বাংলাদেশের অটিস্টিক শিশুদের শারীরিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা

‘অটিজম’ শব্দটি সম্পর্কে আগে আমাদের খুব একটা ধারণা ছিল না। এখন জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহ বেড়েছে। বর্তমানে অটিজমকে মূলত অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই স্পেকট্রাম শব্দটি থেকে আমরা ধারণা পেতে পারি যে এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ডিসঅর্ডার নয়, বরং অনেকগুলো ডিসঅর্ডারের সমন্বিত একটি রূপ। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার মূলত একটি নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, যা শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের পথে বিভিন্ন ধরনের বাধার সৃষ্টি করে; যার মধ্যে অন্যতম হলো সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে অপারগতা, যোগাযোগের সমস্যা ও আচরণের অস্বাভাবিকতা। অটিজম কেন হয়, এ সম্পর্কে এখনো পরিষ্কারভাবে জানা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে জেনেটিক ও পরিবেশগত কারণে অটিজম দেখা দিতে পারে। এখন পর্যন্ত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তে এটাই প্রতীয়মান হয় যে অটিজমের পেছনে জেনেটিকস বা বংশগতির প্রভাবই প্রকট।

‘অটিজম’ শব্দটি সম্পর্কে আগে আমাদের খুব একটা ধারণা ছিল না। এখন জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহ বেড়েছে। বর্তমানে অটিজমকে মূলত অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই স্পেকট্রাম শব্দটি থেকে আমরা ধারণা পেতে পারি যে এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ডিসঅর্ডার নয়, বরং অনেকগুলো ডিসঅর্ডারের সমন্বিত একটি রূপ। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার মূলত একটি নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, যা শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের পথে বিভিন্ন ধরনের বাধার সৃষ্টি করে; যার মধ্যে অন্যতম হলো সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে অপারগতা, যোগাযোগের সমস্যা ও আচরণের অস্বাভাবিকতা। অটিজম কেন হয়, এ সম্পর্কে এখনো পরিষ্কারভাবে জানা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে জেনেটিক ও পরিবেশগত কারণে অটিজম দেখা দিতে পারে। এখন পর্যন্ত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তে এটাই প্রতীয়মান হয় যে অটিজমের পেছনে জেনেটিকস বা বংশগতির প্রভাবই প্রকট।  

সাম্প্রতিকালে বাংলাদেশে অটিজমসহ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজের পরিধি বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বেশকিছু কাজ হয় ঠিকই কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজের প্রচেষ্টা খুবই অপ্রতুল বা নেই বললেও চলে। এমনই প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে নিউরোজেন চিলড্রেন্স হেলথকেয়ারের আবির্ভাব। নিউরোজেন বাংলাদেশের একমাত্র ক্লিনিক, যেখানে জেনেটিক ডায়াগনসিসের মাধ্যমে সব জেনেটিক রোগের কারণ নির্ণয় ও চিকিত্সা করা হয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের জেনেটিক সায়েন্সের উন্নয়ন যাত্রায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। নিউরোজেনের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের জেনেটিক টেস্ট, কাউন্সেলিং, অ্যাসেসমেন্ট ও থেরাপি (অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, বিহেভিয়ার থেরাপি) প্রদান করে। সেই সঙ্গে এখানে জেনেটিক টেস্টের মাধ্যমে ব্রেস্ট ও ওভারিয়ান ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নির্ধারণ ও নিরাময়ের কাজও হয়। তাছাড়া এ পর্যন্ত বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির পেছনে দায়ী জিন শনাক্ত করতেও সমর্থ হয়েছেন নিউরোজেনের গবেষকরা। 

অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নতির লক্ষ্যে নিউরোজেনের গবেষণাধর্মী প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ‘AnExploration of Physical and Phenotypic Characteristics of Bangladeshi Children with Autism Spectrum Disorder’ শিরোনামের বর্তমান গবেষণাটি খুবই মৌলিক ও তাত্পর্যপূর্ণ একটি গবেষণা, যা বাংলাদেশের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের বৈশিষ্ট্যগুলোর বিশদ বিবরণ সরবরাহ করে। এ গবেষণা নিউরোজেনের প্রধান সায়েন্টিফিক উপদেষ্টা ও কানাডার টরন্টোতে অবস্থিত দ্য হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেনের অ্যাসোসিয়েট ইনভেস্টিগেটর ড. মোহাম্মদ উদ্দিন ড্যাফিলের তত্ত্বাবধানে নিউরোজেনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মো. আশিকুর রহমান এবং তার সহযোগীরা মিলে সম্পাদন করেন। সম্প্রতি এই গবেষণা গ্রন্থটি জার্নাল অব অটিজম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারে প্রকাশিত হয়েছে https://link.springer.com/article/10.1007/s10803-020-04703-0।

গবেষণাটিতে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বাংলাদেশী শিশুদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং ক্লিনিক্যাল ফেনোটাইপ বা উপসর্গগুলো অনুসন্ধান করা হয়েছিল। গবেষণাটির একটি নির্দিষ্ট ফোকাস ছিল অটিজমের লক্ষণ এবং বিকাশের প্যারামিটার বা নির্দেশকগুলোর ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে শিশুর পার্থক্যগুলো পরীক্ষা করা। জাতিভেদে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে পার্থক্য খেয়াল করা যায়, সেজন্য জাতিগত পার্থক্যের স্বরূপ জানার জন্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ওপর বিশদ গবেষণা করা অতি প্রয়োজন। বর্তমান গবেষণাটি অটিজমের ক্লিনিক্যাল লক্ষণগুলো এবং বিকাশের প্যারামিটারগুলো মূল্যায়ন করে প্রথম বাংলাদেশী অটিজম কোহর্টকে প্রতিনিধিত্ব করে।   

