করোনা

অ্যান্টিবডি থেরাপি বিষয়ক ভাবনা

নভেল করোনাভাইরাসে এরই মধ্যে বিশ্বে মারা গেছে ১৩ লাখ মানুষ। আর আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ কোটিরও বেশি। এই যখন অবস্থা তখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে একটি সফল করোনা টিকা বা ভ্যাকসিনের দিকে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো টিকা বা ভ্যাকসিনই যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন—এফডিএর অনুমোদন পায়নি। টিকার অনুমোদন না পাওয়া গেলেও ‘অ্যান্টিবডি থেরাপি’ বা অ্যান্টিবডি চিকিৎসার অনুমোদন দিয়েছে এফডিএ। ৯ নভেম্বর কভিড-১৯ চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে বিশ্বের নামকরা ওষুধ কোম্পানি ইলাই লিলির (Eli Lilly) তৈরি ‘বামলানিভিমাব’ (Bamlanivimab) নামের ওষুধকে জরুরি প্রয়োজনে অ্যান্টিবডি থেরাপি হিসেবে প্রয়োগের অনুমতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ।

নভেল করোনাভাইরাসে এরই মধ্যে বিশ্বে মারা গেছে ১৩ লাখ মানুষ। আর আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ কোটিরও বেশি। এই যখন অবস্থা তখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে একটি সফল করোনা টিকা বা ভ্যাকসিনের দিকে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো টিকা বা ভ্যাকসিনই যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন—এফডিএর অনুমোদন পায়নি। টিকার অনুমোদন না পাওয়া গেলেও ‘অ্যান্টিবডি থেরাপি’ বা অ্যান্টিবডি চিকিৎসার অনুমোদন দিয়েছে এফডিএ। ৯ নভেম্বর কভিড-১৯ চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে বিশ্বের নামকরা ওষুধ কোম্পানি ইলাই লিলির (Eli Lilly) তৈরি ‘বামলানিভিমাব’ (Bamlanivimab) নামের ওষুধকে জরুরি প্রয়োজনে অ্যান্টিবডি থেরাপি হিসেবে প্রয়োগের অনুমতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ । 

এই অ্যান্টিবডি থেরাপিকে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপি নামেও ডাকা হয়। এ পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্ট ভাইরাস (কভিড-১৯) প্রতিরোধে সক্ষম কৃত্রিম অ্যান্টিবডি পরীক্ষাগারে তৈরি করে তা ইনজেকশনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এটি মূলত পরীক্ষাগারে তৈরি বিশেষ অ্যান্টিবডি, যা বিশেষ সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হয়। যেহেতু অ্যান্টিবডি বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো হয়, তাই এ পদ্ধতিকে প্যাসিভ ইমিউনিটিও বলা হয়।   

আমরা যে প্লাজমা থেরাপির কথা জানি, সেটা এবং এই মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপির মূলনীতি একই। প্লাজমা থেরাপিতে কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে যাওয়া মানুষের শরীরে যে বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা প্লাজমা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অসুস্থ রোগীর শরীরে প্রবেশ করানো হয়। আর মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপিতে কৃত্রিমভাবে কিংবা পরীক্ষাগারে তৈরি বিশেষ অ্যান্টিবডি অসুস্থ রোগীর শরীরে প্রবেশ করানো হয়। যেহেতু সব রোগীর চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট প্লাজমা পাওয়া যায় না, আধুনিক মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপি এ শূন্যতা পূরণ করতে পারে বলে ধারণা অনেকের।  

মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপিতে অ্যান্টিবডি ইনজেকশন তাত্ক্ষণিকভাবে ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা দিয়ে শরীরকে ক্ষমতাশালী করে। যারা সংক্রমণের প্রাথমিক ধাপে থাকেন, তাদের জন্য এ চিকিৎসা পদ্ধতি চিত্র পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিতে পারে বলে মত বিজ্ঞানীদের। গত অক্টোবরে করোনায় আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিকিৎসায় মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপি ব্যবহার করা হয়েছিল। 

মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপি এর আগে অন্যান্য রোগের চিকিৎসায়ও কাজ করেছে। এইচআইভি/এইডস, অ্যাজমা, লুপাস, ইবোলা ও কয়েক প্রকারের ক্যান্সারের চিকিৎসায় মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপি রয়েছে। 

তবে এক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় হলো চিকিৎসা খরচ। টিকা বা ভ্যাকসিনের চেয়ে অ্যান্টিবডি থেরাপির খরচ বেশি। আবার অ্যান্টিবডি থেরাপি টিকা বা ভ্যাকসিনের চেয়ে কম দিন সুরক্ষা দিতে পারে। অ্যান্টিবডি থেরাপির সুফল মাত্র এক থেকে দুই মাস কার্যকর থাকে বলে জানা যায়। তবে কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে মূল আশার জায়গাটি হচ্ছে, অ্যান্টিবডি থেরাপি করোনাভাইরাসের মৃদু উপসর্গকে মারাত্মক রূপ ধারণ করা থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু কভিড-১৯-এর মারাত্মক অবস্থার ক্ষেত্রে এ ধরনের চিকিৎসা থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা পাওয়ার আশা সামান্য। আর তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুলভ করোনা টিকা বা ভ্যাকসিন না পাওয়া যাওয়া পর্যন্ত করোনাভাইরাস চিকিৎসায় প্রাথমিক অবস্থায় এ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।  

এফডিএ জানায়, ১২ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মৃদু বা মাঝারি উপসর্গের জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ইলাই লিলির তৈরি বামলানিভিমাব ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বামলানিভিমাব নামের এ ওষুধ পরীক্ষার প্রাথমিক ফল থেকে জানা যায়, কভিড-১৯ নিরাময়ে এটি বেশ দ্রুত কাজ করে এবং মৃদু ও মাঝারি মাত্রায় আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে না। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রে এটি তেমন কাজ করে না। 

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এরই মধ্যে এই ওষুধ কেনার ব্যাপারে ইলাই লিলির সঙ্গে সাড়ে ৩৭ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করেছে। তবে ট্রাম্প অসুস্থ থাকাকালীন তাকে ইলাই লিলির বামলানিভিমাব দেয়া হয়নি, বরং ট্রাম্পকে রেজেনারোন ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি পরীক্ষাধীন অ্যান্টিবডি ওষুধ দেয়া হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানটিও তাদের ওষুধ জরুরি প্রয়োজনে অনুমোদনের জন্য এফডিএ বরাবর আবেদন করেছে। 

কভিড-১৯-এর চিকিৎসায় এর আগে কেবল রেমডেসিভির ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিল এফডিএ। রেমডেসিভির নামের ওষুধ কিছু রোগীর হাসপাতালে থাকার সময়কালকে সংক্ষিপ্ত করেছে বলে জানা যায়, কিন্তু এটা দামি এবং এর স্বল্পতাও রয়েছে। তবে গুরুতর অসুস্থ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ক্ষেত্রে ডেক্সামেথেসোনসহ অন্য কিছু স্টেরয়েড ব্যবহারের অনুমতিও আছে। 

অবশ্য কভিড-১৯ চিকিৎসায় অ্যান্টিবডি চিকিৎসার ভূমিকা এখনো প্রশ্নাতীত নয়। বার্তা সংস্থা এপি জানায়, বামলানিভিমাব ওষুধটি কতটুকু নিরাপদ ও কার্যকর, তা নিয়ে এখনো পরীক্ষা চলছে। 

তবে একথা বলাই যায়, এখন পর্যন্ত যেহেতু নভেল করোনাভাইরাসের কোনো টিকা বা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি, আর তাই করোনা মোকাবেলায় অ্যান্টিবডি চিকিৎসায় আপাত ভরসা রাখতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা। 


মু. মাহবুবুর রহমান: ফার্মাসিস্ট, নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

আরও