চিকুনগুনিয়া
ও ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা ঈদের ছুটি বা কোনো উৎসব বোঝে না। আবার ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া
ভাইরাসও কোনো উৎসব বুঝতে পারে না। তারা শুধু পারে নিজের মনে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে
পোষক শরীরের ক্ষতি সাধন করতে। ঈদের ছুটিতে বা যেকোনো উৎসবে যদি তার পোষক শরীর অন্য
কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়, তবে তাদের জন্য এ
ছুটি হবে আনন্দের আর পোষক শরীরের অর্থাৎ আমাদের জন্য হয়ে উঠবে নিরানন্দের। মশকী চায়
তার বংশ বিস্তারের সুন্দর পরিবেশ আর ভাইরাস চায় তার রেপ্লিকেশনের মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি
করতে। দুটোই একসঙ্গে ঘটবে, যদি এডিসের পোষক শরীরে মানুষের উদাসীনতা ও অসাবধানতা থাকে।
থাকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। জলবায়ু যেমন মশা প্রজননের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করছে
তেমনি ঈদে যাতায়াতও তাদের সম্প্রসারণে সাহায্য করছে। তাদের প্রজনন ক্ষেত্র যেমন বাড়ছে,
একইভাবে বাড়ছে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস। ভাইরাস হয়ে
উঠছে শক্তিশালী ও বেপরোয়া ।
ঈদে বাড়ি
ফেরা পাঁচ কোটি মানুষের বাসা যেন দীর্ঘ বন্ধে এডিস মশার আস্তানায় পরিণত না হয়। আসন্ন
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে কর্মজীবী মানুষ শিকড়ের টানে আপনজনদের সঙ্গে
ঈদ করতে গ্রামমুখী হচ্ছেন। এক পরিসংখানে দেখা গেছে, এ ঈদে ঢাকাসহ অন্যান্য শহর থেকে
প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ ঘরে ফিরছে। এ সুযোগে তাদের ফেলে যাওয়া বাসা বাড়িতে যাতে এডিসের
লার্ভার কারখানায় পরিণত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা অতীব জরুরি। এ ঈদে লম্বা ছুটিতে পড়ে
যাতে এডিস মশার বংশ বিস্তারে ঘৃতাহুতি না দেয়া হয়, সেই দিকটা অতি যত্নসহকারে মনে রাখতে
হবে। এডিস মশার জীবন চক্র হতে দেখা যায়, ডিম ফুটে লার্ভা ও লার্ভা থেকে পিউপা হয়ে পূর্ণাঙ্গ
মশায় পরিণত হতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। তাই ফেলে যাওয়া বাসায়
জমানো পানির সব উৎস বন্ধ করে লার্ভা উৎপাদনের সুযোগ ধ্বংসের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি।
একই সঙ্গে এ বিপুলসংখ্যক মানুষের গ্রামে যাওয়া-আসায়ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ বাড়তি লোকের যাওয়া-আসার জন্য যে অতিরিক্ত পরিবহন প্রয়োজন,
সেগুলোর ধোয়ার স্থানগুলো অবশ্যই লার্ভার অভয়ারণ্য হতে রক্ষা করতে হবে। তাই অধিক কাজের প্রেসারে পরিবহন কর্মীরা যখন পরিবহনগুলো
ধোয়ার কাজ করবেন তখন মনে রাখতে হবে যেন ঈদের ছুটির সময় পানি জমে না থাকে। শহরে বিপুলসংখ্যক
রেস্টুরেন্টের পেছনে যে জায়গায় প্লেট ধোয়ার কাজ করা হয় সেই স্থানগুলো অবশ্যই পরিষ্কার
ও শুষ্ক রাখার দায়িত্ব মালিক-শ্রমিক উভয়েরই। শহরে বড় একটি অংশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা
প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো একটি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকবে। এ বন্ধের মধ্যে যেন কোনোভাবেই জমানো পানি না থাকে, সেইদিকে
দায়িত্ব প্রাপ্তদের সুদৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের দেশের এডিস মশার লার্ভার সবচেয়ে উর্বরতম জায়গা হলো
তৈরীকৃত ইমারতের নিচের তলা, যেখানে সর্বক্ষণিক পানি জমে থাকে। ঈদের ছুটিতে নির্মাণ শ্রমিকরা ঢাকা ছাড়লে যাতে সেসব নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে এডিস মশার বিস্তার না করে সেদিকে
নগর কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
মশা সমস্যা
এখন শুধু সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা সরকারের কোনো একক দায়িত্ব নয়। আবার এ সমস্যা শুধুই
আর শহর বা সিটি করপোরেশন কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ নয়। এ সমস্যা এখন সারা দেশের সব মানুষের।
আগে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়াকে নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ বলা হলেও এখন তা সব শ্রেণী-পেশার
মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের যাতায়াত আর মিলন মেলায় তা আরো এক
ধাপ এগিয়ে দেবে। তাই যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন একান্ত জরুরি।
গ্রাম এলাকায় স্কুল-কলেজও রয়েছে, সেই জায়গাগুলো স্থানীয় প্রতিনিধি ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা
অবশ্যই নজরে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। নয়তো মানুষ ভাইরাস-মশার যে দুষ্টু
চক্র তা আমাদের চরম ভোগান্তির দিকে নিয়ে যাবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ২০০০ সাল হতে ২০২২
পর্যন্ত ২২ বছরের সব রেকর্ড ভেঙেছে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।
আবার ২০২৩ সালের এই দিন পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় দ্বিগুণ রেকর্ড গড়েছে ২০২৪
সালে। তাই সাবধানতা যে কত বেশি প্রয়োজন বুঝতেই পারছেন। সাবধানতার বিকল্প নেই। হতাশ
হওয়ারও কারণ নেই। পবিত্র ঈদুল ফিতর দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আমাদের জীবনে বয়ে
আনুক অনাবিল সুখ-সমৃদ্ধি ও আত্মিক মুক্তি। সন্তুষ্টি অর্জিত হোক মহান পরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তার।
আত্মশুদ্ধি আর পবিত্রতায় ভরে উঠুক আমাদের জীবন।
ড. মো. গোলাম
ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব¡ বিভাগ জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা
প্রতিষ্ঠান (নিপসম)