স্মৃতিচারণ

চাপের মুখেও মাথানত করতেন না সোলায়মান খান মজলিস

চলতি বছরের ৩০ মার্চ দুপুর ২টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন সোলায়মান খান মজলিস। একইদিন বাদ আসর বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় সম্ভ্রান্ত মজলিশ পরিবারে ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি মজলিশ উপাধি গ্রহণ করেন। এ পরিবারের একটা অংশ সিরাজগঞ্জে বসতি স্থাপন করে এবং দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ঐতিহ্য অনুযায়ী খান মজলিশ উপাধি বংশ পরম্পরায় যুগের পর যুগ ধরে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এ পরিবারে ছেলে অথবা মেয়ে জন্মগ্রহণ করলে ‘খান মজলিশ’ উপাধি ধারণ করে।

স্বাধীনতা পূর্ব বিশিষ্ট সংবাদ পাঠক দাউদ খান মজলিশ পরবর্তী নিকট সময়ে বাংলাদেশে স্বনামধন্য নাক-কান-গলার চিকিৎসক খান মজলিশ হিসেবে সমাদৃত হন। অনেক সংসদ সদস্য এ পরিবার থেকে এসেছেন। এ পরিবারের মহিলা ডিসি বিগত সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর বিশাল দুর্নীতির কার্যক্রমের প্রতিবাদী ভূমিকা পালনে প্রশংসিত হন। মানিকগঞ্জ শহরে খান মজলিশ টাওয়ার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এ পরিবারের নাম ধারণ করে আছে।

মো. সোলায়মান খান মজলিশ

সোলায়মান খান মজলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬৬ সালে তৎকালীন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে যোগদান করেন, যা স্বাধীনতা পরবর্তীতে জনতা ব্যাংক নাম ধারণ করে। বেসরকারি ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকরি শুরু করেন ১৯৮৪ সালে এবং ডিএমডি হন। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যমুনা ব্যাংকে যুক্ত হন। পরবর্তীতে বিশ্ব ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকের রিফর্ম কমিটির এডভাইজার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত গ্রুপের এডভাইজার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

করোনাকালে ওনার পরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারের বৈবাহিক আলোচনা চলছিল। তখন মেলামেশায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় ফার্স হোটেলে আমরা মিলিত হই এবং আলোচনা করি। ড্রাইভার না থাকায় সত্তোরঊর্ধ্ব এ ভদ্রলোক নিজেই গাড়ি চালিয়ে আসেন। প্রথম দেখাতে উনার ব্যক্তিত্ব, জ্ঞানের গভীরতা ও সৌজন্যবোধ আমাদের পুরো পরিবারকে বিমোহিত করে। আমি যে ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি, সে ব্যাংকের উচ্চস্থরের কর্মকর্তা ছিলেন ওনার অনেক বন্ধু। পরবর্তীতে তাদের মধ্য থেকে ওই ব্যাংকসহ অন্য কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। তাই প্রথম প্রথম ওনাকে স্যার বলে সম্বোধন করতাম। পরে ওনার আপত্তিতে ভাইসাহেব ডাকতাম। আকবর আলী খানের লেখা বইতে ব্যাংকার হিসেবে উনার নামের উল্লেখ ছিল। আকবর আলী খান প্রায়শই উনার থেকে ব্যাংকিং বিষয়ক পরামর্শ নিতেন।

উনি ওনার ব্যাংকিং জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। স্বাধীনতার পর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের জয়দেবপুরের একটি শাখায় উনার পোস্টিং হয়। তিনি ব্যাচেলর বাসায় একাই থাকতেন। ব্রাঞ্চের সিকিউরিটি গার্ড ছিল পাঠান। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির রাতে পাঠান সাইকেল চালিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে উনার রুটি নিয়ে আসে এবং বলে এ বৃষ্টির রাতে তুমি না খেয়ে ঘুমাবে এটা ভেবে তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসলাম। পাঠান একদিন তার নিজ বাড়ি পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ছুটি চাইলে ম্যানেজার নামঞ্জুর করেন। এতে রাগ হয়ে সে বলে বসে ‘ছুটি না মিলেগা তো ম্যানেজার স্যার কো গুলি মার দে গা।’ এই কথা শুনে সোলায়মান খান তার ছুটির ব্যবস্থা করে দেন।

