সময়ের সাথে

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও তার আন্তর্জাতিক পটভূমি

আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। জনগণের সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা সেদিন বিজয় অর্জন করেছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশে মুষ্টিমেয় দালালরা ছাড়া সবাই নিঃশঙ্কচিত্তে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেই চির উজ্জ্বল আনন্দময়

আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। জনগণের সেই মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা সেদিন বিজয় অর্জন করেছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশে মুষ্টিমেয় দালালরা ছাড়া সবাই নিঃশঙ্কচিত্তে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেই চির উজ্জ্বল আনন্দময় বিজয় দিবস আজ আরেকবার আমাদের দ্বারে সমাগত। এই সময় স্বাভাবিকভাবেই আমরা পেছনের ইতিহাসের দিকে তাকাই। আমরা যে বিজয় অর্জন করেছিলাম সেই বিজয়ের বিশ্লেষণ করি, ওইদিনের মতো আপ্লুতভাবে হয়তো নয়, হয়তো কিছুটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে। সেই যুদ্ধে আমাদের সুস্পষ্ট শত্রু-মিত্র ছিল। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে, কিন্তু অতীতকে সত্যভাবে তুলে না ধরলে বা ভুলে গেলেই ইতিহাস পাল্টে যায় না। তাই মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কারা আমাদের পক্ষে ছিলেন, কারা আমাদের বিরুদ্ধে ছিলেন, আমাদের শক্তির দিক, আমাদের দুর্বলতার দিক, আমাদের শিক্ষার দিক—এগুলো নিয়ে আমাদের সঠিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বারবার নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, যাতে তারা সত্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

আজকে আমরা এ প্রবন্ধে বিজয় দিবসের আন্তর্জাতিক শত্রু-মিত্রের বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখে তার সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করব। যদি সেদিক থেকে দেখতে চাই, তাহলে প্রথমেই বলতে হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, দেশের ভেতরেই। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন—এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বললেন এবং পথও দেখিয়ে দিলেন। যদি দাবিদাওয়া না মেনে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে, তাহলে আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করতে হবে। সেটার জন্য আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে বয়কট করতে হবে, তাদের ভাতে মারতে হবে, পানিতে মারতে হবে ইত্যাদি। তখনই কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ২ মার্চ হানাদারদের আক্রমণের পর প্রতিরোধ যুদ্ধ দেশের ভেতরেই প্রথম সূচিত হয়, নিরস্ত্র বাঙালিরা যার হাতে যা কিছু আছে তা নিয়েই প্রতিরোধ শুরু করে।

৭ মার্চের পর কার্যত রাষ্ট্রের সব নিয়ন্ত্রণভার বাঙালির হাতে চলে আসে। ৩২ নম্বর রোড থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচর তাজউদ্দীন আহমদ তখন যাবতীয় প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করছিলেন। যদিও পাশাপাশি আলোচনার সূত্র তখনো ছিন্ন হয়ে যায়নি। একটি টান টান উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশ তখন এক পা এক পা করে স্বাধীনতার দিকে এগোতে থাকে। কিন্তু ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী একটি জঘন্য গণহত্যার নকশা প্রণয়ন করে। সেটা হলো অপারেশন সার্চলাইটের ডিজাইন। তারা ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঞ্জাবি সৈন্য এনে টিক্কা খানকে দায়িত্ব দিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তারা বিশ্বাস করত ও ভাবত, তারা যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালিদের মারতে পারে, হত্যা করতে পারে, গণহত্যা করতে পারে তাহলে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। গণহত্যার একটি বৈশিষ্ট্য হলো তখন আর বাছবিচার করা হয় না; কে অপরাধী, কে যুদ্ধ করছে, কে প্রতিরোধ করছে সেটা বিচার না করে সব ধরনের লোকদের বা একটি সমগ্র জাতি অথবা এথনিক গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। সে অর্থে আমাদের দেশে ২৫ মার্চ থেকে সত্যিই একটা গণহত্যা চলছিল।

কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী যখন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন বিডিআর ও আর্মির একটি অংশ মিলে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। এরপর আমাদের সমগ্র জাতি গণযুদ্ধ শুরু করে। এই গণযুদ্ধটা শুরু করে আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের একটা পশ্চাদভূমি লাগবে। একটা আশ্রয়স্থল লাগবে। সেই আশ্রয়স্থলও আগে থেকেই তৈরি ছিল। আপনারা আগরতলা ষড়যন্ত্রের কথা জানেন। আগরতলা ষড়যন্ত্রে শেষ মুজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বাংলাদেশকে ভারতের সহযোগিতা নিয়ে স্বাধীন করতে চান, বিচ্ছিন্ন করতে চান। আগরতলায় ভারতের সঙ্গে তার একটা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—তাদের সহায়তা নিয়ে তিনি এটা করতে চান। পরে বঙ্গবন্ধু বলেছেন এ ধরনের কিছু অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ তিনি আগে থেকেই করে রেখেছিলেন। যাই হোক আমরা জীবন রক্ষার তাগিদেই প্রায় ১ কোটি শরণার্থী তখন একটা পশ্চাদভূমির প্রয়োজন বোধ করলাম। যেখানে গিয়ে আমরা আশ্রয় নেব, যেখানে আমাদের ঘাঁটি তৈরি হবে, যেখানে আমরা প্রশিক্ষণ নিতে পারব, নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করে দেশে এসে ধীরে ধীরে মুক্ত এলাকা গঠন করব। দেশকে হানাদারমুক্ত করা। যেমন মাও সেতুংয়ের চীনে ঘটেছে। চারদিকে মুক্ত এলাকা তৈরি করতে করতে শহরকে গ্রাম দিয়ে ঘেরাও করে পরে শহরে গিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। আমাদের এখানেও মুক্তিযুদ্ধের ডিজাইনটা অনেকটা এমনই ছিল। আমরা বাংলাদেশের চার প্রান্ত থেকে অগ্রসর হয়ে ঢাকা দখল করে দেশকে স্বাধীন করব। এ রকম একটা গণযুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে আমরা গেরিলারা যারা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম, তারা ভারতে চলে যাই এবং প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করি। সে অর্থে বলতে হবে, শুরু থেকেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুধু জাতীয় সহায়তায় কিংবা জাতীয় কাঠামোর মধ্যে এবং জাতীয় শত্রু বা জাতীয় মিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাদের আন্তর্জাতিক শত্রু ছিল এবং আন্তর্জাতিক মিত্র ছিল। পাকিস্তানেরও আন্তর্জাতিক মিত্র ছিল, শত্রুও ছিল। এজন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কী প্রতিক্রিয়া হলো, সেটা একটু খতিয়ে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত আমরা জানি যে পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রটা আমেরিকার সঙ্গে গভীরভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল। তারা মার্কিন সামরিক জোট সিয়াটোর (সাউথ ইস্ট ট্রিয়েটি অর্গানাইজেশন) সদস্য ছিল, তারা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ নিয়ে গঠিত সেন্টোর সদস্য ছিল। পাকিস্তান প্রথম থেকেই আমেরিকার ও যুক্তরাজ্যের সামরিক জোটের সদস্য ছিল। পক্ষান্তরে ভারত কিন্তু কোনো বিশেষ সামরিক জোটের সদস্য হয়নি। আমেরিকানদের সিয়াটোরও নয়, যুক্তরাজ্যের সেন্টোরও নয়, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে ওয়ারশ নামক সমাজতান্ত্রিক সামরিক জোট ছিল সেটারও তারা সদস্য ছিল না। তাদের নীতিটা ছিল নেহরুর কথা অনুযায়ী, সক্রিয় জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। সক্রিয় জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি মানেই হলো আমরা কোনো যুদ্ধ জোটে যুক্ত হব না। আমরা তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশ রয়েছি যারা পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক শিবিরভুক্ত নই তাদের নিয়ে গঠিত হবে জোটনিরপেক্ষ দেশের জোট (অ্যালায়েন্স অব নন-অ্যালাইন্ড কান্ট্রিজ)। বিশেষ করে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনটা তৈরি হয়েছিল মার্শাল টিটো, নেহরু, নাসের, সুকর্ন, নক্রুমা এবং অন্যান্য যেসব এশিয়া-আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার জাতীয়তাবাদী নেতারা ছিলেন তাদের দ্বারা; যারা সমাজতন্ত্রও না ধনতন্ত্রও না, মাঝামঝি মিশ্র অর্থনীতির গণতান্ত্রিক দেশ ছিলেন; আবার তারা উপনিবেশ, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদেরও বিরোধী ছিলেন। অর্থাৎ তারা নিজের দেশের শাসনটা আমেরিকার হাতেও দেবেন না, সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতেও দেবেন না। সেই সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে মিলেই এ সক্রিয় জোটনিরপেক্ষ নীতির অভ্যুদয় হয়। অর্থাৎ যদি কোনো সাম্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যবাদী বৃহৎ শক্তি কোথাও কোনো হস্তক্ষেপ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে তারা থাকবেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তারা সোভিয়েতের পেটের মধ্যে কখনো ঢুকবেন না। কিন্তু ঐতিহাসিক ও সাধারণভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত দেশগুলোর বন্ধুত্বটা বেশি হয়ে যায়, কারণ সাম্রাজ্যবাদই ছিল তাদের প্রধান শত্রু। স্বাধীন জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর সঙ্গেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বন্ধুত্ব সেই সূত্রেই বেড়ে যায়।। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন চাচ্ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক প্রভুর অধীনে যে দেশগুলো আছে, সেই দেশগুলো যাতে ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তাদের সঙ্গে আসে। এবং তাদের স্বাধীন অর্থনীতিকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারা সহযোগিতাও করেছিল। আপনারা জানেন যে নেহরুর আমলে বিভিন্ন যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হয়েছে, সেখানে কিন্তু প্রচুর পরিমাণে সোভিয়েত সাহায্য ছিল। ভিলাই ইস্পাত কারখানাও তারা ভারতকে তৈরি করে দিয়েছিল। সুতরাং এক অর্থে বলা যায়, বহুদিন ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কংগ্রেসশাসিত ভারতের একটা সুসম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের একটা দীর্ঘ সুসম্পর্ক ছিল। এমনকি সোহরাওয়ার্দীসহ আওয়ামী লীগেরও অনেকেই ছিলেন আমেরিকার প্রতি দুর্বল। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার শত্রু ভূমিকা এক্ষেত্রে তীব্র টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছিল।