এই গবেষণায় মোট ২৮৩ জন শিশু অংশগ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নিউরোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট ও থেরাপিস্টরা এসব শিশুকে নিউরোজেন চিলড্রেন্স হেলথকেয়ারে রেফার করেছিলেন তাদের ভেতর অটিজম আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য বা থাকলেও সেটার তীব্রতা কতটুকু, সেটি নির্ধারণের জন্য। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী শিশুদের বয়সসীমা ছিল ২ বছর ১ মাস থেকে ১১ বছর ৫ মাস পর্যন্ত এবং তাদের মধ্যে ২১৫ জন ছিল ছেলে শিশু এবং ৬৮ জন ছিল মেয়ে শিশু। শিশুদের অটিজমের বৈশিষ্ট্যগুলোকে অটিজম ডায়াগনস্টিক অবজারভেশন স্কেজিউল, দ্বিতীয় সংস্করণের (ADOS-2) মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছিল। ADOS-2-কে বিশ্বব্যাপী অটিজম পরিমাপের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড (আদর্শ পরিমাপক) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে শিশুদের ওজন, উচ্চতা, বডি-মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ও মস্তিষ্কের পরিধি পরিমাপ করা হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে আমাদের গবেষণাটিতে ২০৯ জন শিশু অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের ডায়াগনস্টিক মানদণ্ডগুলো পূরণ করেছিল এবং বাকি ৭৪ জন শিশু অটিজমে আক্রান্ত ছিল না, যদিও তাদের মধ্যে বিকাশজনিত কিছু না কিছু অসুবিধা ছিল। তাদেরকে নন-স্পেকট্রাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। 

ফলাফল: আমাদের এ গবেষণায় অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছেলে ও মেয়ে শিশুর অনুপাত পাওয়া গিয়েছিল ৩.৬৪: ১, যা বিশ্বব্যাপী অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছেলে ও মেয়ে শিশুদের অনুপাতের (৪: ১) কাছাকাছি। উচ্চতা ও বিএমআই ইনডেক্সের ক্ষেত্রে অটিজম স্পেকট্রাম ও নন-স্পেকট্রাম শিশুদের মধ্যে কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি কিন্তু ওজন ও মস্তিষ্কের পরিধির ক্ষেত্রে এই দুই ধরনের শিশুদের মধ্যে পার্থক্য থাকার একটা প্রবণতা আমরা খেয়াল করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে আরো অনুসন্ধান করে আমরা দেখলাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছেলে শিশুদের মস্তিষ্কের পরিধি নন-স্পেকট্রামের ছেলে শিশুদের মস্তিষ্কের পরিধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড় ছিল। পাশাপাশি গবেষণাটিতে আমরা অটিজমের উপসর্গের সঙ্গে শিশুদের ওজন ও মস্তিষ্কের পরিধির মধ্যে একটা তাত্পর্যপূর্ণ ইতিবাচক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেছি।   

এছাড়া গবেষণাটিতে আমরা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছেলে শিশুদের তুলনায় মেয়ে শিশুদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ বা উপসর্গের তীব্রতার মাত্রা বেশি পেয়েছি। পাশাপাশি সামাজিক আচরণ এবং খেলা পরিচালনা করার প্রবণতার ক্ষেত্রে আমরা অনুসন্ধান করে পেয়েছি যে মেয়ে শিশুদের প্রতিবন্ধকতা ছেলে শিশুদের প্রতিবন্ধকতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, কিন্তু পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।  

প্রয়োগ: বর্তমান গবেষণালব্ধ এই ফলাফলগুলো আমাদের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছেলে ও মেয়ে শিশুদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে। পাশাপাশি আমাদের এই গবেষণা আরো প্রমাণ দেয় যে জাতিভেদে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য থাকতে পারে। সে কারণে বৃহত্ গবেষণার মাধ্যমে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের কারণ অনুসন্ধানে সাহায্য করবে এবং এই পার্থক্যগুলোর পেছনে বংশগতির প্রভাব উদ্ঘাটনেও সহায়তা করবে। তাছাড়া বর্তমান গবেষণাটিতে মেয়েদের ক্ষেত্রে যে তীব্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা গেছে, তার পেছনে জেনেটিক কাঠামোগত পার্থক্যের কোনো প্রভাব রয়েছে কিনা, তার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এছাড়া বর্তমান গবেষণাটি এটাও ইঙ্গিত করে যে মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের জ্ঞানীয়, আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশের গঠনগত পার্থক্যগুলো আরো বিশদভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজন। 

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান গবেষণা থেকে উঠে আসা তথ্যগুলো অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের ক্ষেত্রে লিঙ্গের ভূমিকাকে বুঝতে অবদান রাখে, যা কিনা দ্রুত উপসর্গ নির্ণয় ও উপসর্গ ব্যবস্থাপনায় ক্লিনিক্যাল গাইডেন্স প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বর্তমান গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো বাংলাদেশের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিত্সা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন এক মাত্রা যোগ করে উল্লেখযোগ্যভাবে আমাদের চিকিত্সা ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান গবেষণাটি আমাদের বৃহত্ভাবে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারকে বুঝতে সহায়তা করবে, সেই সঙ্গে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজের প্রয়াসকে উত্সাহিত করবে। 


মো. আশিকুর রহমান

অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও 

এমফিল গবেষক 

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও