আশির দশক ছিল বাংলদেশের অর্থনীতির জন্য একটা ক্রান্তিকাল। মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র তিন শতাংশ বা তার চেয়েও কম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল তিন মাসের আমদানির জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কম, অর্থাৎ বিপৎসীমার কাছাকাছি। রাজস্ব আয় ছিল সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ১৯৮২-১৯৯০ এ দীর্ঘসময়ের এরশাদ সরকারের দুর্নীতিপূর্ণ ও স্বৈরাচারী শাসন অর্থনীতিকে খাদের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিরপেক্ষ ‘কেয়ার টেকার সরকার’ পরিচালিত নির্বাচনে বিজয়ী তদানীন্তন গণতান্ত্রিক সরকার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ন্যায় দাতা সংস্থাসমূহের কাছে বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্য ও বাজেট সহায়তার জন্য দ্বারস্থ হয়। ইতিপূর্বে সরকারকে প্রদত্ত সহায়তার অভিজ্ঞতা থেকে দাতা সংস্থাসমুহ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, অর্থনীতিতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার করা না হলে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য ও বাজেট ঘাটতির ন্যায় সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এ ছাড়াও সে সময় বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশসমুহে অর্থনীতির উদারীকরণের হাওয়া বইছিল এবং দেশসমুহ তা থেকে উপকার পেতে শুরু করেছিল। দাতা সংস্থারা বাংলাদেশকেও সংস্কারের এ ধারায় শামিল হতে অনুরোধ জানায়।
সঙ্গীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, তদানীন্তন সরকারের কাছে দাতা সংস্থার পরামর্শ গ্রহণ করা ছাড়া কোন বিকল্প ছিলনা। আবার দাতা সংস্থাসমূহের সহায়তার কঠিন শর্তসমুহ পূরণ করা ও দেশের অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যাচাই করাও ছিল একটি দুরুহ কাজ। এ ছাড়াও বিদ্যমান ব্যবস্থা কায়েমি স্বার্থবাদীদের জন্য অনুকূল ছিল বিধায় সংস্কার কার্যক্রমের জন্য আমলাতন্ত্র বা রাজনীতিবিদরা কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। এ অবস্থায় তখনকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগসমূহ এগিয়ে আসে। দাতা সংস্থাসমুহের প্রস্তাবসমুহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে জাতীয় স্বার্থে সুপারিশ প্রণয়ন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জরুরিভাবে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হয়।
মূলত তিনটি ঋণ সহায়তা চুক্তির আওতায় এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয়। সেগুলো হল- (১) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বর্ধিত কাঠামোগত সংস্কার সুবিধা (ইসাফ); (২) বিশ্বব্যাংকের সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় ঋণ (পিআরএমএসি) ও (৩) শিল্প খাত সমন্বয় ঋণ (আইসাক)-২।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বর্ধিত কাঠামোগত সংস্কার সুবিধার আওতায় সরকারী ব্যয়ের রাশ টেনে ধরে সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশ নির্ধারণ, কর ও জিডিপির প্রতিবছর দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মূল্য সংযোজন কর প্রবর্তন করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় ঋণ এর আওতায় প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করা হয়। ব্যক্তি করদাতার জন্য সর্বোচ্চ প্রান্তিক করের হার ৫৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে পর্যায়ক্রমে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়, স্ব-নির্ধারণী আয়কর ব্যবস্থা প্রবর্তন ও কর স্তরের সংখ্যা ৭টি থেকে ৪টি তে হ্রাস করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের শিল্পখাত সমন্বয় ঋণের আওতায় দুটি প্রধান সংস্কার সাধিত হয়। এর একটি হলো অ-শুল্ক বাধা অপসারণ। তখন প্রায় সবকিছু আমদানি করতেই লাইসেন্স লাগতো। অর্থাৎ প্রায় সব পণ্যই ছিল আমদানি-সীমিত অথবা আমদানি নিষিদ্ধ। