসেবে পেয়ে আমরা তো অনেক আনন্দিত। এ কারণে আসলে মুক্তিযুদ্ধ যে হয়েছে এই লন্ডনে। লন্ডন ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের পর অন্যতম ঘাঁটি। এই ঘাঁটি কিন্তু সবসময়ই লন্ডন। লন্ডনে সব ষড়যন্ত্র হয়, ভালো কাজও হয়। বঙ্গবন্ধুও লন্ডন হয়ে দেশে ফিরেছেন। এবং আবু সাঈদ চৌধুরী, জাকারিয়া চৌধুরী এরা তখন একাত্তরের সময়ে এই লন্ডনেই এখানকার আন্দোলনের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
সেলিম জাহান: রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতাকরেছিলেন এরকম যেমন একটা কথা রয়েছে তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে মুসলমানদের কোনো অবদান নেই এখন একটা কথা উত্থাপিত হয়েছে ।
শামীম আজাদ: স্যার সলিমুল্লাহই তো মুসলমান।
সেলিম জাহান: আমার মনে হয় এটার আরও গবেষণা হওয়া দরকার। কারণ যেটা প্রচলিত কথা, প্রচলিত ইতিহাস আমরা তার বিরোধিতা করছেন অনেকে। সেখানে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কথা বলছেন অনেকে। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমার পিতাও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একেবারে প্রত্যক্ষ ছাত্র। যখন তিনি সবে মাত্র অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির ছাত্র হিসেবে লন্ডন থেকে ফেরত গেছেন। ফজলুল হক হলের পাশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাস হত। আমার বাবা প্রত্যক্ষ শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মুখে আমি শুনেছি।
শামীম আজাদ: তোমাকে উনি যেন কী বলে ডাকতেন?
সেলিম জাহান: প্রথমে আমি আহমদ ছফা ভাইয়ের কথা বলে নি। ছফা ভাইকে উনি বলতেন মৌলভী আহমেদ ছফা। আমরা ছফা ভাইকে ক্ষ্যাপাতাম এই বলে যে, উনি ‘মওলানা’ অর্থে ‘মৌলভী’ নয় বলছেন না আপনাকে। ছফা ভাই খুব সাদাসিধে মানুষ ছিলেন, বলতেন তাহলে কী অর্থে বলেছেন? আমরা বলতাম আপনি আসলে ‘মৌ-লোভী’। এটা বলে আমরা খুব হাসতাম। আর আমাকে উনি বলতেন ‘জনাব সেলিম জাহান’। তার এই ‘জনাব’ এর অর্থটা আমি ঠিক জানি না। আমার যেটা কথা হচ্ছে যেহেতু আমরা এখানে একটা বিতর্কিত বিষয় উপস্থাপন করেছি...
শামীম আজাদ: বিতর্কিত কি?
সেলিম জাহান: এই যে অনেকে বলছেন যে, ‘মুসলমানরা কোনো জমি দেয়নি, রমনার পুরো এলাকাটা খাস জমি ছিল। সুতরাং কোনো জমি দান করা হয়নি। ষাট লক্ষ টাকা সরকারের কাছে গেছে। সরকার কিছু দেইনি। তাই আমি মনে করি এটার আরও গবেষণা হওয়া দরকার। এর একটা ভিত্তি নিশ্চিয়ই আছে। সেই ভিত্তিটি কি— সেটা আমাদের খোঁজ করে দেখা দরকার। এ এফ রহমান সাহেব প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন— সে ইতিহাসও আমরা দেখতে পারি। গবেষকদের উচিত, এই একশ বছরের ইতিহাসের নানান তথ্য বের করা । একটি তথ্য আমি বলতে পারি। অনেকেই বলেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী অধ্যাপক যারা ছিলেন তাদের অনেকেরই একটা বিদ্বেষ ছিল। এ বিষয়ে সবসময় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ নিউম্যানের নাম করা হয়। যারা সেই সময়কার ছাত্র, অধ্যাপক তারা এটা ভালো বলতে পারবেন। এমনকি নিউম্যানের কারণেই কিন্ত রাজ্জাক স্যারকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদালয়ে এ ধরণের একটা বিদ্বেশিপনা সৃষ্টি করা এবং প্রথম শ্রেণী দেওয়ার ব্যাপারে তার অনীহা — এ ধরণের প্রচুর বিষয় কথিত রয়েছে। তাই আমার মনে হয়ে বিষয়গুলো ঘিরে গবেষণা হওয়া দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ বছরে পদাপর্ণ উপলক্ষে শুধু স্মৃতিচারণা নয়, আমার মনে হয় ইতিহাস নিয়েও গবেষণা হওয়া দরকার।
শামীম আজাদ: এগুলো যদি গবেষণা না হয় তাহলে এগুলোকে খন্ডন করা বা রক্ষণ করা যাবে না। আমরা যেমন উইকিপিডিয়া দেখি, এটি কিন্তু পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। আর অন্তর্জালে পেলেই তা সত্যি। সঠিক ইতিহাস গবেষণা করে দেখা যেতে পারে। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে অনেক কিছুই আছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন আর্কাইভে রয়ে গেছে।