আমেরিকার তখন আরেকটি স্ট্র্যাটেজি ছিল, চীন সমাজতান্ত্রিক দেশ হলেও চীনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের শিবির থেকে আলাদা করে নিজের দিকে নিয়ে আসা। চীনও চাচ্ছিল আমেরিকা যাতে চীনের বিরুদ্ধে আরোপিত ২০ বর্ষব্যাপী (১৯৫০-৭০) অব্যাহত অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। পুরো ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল প্রথমবারের মতো ১৯৭০ সালে চীন ও আমেরিকার মধ্যে টেবিল টেনিস দলের আদান-প্রদানের মাধ্যমে। এজন্য সে সময়ের একটা বিখ্যাত কথা চালু আছে পিং পং পলিটিকস বা পিংপং ডিপ্লোমেসি বা পিং পং কূটনীতি। মাও সেতুং তখন চীনের নেতা। অবশ্য সম্ভবত স্তালিনের মৃত্যুর পর থেকেই অর্থাৎ ১৯৭০-এর অনেক আগে থেকেই মাও সেতুংসহ চীনের নেতারা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেল তখন চীন ও আমেরিকা স্বাভাবিকভাবেই একত্রভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, যেহেতু ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পক্ষে এবং তারা উভয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সেহেতু তারা পাকিস্তানের পক্ষে থাকবেন। ফলে খুব সহজেই একটা ইকুয়েশন তৈরি হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ একদিকে। আর অন্য পাশে রয়ে যায় চীন, আমেরিকা ও পাকিস্তান। এই ইকুয়েশনটা না বুঝতে পারলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক শত্রু-মিত্র ঠিকভাবে বোঝা যাবে না। (চলবে)

 

এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান

আরও