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করে সকল আমদানি পণ্যকে তিনভাগে ভাগ করা হয়ঃ (১) দীর্ঘ আমদানি-উন্মুক্ত পণ্য তালিকা, অর্থাৎ পূর্বানুমতি ছাড়াই ব্যাংকের মাধ্যমে এসব পণ্য আমদানি করা যাবে; (২) ছোট আমদানি-সীমিত পণ্য তালিকা, অর্থাৎ এসব পণ্য আমদানির জন্য পূর্বানুমতি প্রয়োজন হবে; এবং (৩) ক্ষুদ্র আমদানি-নিষিদ্ধ পণ্য তালিকা। দ্বিতীয় সংস্কারটি হলো শুল্ক-বাধা অপসারণ। এর আওতায় সর্বোচ্চ শুল্কহার ৩৫০ থেকে কমিয়ে ১০০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। শুল্ক হারের সংখ্যা ২৭ টি থেকে পর্যায়ক্রমে হ্রাস করে ৭টি করা হয়, এবং ভবিষ্যতে তা আরো কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।
শুধুমাত্র মোটা দাগের সংস্কারের কথাগুলিই উপরে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বেসরকারী বিনিয়োগের নীতিমালা সহ আরো বহুবিধ সংস্কার এ দশকেই করা হয়।
এসব সংস্কারের ফলে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে। দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে, কর রাজস্ব, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ফি-বছর বন্যা ও ফসলহানি হলে দুর্ভিক্ষের ন্যয় পরিস্থিতি থেকে জাতি মুক্তি পায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা আসে। আমাদের অর্থনীতির বর্তমান গতিশীলতার পেছনেও রয়েছে নব্বইয়ের দশকের সংস্কার। এর সঙ্গে জনমিতি বোনাস যোগ হয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকের এ সংস্কার সম্ভব হয়েছিল মুলত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও কার্যকর নেতৃত্বের কারণে। তার পরবর্তী অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াও এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এ কাজগুলি মোটেই সহজ ছিল না। তখন অনেকেই আমাদের মধ্যে যারা সংস্কার প্রচেষ্টার সংগে জড়িত ছিলাম, তাদের এই বলে গালমন্দ করেছেন যে, আমরা দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। দু’একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। বিশ্বব্যাংকের সরকারী সম্পদ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় ঋণ চুক্তির আওতায় ব্যক্তি আয়কর এর উচ্চ প্রান্তিক হার হ্রাস, করমুক্ত আয়সীমা প্রবর্তন, করের স্তর কমানোর শর্ত ছিল। এ বিষয়ে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অর্থমন্তনালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আমি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. একরাম হোসেনের সহায়ক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিই। সভায় সবাই একবাক্যে সংস্কার প্রস্তাবগুলির বিরোধিতা করেন। বলা হয়, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে রাজস্ব খাতে ধ্বস নামবে। সভায় উপস্থিত তখনকার ইআরডি সচিব ইনাম আহমদ চৌধুরীকে বিশ্বব্যাংকের শর্তসমুহ গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেয়ার জন্য বলা হয়।
সভাশেষে, আমরা কয়েকজন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মশিউর রহমানের (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) কক্ষে চা পানের জন্য বসি। তিনি আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো সভায় কিছু বললে না। আমি বললাম, আমার তো কিছু বলার কথা না। আমি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের ফাইল বহন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এগিয়ে দেয়ার জন্য সভায় এসেছি। তাছাড়া আমি আয়কর নয়, রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক ও আবগারী উইং এর কর্মকর্তা। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক টাকা না দিলেও আমাদের এসব সংস্কার করা উচিৎ। সেখানে উপস্থিত সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘কেন? কেন?’ আমি বললাম, আমার ধারণা, বিজলি-পানি বিহীন, খানাখন্দকে ভর্তি রাস্তাঘাটের আমাদের এ দেশে কেউ ৫৫ শতাংশ প্রান্তিক হারে কর প্রদান করেন বলে মনে হয় না। তারা আমাকে বললেন, প্রমাণ কী? আমি বললাম, আমাকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচিত এক হাজার আয়কর রিটার্ন দিলে আমি বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। তারা রাজি হলেন ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে বললেন। কর বিভাগের বড় কর্তারা বললেন, আয়কর নথি গোপন বিষয়। আয়কর কর্মকর্তারা ছাড়া অন্য কেউ তা দেখতে পারার বিধান আইনে নাই। ঠিক হল, আমি এনবিআর চেয়ারম্যান এর মিটিং রুমে বসে এগুলো দেখবো।
যাই হোক, আয়কর রিটার্নগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম, যেমনটি ধারণা করেছিলাম তাই- এই উচ্চ হারে কেউ কর দেন না। আমি উপাত্তগুলোর ভিত্তিতে একটা সারণী ও একপাতার একটা ব্যাখ্যা লিখে অর্থবিভাগে ড. মশিউর রহমানের কক্ষে যাই। তিনি পড়ে দেখলেন। তারপর আমাকে নিয়ে অর্থ সচিব নাসিমুদ্দিন আহমদের কক্ষে গিয়ে বিষয়টি বললেন। অর্থ সচিব সহ আমরা সদলবলে অর্থমন্ত্রীর কক্ষে যাই। অর্থ সচিব মন্ত্রী মহোদয়কে বললেন, আমরা একটু বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় ঋণ চুক্তি সম্পর্কে কথা বলতে চাই। মন্ত্রী মহোদয়, কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, সেদিন না মিটিং করে মানা করে দিলাম। আবার কী? ড. মশিউর রহমান আমাকে দেখিয়ে বললেন, ও বিষয়টা আরো ফারদার স্টাডি করে দুই পাতার একটা রিপোর্ট তৈরি করেছে, আপনি একটু পড়ে দেখতে পারেন। বিরক্তি নিয়ে শুরু করলেও দেখলাম, পড়তে পড়তে তিনি রিপোর্ট এর বিভিন্ন জায়গায় দাগ দিচ্ছেন। পড়া শেষ করে আমাদের কিছু বললেন না। এনালগ টেলিফোনের হাতল উঠিয়ে তার পিএ-কে বললেন, ইআরডি সেক্রেটারিকে ফোনে ধরান। মন্ত্রী মহোদয় ইআরডি সেক্রেটারিকে বললেন, ওয়াশিংটন থেকে আসা বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল ফিরে না যেয়ে থাকলে, তাদের যেন বলা হয় যে, সরকার প্রস্তাবিত ঋণ চুক্তির শর্তগুলি পরীক্ষা করতে রাজি আছে। এমন তড়িৎ ছিল তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা। তাকে কিছু একবার বোঝাতে পারলে, তিনি তা করেই ছাড়তেন।
১৯৯১-৯২ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট প্রবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর নিজের রাজনৈতিক দলের মধ্যেই বিরোধিতা ছিল প্রবল। তিনি নিজেও নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে, ভ্যাট প্রবর্তনের প্রস্তাব সংসদে পাস হবে কিনা। সেক্ষেত্রে, বিকল্প হিসেবে ইতিপূর্বে বাতিল করা আবগারী শুল্ক আইন পুনর্বহালের খসড়া নিয়েও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রস্তুত ছিল।
নব্বইয়ের দশকের পর এখন আরো প্রায় ২০ বছর অতিবাহিত হতে চলল। টুকটাক কিছু পরিবর্তন করা হলেও নব্বইয়ের দশকের পর অর্থনীতিতে মৌলিক কোন সংস্কার করা হয়নি। ফলে ইতিপূর্বের সংস্কার ও জনমিতি বোনাসের কারণে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি হলেও ব্যাংকিং খাতে সংকট, রাজস্ব আয় ও বিনিয়োগে ভাটার টান পড়েছে। নব্বইয়ের দশকের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জেনেছি যে, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সংস্কার করা অত্যন্ত দুরূহ। তাই, অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হওয়ার আগেই, অচিরেই অতি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ না নেয়া হলে ভবিষ্যতে উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।
লেখক: সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