সেলিম জাহান: আমার মনে হয় গবেষণা করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে আনা দরকার।
শামীম আজাদ: কার্জন হলের কথা বলি। ওখানের বাগানটা দারুণ। অক্সফোর্ডের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সুন্দর বাগান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাগান খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেমেয়েরা সবুজের মধ্যে বসে পড়াশুনা করছে, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছে, এই আলোচনাগুলোই কিন্তু ডালপালা মেলে।
সেলিম জাহান: এ জি স্টকের একটি বই আছে ‘দ্য মেমোরিস অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি’ নামে বইটি বাংলাতে অনুবাদ করেছেন মোবাশ্বেরা খানম। আমার মনে হয় এটা বড় রকমের তথ্য সমৃদ্ধ একটি পুস্তক।
শামীম আজাদ: কার্জন হলের বোটানির ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু বলধা গার্ডেনে যেত। অনেক বিরল গাছ সেখানে ছিল।
সেলিম জাহান: বলধা গার্ডেনের জমিদারের পুত্র এখানে আত্নহত্যা করেছিল বা নিহত হয়েছিল। কথিত আছে বলধা গার্ডেনের জমিদার গান শুনতে খুব পছন্দ করতেন, প্রতিভা বসুর জীবনের জলছবি বইয়ে আছে যে, যখন তিনি বালিকা, বয়স ১২ কিংবা ১৩ বছর তখন তার গান-শোনার জন্য ওই জমিদার বাড়িতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রতিভা বসুর ভাষ্যেই আমি জেনেছি জমিদার বাবু খুব সাদাসিধে মানুষ ছিলেন, লুঙ্গী পরে থাকতেন।
শামীম আজাদ: দ্বিজেন দা (দ্বিজেন শর্মা) তো বোটানির ছাত্র ছিলেন। তুমি তো তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছো। তার লাগানো একটা নাগকেশর গাছ বোধহয় বরিশালে আছে।
সেলিম জাহান: ১৯৬৯ সালে তিনি বরিশালে যান। তিনি একদিন আমার বাবাকে বললেন বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ তিনি সবুজে সবুজ করে দিবেন। গাছপাগল এই মানুষটি নানা রকমগাছ বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়েছেন। আমি তখন ছোট। ১০ বছর বয়। গাছ লাগানো দেখতে গেছি। নাগকেশর, একাসিয়া, অর্কিড এ রকম অনেক গাছের নাম শুনছি। একদিন বললাম আমি একটা গাছ লাগাই। তিনি বললেন, তুই গাছের কি জানিস, গাছ লাগানো এত সোজা না। এই কথা বলে বোধহয় তার খারাপ লেগেছিল। তারপর আমাকে গাছ লাগাতে দেওয়া হলো। মাটিতে গর্ত করা হলো। আমি গাছ লাগালাম। ওটা ছিল একাসিয়া গাছ। এটি রোপন করা হলো ঠিক মেয়েদের কমনরুমের সামনে। বহুবছর পর যখন তার সঙ্গে আমার দেখা তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার একাশিয়া গাছের খবর কী। আমি বললাম, আমি তো জানি না তবে আমি আমার মেয়ে বন্ধুদের বলেছি যে এ গাছটি কিন্তু আমার লাগালো। ওরা কেউ আর বিশ্বাস করেনি। ’
শামীম আজাদ: গাছটি কী এখানো আছে।
সেলিম জাহান: হ্যাঁ, আছে।
লেখক পরিচিতি
শামীম আজাদ: একজন কবি, লেখক ও গল্পকথক। তিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। সত্তরের শকে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ শামীম তরফদার নামে প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে ফ্যাশন সাংবাদিকতার। যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষায় তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি।
সেলিম জাহান: একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দুয়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেনের পরিচালক ও মুখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দুই দশক ধরে। ইংরেজি ও বাংলায় তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এক ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক।
শ্রুতলিখন: রুহিনা ফেরদৌস ও রাইসা জান্নাত