স্বাধীনতার পর জনতা ব্যাংকে তিনি ক্রেডিট ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন। পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করতেন একটি ক্রেডিট প্রপোজাল পাশ করানোর জন্য কতো কসরত করতে হতো! এজিএম নিজে জিএমের কাছে গিয়ে যতক্ষণ লোন খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, ততক্ষণ কোনো ইতিবাচক সাড়া পেতেন না। এজন্য আশির দশকে ঋণ খেলাপি শব্দটা ব্যাংকারদের কাছে এতটা পরিচিত ছিল না। ৯০ দশকের পর থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মহামারি হিসেবে দেখা দেয় খেলাপি ঋণ। ন্যাশনাল ব্যাংকে ডিএমডি হিসেবে কাজ করার সময় প্রায়ই চাপ আসত উপর মহল থেকে। তবে তিনি কোনো চাপের মুখে মাথানত করতেন না। একবার এক প্রভাবশালী পরিচালক চাপ তৈরি করে সফলকাম না হয়ে কাউকে বলেন, ‘উনাকে বেশি ঘাটিও না, এমনও হতে পারে উনি চাকরিই ছেড়ে দেবেন।’

যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকাকালে অন্যান্য ব্যাংকের এমডি বন্ধুমহল থেকে অনুরোধ আসতো তাদের করা লোকাল এলসির বিপরীতে বিল ডিসকাউন্ট করে টাকা দেয়ার জন্য। কিন্তু তিনি করতেন না। উনি আমাকে বলেন, যে পরিমাণ এলসি ভ্যালু দেখা যায় তার মাল আদান-প্রদান যদি সত্যিই হতো তাহলে ট্রাকের জ্যামে ঢাকা অচল হয়ে যেতো। এ ধরণের অনৈতিক ব্যাংকিং রুখতে পেরেছিলেন বলেই আশির দশকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে তাদের কার্যক্রম চালু রাখতে পেরেছিল।

বনানী কবরস্থানে যাওয়া হয় না নানা কারণে। মধ্যবিত্তদের কবর কেনার রেওয়াজ এবং কবর দেয়ার সক্ষমতা কম থাকা এর মধ্যে অন্যতম। তবুও উনার দাফনে গিয়ে দেখলাম বেশ পরিপাটি ও সুশৃঙ্খলভাবে কবরের সারি ও বিখ্যাত সব লোকজনের নামফলক। চোখে পড়ল গাজী শামসুর রহমানের নাম, যিনি আশির দশকে বিটিভিতে সহজে আইন শেখানোর একটা অনুষ্ঠান করতেন, যাতে বাদী-বিবাদী খবির ও দবিরের নাম উল্লেখ করে সহজ ভাষায় আইন বুঝাতেন। একটা কবরে লেখা দেখলাম ‘‘কে যাও মুসলিম ভাই, মোর কবরের পাশে ক্ষণিক দাঁড়াও, আমার সালাম নাও”। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দিনের কবরে জসিমউদ্দীনের ১৯৪২ সালে লেখা কবিতার একটি পঙক্তি আছে ছোট লিলিকে লেখা। লিলি উনার ডাকনাম।

শ্রদ্ধা জানাই একজন সৎ নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত একজন সাহসী ব্যাংকারকে। তার কুলখানিতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ব্যাংক নেতা, আত্মীয়স্বজন ও গুণীজনরা অংশগ্রহণ করেন। সবাই মরহুমের জন্য কায়মনোবাক্যে দোয়া করেন এবং কামনা করেন আল্লাহ যেন এ গুণী মানুষটাকে জান্নাতবাসী করেন।

মতিউল হাসান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি.

আরও